বারবার দুঃস্বপ্ন দেখছেন, কখন বুঝবেন এবার সাবধান হতে হবে

সংগৃহীত ছবি

ঘুমের মধ্যে হঠাৎ মনে হলো, কেউ আপনাকে তাড়া করছে। কখনো দেখলেন, প্রিয়জন বিপদে, আবার কখনো নিজেই ভয়ংকর কোনো পরিস্থিতিতে আটকে পড়েছেন।বুক ধড়ফড় করতে করতে ঘুম ভাঙল।

চোখ খুলে বুঝলেন, সবই স্বপ্ন। কিন্তু ভয়টা যেন কিছুতেই কাটছে না। এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই হয়।তবে বারবার দুঃস্বপ্ন দেখা, ঘুমাতে ভয় পাওয়া কিংবা দিনের বেলায়ও সেই আতঙ্ক বয়ে বেড়ানো কেবল খারাপ স্বপ্নের বিষয় নয় কখনো কখনো এটি হতে পারে ‘নাইটমেয়ার ডিসঅর্ডার’ বা দুঃস্বপ্নজনিত ঘুমের ব্যাধির লক্ষণ।

দুঃস্বপ্ন দেখা আর ঘুমের রোগ কি এক

মাঝেমধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখা অস্বাভাবিক নয়। শিশুদের মধ্যে এটি বেশি দেখা গেলেও যেকোনো বয়সে এমন অভিজ্ঞতা হতে পারে। সাধারণত বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুঃস্বপ্ন দেখার প্রবণতা কমে আসে।তবে কারো কারো ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক বয়সেও এটি চলতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান মায়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, দুঃস্বপ্ন যখন ঘন ঘন ফিরে আসে, মানসিক অস্বস্তি তৈরি করে, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় এবং দিনের স্বাভাবিক কাজকর্মে প্রভাব ফেলে, তখন তাকে নাইটমেয়ার ডিসঅর্ডার বলা হয়। অর্থাৎ, এক-দুবার ভয়ংকর স্বপ্ন দেখলেই এই রোগ হয়েছে, এমন নয়। বরং দুঃস্বপ্ন কতটা নিয়মিত হচ্ছে এবং তা ব্যক্তির ঘুম ও দৈনন্দিন জীবনে কতটা প্রভাব ফেলছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

বারবার দুঃস্বপ্ন 

ঘুমের মধ্যে ভয়ংকর কিছু দেখে হঠাৎ জেগে উঠলেন।বুক ধড়ফড় করছে, মনে ভয়, অথচ জানেন সবই ছিল স্বপ্ন। কখনো এমন স্বপ্ন দেখার পর আবার ঘুমিয়ে পড়তে কষ্ট হয়। মাঝেমধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখা স্বাভাবিক হলেও, তা যদি বারবার ফিরে আসে, ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায় এবং দিনের স্বাভাবিক জীবনেও প্রভাব ফেলে, তাহলে এটি হতে পারে ‘নাইটমেয়ার ডিসঅর্ডার’ বা দুঃস্বপ্নজনিত ঘুমের ব্যাধি।

নাইটমেয়ার ডিসঅর্ডার

দুঃস্বপ্ন হলো এমন একটি ভয়ংকর স্বপ্ন, যা দেখে ঘুম ভেঙে যায় এবং ঘুম থেকে ওঠার পরও ভয়, উদ্বেগ কিংবা অস্বস্তি থেকে যায়। শিশুদের মধ্যে দুঃস্বপ্ন বেশি দেখা গেলেও যেকোনো বয়সের মানুষের এমন অভিজ্ঞতা হতে পারে। সাধারণত তিন থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখা শুরু হতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর প্রবণতা কমে আসে। তবে কেউ কেউ প্রাপ্তবয়স্ক বয়সেও কিংবা সারা জীবন দুঃস্বপ্ন দেখতে পারেন।

যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান মায়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, দুঃস্বপ্ন দেখা সাধারণ ঘটনা হলেও নাইটমেয়ার ডিসঅর্ডার তুলনামূলক বিরল। বারবার দুঃস্বপ্ন দেখা, এর কারণে মানসিক কষ্ট হওয়া, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটা, দিনের স্বাভাবিক কাজকর্মে সমস্যা তৈরি হওয়া এবং আবার দুঃস্বপ্ন দেখার ভয়ে ঘুমাতে না চাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে তাকে নাইটমেয়ার ডিসঅর্ডার বলা হয়।

দুঃস্বপ্নের লক্ষণ

সাধারণত ঘুমের দ্বিতীয়ার্ধে দুঃস্বপ্ন বেশি দেখা যায়। কারণ, এ সময় র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট বা আরইএম স্লিপের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি থাকে। ঘুমের এই পর্যায়েই সাধারণত দুঃস্বপ্ন দেখা যায়।দুঃস্বপ্ন কখনো খুব কম, আবার কখনো ঘন ঘন হতে পারে। এমনকি এক রাতেই কয়েকবার দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে যেতে পারে। স্বপ্নটি সাধারণত অল্প সময়ের হলেও ঘুম ভাঙার পর আবার ঘুমিয়ে পড়া কঠিন হতে পারে।

দুঃস্বপ্নের ক্ষেত্রে যেসব লক্ষণ দেখা যায়—

  • স্বপ্নটি খুব জীবন্ত ও বাস্তব বলে মনে হয়। স্বপ্ন যত এগোয়, তা তত বেশি ভীতিকর হয়ে উঠতে পারে।
  • স্বপ্নে সাধারণত ভয় বা বিপদের পরিস্থিতি থাকে। তবে অন্য অস্বস্তিকর বিষয়ও থাকতে পারে।
  • স্বপ্নের কারণে ঘুম ভেঙে যায় এবং ঘুম থেকে ওঠার পর ব্যক্তি সজাগ থাকেন ও স্বপ্নের কথা মনে করতে পারেন।
  • স্বপ্নের কারণে ভয়, উদ্বেগ, রাগ, দুঃখ কিংবা ঘৃণার মতো অনুভূতি হতে পারে।
  • ঘুম ভাঙার সময় ঘাম হতে পারে কিংবা হৃদস্পন্দন বেড়ে যেতে পারে।
  • দুঃস্বপ্নের কারণে আবার ঘুমিয়ে পড়তে অসুবিধা হয়।

তবে শুধু এসব লক্ষণ থাকলেই নাইটমেয়ার ডিসঅর্ডার হয়েছে, এমন নয়। দুঃস্বপ্নের পুনরাবৃত্তি, মানসিক কষ্ট এবং দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হয়।

দুঃস্বপ্নের কারণে বারবার ঘুমাতে ভয় লাগা, দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ বা আতঙ্ক তৈরি হওয়া, মনোযোগ ও স্মৃতিতে সমস্যা, দিনের বেলায় ঘুম ঘুম ভাব কিংবা শক্তি কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা সামাজিক জীবনে স্বাভাবিকভাবে কাজ করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ঘুমানোর সময় বা অন্ধকার নিয়ে আচরণগত সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

কেন দুঃস্বপ্ন দেখছেন 

নাইটমেয়ার ডিসঅর্ডার এক ধরনের প্যারাসমনিয়া। ঘুমের মধ্যে অনিচ্ছাকৃত কোনো আচরণ বা ঘটনা ঘুমে ব্যাঘাত ঘটালে তাকে প্যারাসমনিয়া বলা হয়। তবে দুঃস্বপ্নের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি। মায়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন কারণে দুঃস্বপ্ন দেখা দিতে পারে।

মানসিক চাপ ও উদ্বেগ

দৈনন্দিন জীবনের চাপ, যেমন বাড়ি বা পড়াশোনাসংক্রান্ত সমস্যা, দুঃস্বপ্নের কারণ হতে পারে। বাসা পরিবর্তন কিংবা পরিবারের কোনো সদস্যের মৃত্যু মতো বড় পরিবর্তনও দুঃস্বপ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। উদ্বেগের সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের দুঃস্বপ্ন দেখার ঝুঁকি বেশি।

