সংগৃহীত ছবি
স্যান্ডউইচ, সালাদ কিংবা প্রতিদিনের খাবারের সঙ্গে কাঁচা পেঁয়াজ খাওয়া শুধু খাবারের স্বাদই বাড়ায় না, রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক হতে পারে। কয়েকটি ছোট গবেষণায় দেখা গেছে, পেঁয়াজে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অন্যান্য উপাদান ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়াতে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে।তবে এ বিষয়ে গবেষণা এখনো সীমিত। পেঁয়াজ খাওয়ার মাধ্যমে ইনসুলিন প্রতিরোধ দূর করা কিংবা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের নিশ্চিত উপায় পাওয়া গেছে, এমন প্রমাণ এখনো নেই। খবর ভেরিওয়েল হেলথ
ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়াতে পারে কাঁচা পেঁয়াজ
ইনসুলিন শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন, যা রক্ত থেকে গ্লুকোজ বা শর্করাকে কোষে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। কোষগুলো এই গ্লুকোজ ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদন করে।শরীরের কোষগুলো ইনসুলিনের সংকেতে যত ভালোভাবে সাড়া দেয়, ইনসুলিন কার্যকারিতাও তত ভালো বলে বিবেচিত হয়।
অন্যদিকে, কোষগুলো ইনসুলিনের প্রতি কম সাড়া দিলে সেই অবস্থাকে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বা ইনসুলিন প্রতিরোধ বলা হয়। এতে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।
নিউইয়র্ক মেডিক্যাল কলেজের শিশুরোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও পুষ্টিবিদ ডায়ান লিন্ডসে-অ্যাডলারের মতে, ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বলতে বোঝায় শরীরের কোষগুলো ইনসুলিনের সংকেতে কতটা কার্যকরভাবে সাড়া দিতে পারে।পেঁয়াজ খাওয়ার সঙ্গে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের সম্পর্ক নিয়ে কয়েকটি গবেষণায় ইতিবাচক ফল পাওয়া গেলেও এসব ফলাফল নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট নয়।
একটি পুরোনো গবেষণায় দেখা গেছে, ১০০ গ্রাম কাঁচা লাল পেঁয়াজ খাওয়ার চার ঘণ্টা পর অংশগ্রহণকারীদের রক্তে শর্করার মাত্রা কম ছিল। তবে এই পরিবর্তন কতক্ষণ স্থায়ী হয়েছিল, তা নিশ্চিত করা যায়নি। একইভাবে, পেঁয়াজ খাওয়ার কারণে তাদের কোষের ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বেড়েছিল কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়।
বেশি পরিমাণে পেঁয়াজ খাওয়ার সঙ্গে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের সম্পর্ক
আরেকটি গবেষণায় স্তন ক্যানসারের জন্য কেমোথেরাপি নেয়া নারীদের আট সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন বিভিন্ন পরিমাণে তাজা হলুদ পেঁয়াজ খাওয়ানো হয়েছিল।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যারা প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৬০ গ্রাম পেঁয়াজ খেয়েছিলেন, তাদের রক্তে শর্করার মাত্রা এবং ইনসুলিন প্রতিরোধের সূচকগুলো তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল। অন্যদিকে, যারা প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ গ্রাম পেঁয়াজ খেয়েছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে উন্নতি তুলনামূলক কম দেখা যায়।
এই ফলাফল পেঁয়াজ খাওয়া এবং রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। তবে গবেষণাটি নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর নারীদের ওপর করা হয়েছিল। ফলে অন্য ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ফল পাওয়া যাবে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
এ ছাড়া, এসব গবেষণার ফল থেকে প্রমাণিত হয় না যে পেঁয়াজ খাওয়া ইনসুলিন প্রতিরোধের কার্যকর চিকিৎসা অথবা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।
পেঁয়াজের কোয়ারসেটিন নিয়ে কেন আগ্রহী গবেষকেরা
পেঁয়াজে কোয়ারসেটিন নামের একটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হয়। এই উপাদান প্রদাহ কমাতে এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেস হ্রাস করতে সহায়তা করতে পারে।
অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এমন একটি অবস্থা, যেখানে শরীরের কোষের ক্ষতি হতে পারে এবং ইনসুলিনের স্বাভাবিক কার্যকারিতা ব্যাহত হতে পারে। এ কারণে কোয়ারসেটিনের মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট নিয়ে গবেষকদের আগ্রহ রয়েছে।
অরল্যান্ডো হেলথ সেন্টার ফর হেলথ ইমপ্রুভমেন্টের পুষ্টিবিদ জেনিফার বিয়ারির মতে, কোয়ারসেটিন শরীরের গ্লুকোজ গ্রহণের ক্ষমতা বাড়াতেও সাহায্য করতে পারে বলে ধারণা করা হয়। তবে এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
