ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নতুন মাত্রা, যুক্ত হচ্ছে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধিতে প্রতিবাদ

ছবি : রয়টার্স।

শিক্ষক সংকট, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে জোরালো হচ্ছে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। তাদের সমর্থনে দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন হাজারো মানুষ।মঙ্গলবারের বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা গত সপ্তাহের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। অধিকাংশ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও প্যারিস ও লিওঁর কয়েকটি স্থানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। 

প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁর দ্বিতীয় ও শেষ মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে এই আন্দোলন দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন চাপ তৈরি করছে।  আগামী ১৭ অক্টোবর শনিবার ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বড় বিক্ষোভ হওয়ার কথা রয়েছে।

এই পরিস্থিতি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁর সরকারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারের ব্যয় সংকোচনমূলক বাজেটের বিরোধিতায় আসন্ন বিক্ষোভকে ঘিরে আন্দোলন আরো বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

শ্রমিক সংগঠন ও ছাত্র সংগঠনগুলো আশা করছে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং জীবনযাত্রার ব্যয়বিরোধী বিক্ষোভ একসঙ্গে বড় আন্দোলনে রূপ নিতে পারে। সরকারি ঋণ বাড়তে থাকায় ব্যয় কমানোর বাজেট পাসের চেষ্টা করছে দেশটির মধ্যপন্থী সরকার।তবে এই বাজেটের বিরোধিতা করছে বাম ও ডান—উভয় পক্ষই। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বামপন্থী বিরোধী দল ফ্রান্স আনবাউড (এলএফআই) জোরালো সমর্থন দিয়েছে। দলটির নেতা ও প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জঁ-লুক মেলঁশোঁকেও প্যারিসের বিক্ষোভে দেখা গেছে।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবারের বিক্ষোভে প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার ৫০০ মানুষ অংশ নেন। গত বৃহস্পতিবারের বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন আনুমানিক ৭১ হাজার ৫০০ জন।প্যারিসে দুটি মিছিলের একটির আশপাশে সহিংসতার ঘটনা ঘটে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ওই মিছিলে প্রায় ৪১ হাজার ৫০০ মানুষ অংশ নেন। বার্তা সংস্থা এএফপির সাংবাদিকেরা জানান, প্যারিসের ইনভালিদেস চত্বরে মুখোশধারী কয়েকজন তরুণ রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরির চেষ্টা করেন এবং বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে মারেন। এ সময় পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। কয়েকটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। লিওঁ শহরের একটি বিক্ষোভেও পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে।

সুইডিশ পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ প্যারিসের উপশহর সাঁ-দেনিসে একটি বিক্ষোভে অংশ নেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের ভবিষ্যৎ ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে।’ এ কারণেই তিনি আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন বলে জানান। তবে বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নিয়ে সরকার ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর হিসাবে পার্থক্য রয়েছে। ফরাসি শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, মঙ্গলবারের সমাবেশগুলোতে প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছেন। তাদের মতে, সরকারের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে।

‘দমন নয়, সংলাপ চাই’

ফ্রান্সের নান্তেস, লিওঁ, লেন্স, স্ট্রাসবার্গ, তুলুজ, বোর্দো ও মার্সেই শহরেও শিক্ষার্থীদের সমর্থনে হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। মার্সেইয়ের একটি স্কুলের বাইরে ১৬ বছর বয়সী এমেলিন বলেন, ‘আমরা সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় থাকা উচ্চ বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের পাশে আছি। আমরা বাস্তব পদক্ষেপ ও যথাযথ সংলাপ চাই, দমন নয়।’

১৭ বছর বয়সী নিনা বলেন, ‘আমরা এখানে এসেছি, কারণ আমাদের মনে হচ্ছে সরকার আমাদের কথা শুনছে না।’ গত মাসে ফ্রান্সের উচ্চ বিদ্যালয়গুলোতে এ আন্দোলন শুরু হয়। দেশটিতে ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা এসব বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ উন্নত করার দাবিতে শিক্ষার্থীরা অনেক স্কুলের প্রবেশপথ অবরোধ করে আন্দোলন শুরু করেন।