আঘাতজনিত অভিজ্ঞতা

দুর্ঘটনা, শারীরিক আঘাত, শারীরিক বা যৌন নির্যাতন কিংবা অন্য কোনো আঘাতজনিত ঘটনার পর দুঃস্বপ্ন দেখা সাধারণ। পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার বা পিটিএসডিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যেও দুঃস্বপ্ন বেশি দেখা যায়।

পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া

ঘুমের সময়সূচিতে পরিবর্তন কিংবা প্রয়োজনের তুলনায় কম ঘুমানোর কারণে দুঃস্বপ্নের ঝুঁকি বাড়তে পারে। অনিদ্রার সমস্যার সঙ্গেও দুঃস্বপ্নের সম্পর্ক রয়েছে।

ওষুধের প্রভাব

কিছু অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধ ও বিটা ব্লকারের কারণে দুঃস্বপ্ন দেখা দিতে পারে। পারকিনসন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু ওষুধ এবং ধূমপান ছাড়তে সহায়তা করে এমন কিছু ওষুধও এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

অন্যান্য শারীরিক ও মানসিক সমস্যা

বিষণ্নতা এবং অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যার সঙ্গে দুঃস্বপ্নের সম্পর্ক থাকতে পারে। হৃদ্‌রোগ ও ক্যানসারের মতো কিছু শারীরিক অসুস্থতার সময়ও দুঃস্বপ্ন দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া পর্যাপ্ত ঘুমে বাধা সৃষ্টি করে এমন অন্য ঘুমের সমস্যার সঙ্গেও দুঃস্বপ্নের যোগসূত্র রয়েছে।

ভয়ংকর বই ও সিনেমা 

কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ঘুমানোর আগে ভয়ংকর বই পড়া, ভীতিকর সিনেমা দেখা কিংবা মানসিকভাবে অস্বস্তিকর সংবাদ দেখার সঙ্গে দুঃস্বপ্নের সম্পর্ক থাকতে পারে।

কারা বেশি ঝুঁকিতে

পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দুঃস্বপ্ন বা অন্য ঘুমের সমস্যার ইতিহাস থাকলে দুঃস্বপ্নের প্রবণতা বেশি হতে পারে। পিটিএসডি কিংবা বিষণ্নতার মতো অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যাও দুঃস্বপ্নের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে এসব ঝুঁকির কারণ থাকলেই যে কারও নাইটমেয়ার ডিসঅর্ডার হবে, এমন নয়।

দুঃস্বপ্নের কারণে যেসব সমস্যা দেখা দেয় 

দুঃস্বপ্নজনিত ঘুমের ব্যাধি দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব দিনের জীবনেও পড়তে পারে। এর কারণে কয়েক ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে।

  • প্রথমত, দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব হতে পারে। এতে কর্মক্ষেত্র বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাজের সমস্যা তৈরি হতে পারে। গাড়ি চালানো কিংবা মনোযোগ দিয়ে দৈনন্দিন কাজ করার ক্ষেত্রেও অসুবিধা হতে পারে।
  • দ্বিতীয়ত, বারবার বিরক্তিকর স্বপ্নের অভিজ্ঞতা দিনের বেলায়ও মানসিক অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। এর সঙ্গে উদ্বেগ বা বিষণ্নতার মতো মেজাজের সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
  • তৃতীয়ত, আবার দুঃস্বপ্ন দেখার ভয়ে কেউ ঘুমাতে যেতে চাইতে পারেন না। ফলে ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ আরও ব্যাহত হতে পারে।
  • গুরুতর ক্ষেত্রে আত্মহত্যার চিন্তা বা আচরণও দেখা দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেওয়া জরুরি। এ ছাড়া দুঃস্বপ্নের কারণে একই বাড়িতে থাকা মা-বাবা, জীবনসঙ্গী কিংবা অন্যদের ঘুমও ব্যাহত হতে পারে।

মাঝেমধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখা সাধারণত উদ্বেগের কারণ নয়। কিন্তু দুঃস্বপ্ন যদি বারবার ফিরে আসে, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়, ঘুমাতে ভয় তৈরি করে কিংবা দিনের স্বাভাবিক কাজকর্মে বাধা দেয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত।

LEAVE A REPLY