কোয়ারসেটিন নিয়ে অধিকাংশ গবেষণা পরীক্ষাগারে এবং প্রাণীর ওপর পরিচালিত হয়েছে। মানুষের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা সম্পর্কে প্রমাণ সীমিত। শুধু কোয়ারসেটিনের সম্ভাব্য উপকারিতা নিয়ে গবেষণা করলেই পেঁয়াজ খাওয়ার মাধ্যমে রক্তে শর্করার মাত্রায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতেও ভূমিকা রাখতে পারে পেঁয়াজ
পেঁয়াজের সম্ভাব্য উপকারিতা শুধু ইনসুলিনের কার্যকারিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এতে ইনসুলিনের মতো প্রিবায়োটিক ফাইবার রয়েছে, যা অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার খাদ্য হিসেবে কাজ করে।
নিউইয়র্ক মেডিকেল কলেজের পুষ্টিবিদ ডায়ান লিন্ডসে-অ্যাডলারের মতে, এসব ফাইবার অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়াকে সহায়তা করতে পারে এবং বিপাকীয় স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্ত্রের জীবাণুর ভারসাম্য বা মাইক্রোবায়োম শরীরের বিভিন্ন বিপাকীয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়াও রয়েছে। তবে পেঁয়াজ খাওয়ার ফলে অন্ত্রের স্বাস্থ্যে পরিবর্তন ঘটে রক্তে শর্করা সরাসরি নিয়ন্ত্রিত হয় কি না, তা নিয়ে গবেষণা এখনও চলছে।
পেঁয়াজে থাকা সালফার যৌগগুলোও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে বলে ধারণা করা হয়। তবে এ ধরনের সম্ভাব্য প্রভাব পেতে প্রতিদিন কতটুকু পেঁয়াজ খাওয়া প্রয়োজন, তা গবেষকেরা এখনও নির্ধারণ করতে পারেননি।
পেঁয়াজে কার্বোহাইড্রেট তুলনামূলক কম
পুষ্টিবিদ জেনিফার বিয়ারির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সাধারণত খাবারে যে পরিমাণ পেঁয়াজ ব্যবহার করা হয়, তাতে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ তুলনামূলক কম থাকে। ফলে খাবারের স্বাদ বাড়াতে পেঁয়াজ ব্যবহার করলে তা থেকে রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা সাধারণত কম।
কাঁচা কিংবা রান্না করা, দুইভাবেই পেঁয়াজ স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাদ্যের অংশ হতে পারে। তবে কাঁচা পেঁয়াজের সম্ভাব্য উপকারিতা নিয়ে কিছু গবেষণা থাকলেও সেটিকে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের স্বতন্ত্র পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করার মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই।
কতটুকু পেঁয়াজ খাওয়া উচিত
ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়াতে প্রতিদিন ঠিক কতটুকু পেঁয়াজ খাওয়া প্রয়োজন, তা এখনও নির্ধারিত হয়নি। কিছু গবেষণায় তুলনামূলক বেশি পরিমাণে পেঁয়াজ খাওয়ার সঙ্গে ভালো ফলের সম্পর্ক দেখা গেলেও সবার জন্য একই পরিমাণ কার্যকর হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
তাই শুধু রক্তে শর্করা কমানোর উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত পরিমাণে পেঁয়াজ খাওয়ার প্রয়োজনীয়তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং ব্যক্তির সহনশীলতা ও খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী পরিমিত পরিমাণে পেঁয়াজ খাওয়া যেতে পারে।
যাদের পেটে গ্যাস বা অস্বস্তি হয়, তাদের সতর্ক থাকা দরকার
পেঁয়াজ সবার পরিপাকতন্ত্রে একইভাবে সহ্য হয় না। এতে FODMAPs নামের গাঁজনযোগ্য কার্বোহাইড্রেট রয়েছে, যা কিছু মানুষের পেটে গ্যাস, ফাঁপা ভাব ও অস্বস্তি সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষ করে ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোমে (IBS) আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে পেঁয়াজ খাওয়ার পর এসব সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই যাদের পেঁয়াজ খেলে পরিপাকতন্ত্রে অস্বস্তি হয়, তাদের পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখা জরুরি।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে পেঁয়াজের ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়
পেঁয়াজের সম্ভাব্য উপকারিতা নিয়ে গবেষণা আশাব্যঞ্জক হলেও এটি রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকার চিকিৎসা নয়। ইনসুলিন প্রতিরোধ বা ডায়াবেটিস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা ও খাদ্যপরিকল্পনা অনুসরণ করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে কোনো একটি খাবারের ওপর নির্ভর করার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদে বজায় রাখা সম্ভব, এমন স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ। কাঁচা বা রান্না করা পেঁয়াজ সেই খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে, তবে এর কার্যকারিতা সম্পর্কে আরও গবেষণা প্রয়োজন।









































