২০১১ সাল। হারারেতে বাংলাদেশ দল ছিল রেইনবো টাওয়ার্সে, বুলাওয়েতে হলিডে ইনে। টিম হোটেলেই তাঁবু বাংলাদেশের সফররত সাংবাদিকদের। তো, ব্রেকফাস্টে কিংবা ডিনারে রেস্টুরেন্টে গেলে দেখা মিলছে এক ভারতীয়র।
কলকাতার খাঁটি বাঙালি। ঘটনা কী? ভদ্রলোক পরিচয় দিলেন গৃহস্থালির সরঞ্জামের ব্যবসা করেন, জিম্বাবুয়েতে এসেছেন নতুন বাজার খুঁজতে। ভিজিটিং কার্ডও দিলেন, কিন্তু সন্দেহ যায় না। গুগলে সার্চ করে দেখি কম্পানি আছে, তবে অতটা স্বাস্থ্যবান নয় যে সুদূর আফ্রিকায় ব্যবসার পসার ঘটানোর চিন্তা-ভাবনা করবে।
বুলাওয়েতে ওই সিরিজের জন্য নিয়োজিত ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিলের নিযুক্ত অ্যান্টিকরাপশন ইউনিটের প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপের পর সব পরিষ্কার হয়ে গেল। মধ্যবয়সী ওই ব্যক্তি দক্ষিণ আফ্রিকার পুলিশ বিভাগে চাকরি করেছেন। অবসরের পর আকুতে (তখন আকসু বলা হতো) যোগ দিয়েছেন। একদিন ডিনারের পর চোখের ইশারায় ডাকলেন তিনি।
-তুমি কি আমার হয়ে একটা কাজ করে দিতে পারবে?
সেই কাজটি হলো, আমি যেন ভারতীয় ভদ্রলোকটিকে হোটেল ছেড়ে চলে যেতে বলি। আমি অবাক হয়ে জানতে চাই, ‘এটা তো আপনিই বলতে পারেন। আপনি আকসুর প্রতিনিধি!’ ভদ্রলোক আরো মিইয়ে যান, ‘আমাদের এখতিয়ার নেই।’
এটাই আইসিসির আকুর বাস্তবতা। তদন্ত কমিটি এর-ওর সহায়তায় তথ্য সংগ্রহ করে।
এরপর যদি কারো কাছ থেকে স্বীকারোক্তি মেলে, তবে ব্যবস্থা নিতে পারে। এমন সুযোগ তাদের কালেভদ্রে মেলে। তবে সতর্কতা হিসেবে আইসিসির দুর্নীতি দমন বিভাগ সন্দেহভাজনদের নাম তালিকা করে রাখে। জুয়াড়ি থেকে শুরু করে খেলোয়াড়, কর্মকর্তাদের বিশাল তালিকা আছে আইসিসির দুর্নীতি দমন বিভাগে। সেসব নাম সংশ্লিষ্ট দেশের বোর্ডের কাছে সরবরাহ করে আকু, যেন বোর্ড সতর্ক হতে পারে সন্দেহভাজনদের ব্যাপারে। মাঝেমধ্যে গোপন পরামর্শও আসে আইসিসির তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছ থেকে। যেমন—বিসিবির কাছে অন্তত একজন সাবেক খেলোয়াড়কে ক্রিকেটীয় কর্মকাণ্ডে যুক্ত না করার পরামর্শ দিয়েছিল আইসিসি। সেই থেকে এখনো তিনি ক্রিকেটের বাইরে আছেন।
তো, ভারতের সেই লোক বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত একটি বৈশ্বিক আসরেও বাংলাদেশে এসেছিলেন। ক্রিকেট-জুয়া বিষয়ে গভীর আগ্রহের যোগাযোগটা তখনো ছিল। চট্টগ্রামের একটি রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার খেতে খেতে নানাভাবে চেষ্টা করেছি, লোকটির সম্ভাব্য শিকার সম্পর্কে ধারণা নিতে। পারিনি। যদিও তত দিনে নিশ্চিত হয়েছি, কলকাতাবাসীর নাম আইসিসির দুর্নীতি দমন বিভাগে আছে। এমনকি ২০১১ বিশ্বকাপে তাঁকে স্টেডিয়াম কিংবা টিম হোটেলে প্রবেশে ‘নিরুৎসাহ’ করার পরামর্শ সহ-আয়োজক প্রতিটি দেশকে দিয়েছে আইসিসি। তবু তিনি দিব্যি ম্যাচ দেখে বেড়াচ্ছেন। সরকারি একটি সংস্থার সহায়তায় কললিস্টে চোখ বুলিয়ে দেখি, বিসিবির এক অধস্তনের সঙ্গে অস্বাভাবিক মাত্রার যোগাযোগ রয়েছে লোকটির। দুজনের দিনে বার দশেকও আলাপ হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদনের পর গ্রেপ্তার করা হয়েছিল লোকটিকে। কিন্তু দেশে বিদ্যমান এসংক্রান্ত আইন এতটাই ঢিলেঢালা যে কয়েক দিন পর মুক্তি পেয়ে তিনি নিজ দেশে ফিরে যান নিরাপদে।
