সংগৃহীত ছবি
দুর্গাপূজা হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। দেবী দুর্গার আরাধনাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর শরৎকালে এই উৎসব পালিত হয়।সময়ের সঙ্গে দুর্গাপূজার আয়োজন ও উদ্যাপনের ধরনেও এসেছে নানা পরিবর্তন। অভিজাত পরিবারের পূজা থেকে শুরু করে পাড়ায় পাড়ায় সর্বজনীন আয়োজন। এই দীর্ঘ যাত্রায় উৎসবটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিল্প, সংগীত ও সামাজিক মিলনমেলা।
কিভাবে বদলে গেল দুর্গাপূজার আয়োজন? ইতিহাসের পাতা থেকে পাওয়া যায় সেই পরিবর্তনের নানা গল্প।
রাজা-জমিদারদের বাড়িতে দুর্গাপূজা
বাংলায় দুর্গাপূজার ইতিহাস বহু পুরোনো। তবে বর্তমানের মতো শারদীয় দুর্গাপূজার বড় আয়োজন ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছিল, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে একাধিক মত রয়েছে।
কলকাতার বড়িশায় সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের দুর্গাপূজা ১৬১০ সাল থেকে পালিত হয়ে আসছে বলে পারিবারিক ঐতিহ্যে উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে, কলকাতার শোভাবাজার রাজবাড়িতে রাজা নবকৃষ্ণ দেবের জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গাপূজা শুরু হয় ১৭৫৭ সালে।এই পূজা ব্রিটিশ শাসনামলে কলকাতার অভিজাত সমাজে বিশেষ পরিচিতি লাভ করে।
তৎকালীন অভিজাত পরিবারের পূজায় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি অতিথি আপ্যায়ন, ভোজ ও সাংস্কৃতিক আয়োজনও থাকত। এসব আয়োজন ছিল সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনেরও একটি মাধ্যম। তবে অনেক পূজাই ছিল পারিবারিক পরিসরে সীমাবদ্ধ।
বারোয়ারি পূজার সূচনা নিয়ে কী জানা যায়?
দুর্গাপূজার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে যখন ব্যক্তিগত আয়োজনের বাইরে গিয়ে একদল মানুষ সম্মিলিতভাবে পূজার আয়োজন করতে শুরু করেন।পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়াকে বাংলার বারোয়ারি পূজার সূচনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ২০২২ সালের একটি প্রতিবেদনে গুপ্তিপাড়ায় ১৭৫৯ সালে বারোয়ারি পূজার সূচনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে প্রচলিত একটি কাহিনিতে বলা হয়, স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি একত্র হয়ে এমন একটি পূজার আয়োজন করেন, যেখানে সাধারণ মানুষও অংশ নিতে পারবেন। তবে এই আয়োজনের পেছনের ঘটনা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জমিদারবাড়িতে প্রবেশ করতে না পেরে কয়েকজন পূজা শুরু করেছিলেন—এমন কাহিনির ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
একই প্রতিবেদনে ১৮২০ সালে প্রকাশিত দ্য ফ্রেন্ড অব ইন্ডিয়া পত্রিকার একটি বিবরণের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে গুপ্তিপাড়ায় বারোয়ারি পূজার আয়োজন, ১২ জনের কমিটি গঠন এবং বিভিন্ন এলাকা থেকে চাঁদা সংগ্রহের কথা বলা হয়েছে। ফলে বারোয়ারি পূজার ইতিহাসের ক্ষেত্রে প্রচলিত লোককাহিনির পাশাপাশি পুরোনো সংবাদপত্রের বিবরণও গুরুত্বপূর্ণ।
সর্বজনীন পূজায় নতুন অধ্যায়
বারোয়ারি পূজার ধারণা থেকে পরবর্তী সময়ে সর্বজনীন দুর্গাপূজার প্রসার ঘটে। সর্বজনীন শব্দটির অর্থ সবার জন্য। অর্থাৎ, পূজার আয়োজন শুধু কোনো পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ২০২২ সালের আরেকটি প্রতিবেদনে কলকাতার ভবানীপুরের বলরাম বসু ঘাট রোডে আয়োজিত পূজাকে শহরের প্রথম দিককার সর্বজনীন পূজার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে পূজার আয়োজন আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায়।
