দেশত্যাগের অধিকার খর্ব করেছে চীন : এইচআরডব্লিউ

রয়টার্স ছবি

দেশি ও বিদেশি নাগরিকদের চীন ছাড়ার ওপর কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষমতা আরো বাড়িয়েছে চীন সরকার। এ লক্ষ্যে ১৯ ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ গত ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে দেশটিতে।তবে এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) বলছে, এর ফলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দেশ ছাড়ার অধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

চীনের স্টেট কাউন্সিলের ১৯ ধারার ‘রেগুলেশনস অন এক্সিট-এন্ট্রি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’—ডিক্রি নম্বর ৮৪১ গত ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে। এতে জাতীয় নিরাপত্তা ও ঝুঁকির মতো অস্পষ্ট বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে নাগরিক ও বিদেশিদের দেশ ছাড়ার ওপর বিধিনিষেধ আরোপের সুযোগ রাখা হয়েছে।

এক বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউর এশিয়াবিষয়ক উপপরিচালক মায়া ওয়াং বলেন, কে দেশ ছাড়তে পারবে আর কে পারবে না সে বিষয়ে নির্বিচারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ আরো বাড়াচ্ছে চীন সরকার।মানবাধিকারকর্মী ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের আন্তর্জাতিক ভ্রমণে এরই মধ্যে বিধিনিষেধ ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিদেশিদেরও চীন ছাড়তে পারার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত।

নতুন এই অধ্যাদেশে বেশ কিছু বিধান চীনের বিদ্যমান এক্সিট-এন্ট্রি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন আইন, পাসপোর্ট আইন ও অন্যান্য বিধিমালার বিধিনিষেধকে একত্রিত করেছে। তবে এইচআরডব্লিউর মতে, নতুন বিধিমালায় অভিবাসনসংক্রান্ত সিদ্ধান্তকে আরো কঠোর জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

অধ্যাদেশের ২ নম্বর ধারায় ‘প্রয়োজন হলে’ অভিবাসন কর্তৃপক্ষকে ভ্রমণ নথির আবেদন বা সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের সময় নাগরিকদের ‘উচ্চঝুঁকিপূর্ণ’ দেশ বা অঞ্চলে ভ্রমণ থেকে নিরুৎসাহিত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।তবে ‘উচ্চঝুঁকিপূর্ণ’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে বা কখন এ ধরনের নিরুৎসাহিত করা প্রয়োজন হবে, তা স্পষ্ট করা হয়নি।

এছাড়াও ৪ নম্বর ধারায় বিদেশে এমন কোনো ‘অবৈধ বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে’ জড়িত থাকার অভিযোগে নাগরিকদের সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত দেশ ছাড়তে বাধা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। যা জাতীয় নিরাপত্তা বা স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর বলে বিবেচিত হতে পারে। একই ধারায় রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বা প্রযুক্তি আমদানি-রপ্তানি বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞার সুযোগ রাখা হয়েছে।

অধ্যাদেশের ৬ নম্বর ধারায় সাধারণত নিষেধাজ্ঞার কারণ, আইনি ভিত্তি ও প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ লিখিতভাবে জানানোর কথা বলা হয়েছে।তবে জাতীয় নিরাপত্তা বা অপরাধ তদন্তে প্রভাব পড়তে পারে মনে হলে কর্তৃপক্ষকে তা জানানো থেকে বিরত থাকার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

বিদেশিদের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ বাড়ানো হয়েছে। ‘কাউন্টারমেজারস লিস্ট’, ‘আনরিলায়েবল এনটিটি লিস্ট’ বা ‘ম্যালিশাস এনটিটি লিস্ট’-এ থাকা ব্যক্তিদের চীন ছাড়তে বাধা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে এক মার্কিন ফেডারেল কর্মী ও ওয়েলস ফার্গোর এক নির্বাহীকে কোনো ফৌজদারি অভিযোগ ছাড়াই চীন ছাড়তে বাধা দেওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করেছে এইচআরডব্লিউ।

সংস্থাটি বলছে, গত এক দশকে চীনে দেশ ছাড়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই কঠোর হয়েছে। উইঘুরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সংখ্যালঘু, মানবাধিকারকর্মী এবং সরকারি কর্মীদের বিদেশ ভ্রমণেও বাড়তি বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণায় প্রত্যেক ব্যক্তির ‘নিজের দেশসহ যেকোনো দেশ ত্যাগ করার অধিকার’ স্বীকৃত। তবে জাতীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, জনস্বাস্থ্য বা অন্যের অধিকার সুরক্ষার মতো বৈধ কারণে আইনের আওতায় প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক বিধিনিষেধ আরোপের সুযোগ রয়েছে।

এইচআরডব্লিউর দাবি, চীনের নতুন বিধিমালায় অস্পষ্ট কারণ দেখিয়ে নাগরিক ও বিদেশিদের দেশ ছাড়ার ওপর ব্যাপক নিয়ন্ত্রণের সুযোগ থাকায় তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড পূরণ করে না। সংস্থাটি বলছে, এসব বিধিনিষেধ মতপ্রকাশ ও একাডেমিক স্বাধীনতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং আত্মনিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ বাড়াতে পারে।

LEAVE A REPLY