সংগৃহীত ছবি
গত এক দশকে অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা শিল্পে ধারাবাহিকভাবে উত্থান হয়েছে ভারতের। সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে, অস্ত্র, সামরিক প্ল্যাটফর্ম ও বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সরঞ্জামে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়িয়েছে দেশটি।
এ পরিবর্তনের পেছনে প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি, ক্রয়নীতি সংস্কার, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ এবং গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানোর মতো বিষয়গুলো ভূমিকা রেখেছে।
প্রতিরক্ষা শিল্পে বড় পরিবর্তন
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন রেকর্ড ১ লাখ ৭৮ হাজার কোটি রুপিতে পৌঁছেছে। আগের অর্থবছরে যা ছিল ১ লাখ ৫৪ হাজার কোটি রুপি। ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ৮৪ হাজার ৬৪৩ কোটি রুপি এবং ২০১৩-১৪ সালে ৪৩ হাজার ৭৪৬ কোটি রুপি।২০২৯ সালের মধ্যে বার্ষিক প্রতিরক্ষা উৎপাদন ৩ লাখ কোটি রুপি এবং রপ্তানি ৫০ হাজার কোটি রুপিতে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ভারত সরকার।
প্রতিরক্ষা বাজেটও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে যেখানে বাজেট ছিল ২ লাখ ৫৩ হাজার কোটি রুপি, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ৭ লাখ ৮৫ হাজার কোটি রুপি।
নতুন সামরিক সরঞ্জাম কেনা ও উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ মূলধনি ব্যয় ২০১৪-১৫ অর্থবছরের ৯৪ হাজার ৫৮৭ কোটি ৯৫ লাখ রুপি থেকে বেড়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২ লাখ ১৯ হাজার কোটি রুপিতে দাঁড়িয়েছে।
রপ্তানিতে চমক
ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া বলছে, সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে প্রতিরক্ষা রপ্তানিতে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৬৮৬ কোটি রুপির রপ্তানি থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে রেকর্ড ৩৮ হাজার ৪২৪ কোটি রুপিতে পৌঁছেছে। এক বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬২ দশমিক ৬৬ শতাংশ। বর্তমানে ভারতের তৈরি প্রতিরক্ষা পণ্য ৮০টির বেশি দেশে যাচ্ছে।
বেসরকারি খাতের উদ্ভাবন
রপ্তানিতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণও বেড়েছে।গত অর্থবছরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ১৭ হাজার ৩৫৩ কোটি রুপির প্রতিরক্ষা পণ্য রপ্তানি করেছে, যা মোট রপ্তানির ৪৫ দশমিক ১৬ শতাংশ। সরকারি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান ছিল ২১ হাজার ৭১ কোটি রুপি বা ৫৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। সামগ্রিক উৎপাদনে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশ প্রায় ৭৬ শতাংশ এবং বেসরকারি খাতের অংশ ২৪ শতাংশ, যার মূল্য প্রায় ৪২ হাজার কোটি রুপি।
দেশীয় উৎপাদন বাড়ার ফলে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের সময় গোলাবারুদ দ্রুত পুনরায় মজুত, ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জাম মেরামত এবং উৎপাদন বাড়ানোর সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সামরিক সরঞ্জামে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন ও আধুনিকায়নের সুযোগ বাড়ছে।
ভারতের প্রতিরক্ষা ক্রয়নীতিতেও এ পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা গেছে। প্রতিরক্ষা অধিগ্রহণ কাউন্সিল (ডিএসি) প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (ডিআরডিও) নকশাকৃত এবং ভারতীয় শিল্পে উৎপাদিত ৬ লাখ কোটি রুপির বেশি মূল্যের বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জামের জন্য ‘অ্যাকসেপ্টেন্স অব নেসেসিটি’ বা প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬২ হাজার কোটি রুপির ৯৭টি ‘তেজস এমকে-১এ’ যুদ্ধবিমান এবং প্রায় ৬২ হাজার ৭০০ কোটি রুপির ১৫৬টি ‘এলসিএইচ প্রচণ্ড’ হালকা যুদ্ধ হেলিকপ্টার রয়েছে।
দেশীয় উৎপাদনে জোরদার
২০১৬ সালের প্রতিরক্ষা ক্রয়নীতি এবং ২০২০ সালের প্রতিরক্ষা অধিগ্রহণ নীতির মাধ্যমে দেশীয় উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি আরও জোরদার করা হয়। এরপর ২০২৫ সালের প্রতিরক্ষা ক্রয় ম্যানুয়ালে প্রায় ১ লাখ কোটি রুপির রাজস্ব খাতের ক্রয়প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত ২০২৬ সালের প্রতিরক্ষা অধিগ্রহণ নীতিতেও দেশীয় নকশা ও উৎপাদনে সহায়তা এবং দেশীয় উপাদানের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা খাতে স্টার্টআপ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং উদ্ভাবকদের অংশগ্রহণও বাড়ছে। ‘ইনোভেশনস ফর ডিফেন্স এক্সিলেন্স’ বা আইডেক্স কর্মসূচির আওতায় মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত ৬৭৬টি স্টার্টআপ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান ও উদ্ভাবক যুক্ত হয়েছে এবং ৫৫১টি নকশা ও উন্নয়ন চুক্তি হয়েছে। এ খাতে ব্যয় হয়েছে ৪৯৮ কোটি ৭৮ লাখ রুপি।
প্রতিরক্ষা গবেষণায়ও বিনিয়োগ বেড়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ডিআরডিওর গবেষণা ও উন্নয়ন বরাদ্দ ছিল ১৩ হাজার ৭১৬ কোটি ১৪ লাখ রুপি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ২৯ হাজার ১০০ কোটি ২৫ লাখ রুপি। ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে গবেষণা ও উন্নয়ন বাজেটের ২৫ শতাংশ শিল্প, স্টার্টআপ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
দেশীয়করণের সুফল
দেশীয়করণের ফল সেনাবাহিনীর গোলাবারুদ মজুতেও দেখা যাচ্ছে। ভারতীয় সেনাবাহিনী তাদের ব্যবহৃত ১৭৫ ধরনের গোলাবারুদের মধ্যে ১৫৯টি দেশীয়ভাবে উৎপাদনের আওতায় এনেছে। ফলে গোলাবারুদের ক্ষেত্রে প্রায় ৯১ শতাংশ স্বনির্ভরতা অর্জনের দাবি করা হচ্ছে।
এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ভারত প্রতিরক্ষা খাতে গবেষণা, নকশা, পরীক্ষা, উৎপাদন, রক্ষণাবেক্ষণ, আধুনিকায়ন ও রপ্তানিকে একটি সমন্বিত শিল্প কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। তবে দেশীয় সক্ষমতা বাড়লেও সব ধরনের সরঞ্জাম ও উপাদান দেশে উৎপাদন করা সম্ভব হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই; আমদানিনির্ভরতা পুরোপুরি দূর করাও এর লক্ষ্য নয়।











