স্থানীয় মানুষের চাঁদা, উদ্যোগ ও শ্রমে গড়ে উঠতে থাকে পূজামণ্ডপ। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি তা হয়ে ওঠে এলাকার মানুষের একত্র হওয়ার জায়গা। সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন পাড়ায় পূজা কমিটি গড়ে ওঠে এবং আয়োজনের পরিসরও বাড়তে থাকে।
ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে শিল্প ও সংস্কৃতির যোগ
দুর্গাপূজার আয়োজন যত বিস্তৃত হয়েছে, ততই এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা শিল্প ও সাংস্কৃতিক উপাদান। প্রতিমা তৈরি, প্যান্ডেলের নকশা, আলোকসজ্জা, ঢাকের বাদ্য এবং আগমনী গান উৎসবের পরিচিত অংশ হয়ে উঠেছে। আধুনিক সময়ে থিমনির্ভর প্যান্ডেল ও সৃজনশীল প্রতিমা নির্মাণও পূজার আয়োজনকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
বাংলার প্রচলিত ভাবনায় দেবী দুর্গাকে অনেক সময় বাপের বাড়িতে আসা মেয়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়। তাই দেবীর আগমনকে ঘিরে আনন্দের পাশাপাশি বিজয়া দশমীতে বিদায়ের সময় বিষাদের আবহও তৈরি হয়। আগমনী গান ও বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্যে এই আবেগের প্রকাশ দেখা যায়।
২০২১ সালে ইউনেসকো কলকাতার দুর্গাপূজাকে মানবতার অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বমূলক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। সংস্থাটির বিবরণে প্রতিমা নির্মাণ, শিল্পী ও কারিগরদের সম্মিলিত কাজ, বড় আকারের প্যান্ডেল, ঐতিহ্যবাহী ঢাক এবং জনসাধারণের অংশগ্রহণের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
শিল্প ও জীবিকার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে পূজা
দুর্গাপূজার আয়োজনের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন বহু শিল্পী ও কারিগর। মৃৎশিল্পীরা প্রতিমা তৈরি করেন, শিল্পীরা প্যান্ডেলের নকশা করেন, আর আলোকসজ্জাশিল্পী ও অন্যান্য কর্মীরা উৎসবের আয়োজনকে পূর্ণতা দেন। পোশাক, খাবার ও নানা পণ্যের ব্যবসাতেও এই উৎসবের প্রভাব পড়ে।
আধুনিক সময়ে থিমনির্ভর প্যান্ডেল ও সৃজনশীল প্রতিমা নির্মাণ দুর্গাপূজাকে শিল্প প্রদর্শনের বড় পরিসর দিয়েছে। প্রতিটি প্যান্ডেলে ভিন্ন নকশা, উপকরণ ও ভাবনা তুলে ধরার চেষ্টা দেখা যায়। ফলে ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি এটি শিল্পী ও কারিগরদের সৃজনশীলতা প্রকাশেরও একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
ইউনেসকোর বিবরণেও দুর্গাপূজাকে ধর্মীয় আচার ও জনপরিসরে শিল্পচর্চার সমন্বয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এই স্বীকৃতি উৎসবটির সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিত করেছে।
সময়ের সঙ্গে বদলেছে আয়োজন
রাজা-জমিদারদের পারিবারিক আয়োজন থেকে বারোয়ারি পূজা, পরে সর্বজনীন আয়োজন এবং আধুনিক থিমনির্ভর প্যান্ডেল দুর্গাপূজার ইতিহাসে এসেছে নানা পরিবর্তন। বেড়েছে মানুষের অংশগ্রহণ, বিস্তৃত হয়েছে শিল্প ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের পরিসর।
তবে এসব পরিবর্তনের মধ্যেও দেবী দুর্গার আরাধনাই উৎসবের মূল ভিত্তি। ধর্মীয় বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই আয়োজন সময়ের সঙ্গে বাংলার শিল্প, সামাজিক জীবন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। দুর্গাপূজার ইতিহাস তাই শুধু একটি ধর্মীয় উৎসবের বিবর্তন নয়, বাংলার সামাজিক পরিবর্তনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।









