আন্দোলন দমনে পুলিশের কঠোর পদক্ষেপের আশঙ্কাও অনেককে মঙ্গলবারের বিক্ষোভে যোগ দিতে উৎসাহিত করেছে। বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের একটি স্টান গ্রেনেড হাতে তুলে নিতে গিয়ে এক কিশোরের হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আরেকজন এক চোখ হারান। এ ছাড়া এক পুলিশ কর্মকর্তার মুখে কাঁদানে গ্যাসের ক্যানিস্টার আঘাত করায় তার কয়েকটি দাঁত পড়ে যায় বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ জানান, বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের সহিংসতার অভিযোগে ৩৬টি ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। তিনি আরো বলেন, বিক্ষোভ চলাকালে প্রায় ৯০০ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। অন্যদিকে দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এসব বিক্ষোভে প্রায় ১৪৭ জন শিক্ষক আহত হয়েছেন।

‘একচুলও নড়ব না’, আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা শিক্ষার্থীদের

ফ্রান্সে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুরবস্থা ও পুলিশের কঠোর পদক্ষেপের প্রতিবাদে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, অনুপস্থিত শিক্ষক, জরাজীর্ণ ভবন, অতিরিক্ত ব্যস্ত সময়সূচি এবং শ্রেণিকক্ষের নানা সমস্যা সমাধানে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্যারিসের ২০ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী প্যাট্রিসিয়া বলেন, ‘আমরা এই লড়াই ছাড়ছি না। উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর কঠোর দমন-পীড়নের প্রতিবাদ এবং পুলিশের সহিংসতার নিন্দা জানাতে আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব।’ এদিকে প্যারিসে বিক্ষোভের মধ্যে পড়ে কিছু ভারতীয় পর্যটক প্রথমে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। স্ত্রীর সঙ্গে এক সপ্তাহের জন্য প্যারিসে বেড়াতে আসা ৪৫ বছর বয়সী স্নেহিল জৈন বলেন, ‘শুরুতে আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম।’

তিনি আরো বলেন, ‘বিক্ষোভ ঘিরে সহিংসতার ছবি আমরা গণমাধ্যমে দেখেছিলাম। পরে বুঝতে পারি, এটি একটি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ। তখন আমরা স্বস্তি পাই।’ ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মঙ্গলবার দেশটির ২১৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। এর বেশির ভাগই উচ্চ বিদ্যালয়। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংগঠন ‘ল’ইউনিয়ন এতুদিয়ান্ত’-এর দাবি, আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে দেশজুড়ে প্রায় ৯০ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ছিল।

শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, শিক্ষক সংকট, জরাজীর্ণ ভবন, অতিরিক্ত ব্যস্ত সময়সূচি এবং শিক্ষার পরিবেশসংক্রান্ত অন্যান্য সমস্যা সমাধানে তাঁরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। গত সপ্তাহের বিক্ষোভের পর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ১১৪টি স্কুলে তিন হাজার বিকল্প শিক্ষক পাঠানোর সরকারি প্রতিশ্রুতিও তাঁরা প্রত্যাখ্যান করেছেন। শিক্ষার্থীদের মতে, শুধু বিকল্প শিক্ষক পাঠানো যথেষ্ট নয়; সমস্যার স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।

ব্রেস্ট শহরের এক উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাওয়েল বলেন, ‘আমরা অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা একচুলও নড়ছি না।’ অক্টোবরের শেষ দিকে স্বল্পমেয়াদি ছুটি শেষ হওয়ার পরও আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। সোমবার প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁ বিক্ষোভকারীদের সংযম দেখানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এসব সমস্যা সমাধানে সময়, আলোচনা, বিতর্ক ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা প্রয়োজন।
 

LEAVE A REPLY