মোটামুটি ক্রিকেট-জুয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যুগ যুগ ধরে এভাবেই নিরাপদে বিপদ এড়িয়ে চলেছেন! আগে জুয়াড়িরা ড্রেসিংরুমে ঢুকতেন ক্রিকেটীয় সরঞ্জামের এজেন্ট হয়ে। এখন নতুন নতুন পরিচয় যুক্ত হয়েছে। সন্দেহের ‘রাডারে’ দলসংশ্লিষ্ট সবার প্রফাইল ঘাঁটাঘাঁটি করে দুর্নীতি দমন বিভাগ। মোহাম্মদ আশরাফুলের জুয়ায় জড়িয়ে পড়ার খবর করার পর বিসিবির এক ঊর্ধ্বতন উষ্মা প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘আরে, আকসুর এই লোকটাই তো জুয়াড়ি!’ আবার বোর্ডকর্তাদের সন্দেহের বাইরে রাখেন না তদন্ত কর্মকর্তারা। মোটকথা, সবাই সবার দিকে সন্দেহের বন্দুক উঁচিয়ে আছেন।
প্রশ্ন হলো, আসলেই কি ক্রিকেটের এমন দুরবস্থা? স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছা মুশকিল। কারণ, ক্রিকেট-জুয়াসংক্রান্ত বিষয়গুলোর বেশির ভাগই সন্দেহমূলক। সাক্ষ্য-প্রমাণ জোগাড় করতে যে উপায়ে তদন্ত করা দরকার, সেটি করার অধিকার নেই দুর্নীতি দমন বিভাগের। যেমন—কোনো সন্দেহভাজনের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট কিংবা মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের অধিকার নেই দুর্নীতি দমন বিভাগের। সাকিব আল হাসানের গোয়েন্দা জালে ধরা পড়ার ব্যাপারটি মনে করে দেখুন। দীপক আগারওয়াল আগে থেকেই নজরদারিতে ছিলেন। সাকিবের সঙ্গে এই ভারতীয়র যোগাযোগের বিষয়টিও নিশ্চিত। তবু আটক দূরের কথা, এঁদের কাউকে সরাসরি জিজ্ঞাসাবাদের সাহস পাচ্ছিল না আকু। অতঃপর ভিড়ের মধ্যে দীপক আগরওয়ালের মোবাইল ছোঁ মেরে নিয়ে ফরেনসিক টেস্ট করানো হয়। তাতে হোয়াটসঅ্যাপের স্ক্রিনশট দেখিয়ে জুয়াড়ির সঙ্গে যোগাযোগের ব্যাপারে সাকিবের স্বীকারোক্তি আদায় করে আকু।
অতীতে খেলোয়াড়কে প্রলুব্ধ করা হতো দামি উপহার আর নগদ অর্থ দিয়ে। ‘হানি ট্র্যাপে’র গল্পও আছে। যোগাযোগ হতো সরাসরি। তবে দিন বদলেছে। এখন বিটকয়েন আছে। আছে বিশ্বস্ত বন্ধু, সাবেক সতীর্থ থেকে শুরু করে জুয়ার শর্তাবলির ফেরিওয়ালা হতে শোনা যায় নিকটাত্মীয়দেরও। মোটকথা, পেছনে কোনো প্রমাণ না রাখার জন্য উদ্ভাবনী শক্তি ও প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার হয় আজকাল। তাতে ঢাল-তলোয়ারহীন ‘নিধিরাম সর্দার’ আকুর কাজ আরো কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে যেসব দেশে এজাতীয় কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে কঠোর আইন আছে, সেসব দেশে সমস্যা কম। আইনের সুবিধা নিয়ে সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে উপযুক্ত তদন্ত করতে পারেন সেসব দেশের গোয়েন্দারা। সেখানে গ্যালারিতে জুয়াড়ির শখানেক তথ্য সরবরাহকারীকে এবারের বিপিএলে পাকড়াও করেছে বিসিবির আকু। কিন্তু শাস্তি হিসেবে গ্যালারি ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ প্রদান ছাড়া আর কিছু করা সম্ভব হয়নি। বিদ্যমান আইনে এর বেশি কিছু করা সম্ভবও নয়। বড়জোর থানায় সোপর্দ করা যায়। তবে আইনের ফাঁক গলে দ্রুতই মুক্তি মিলবে জুয়াড়ির তথ্য সরবরাহকারীর। অতীতে এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। তাই আর থানা পুলিশ করে না বিসিবির আকু। ‘আর মাঠে আসব না’-জাতীয় মুচলেকা দিয়ে চলে যান পাকড়াও হওয়া ব্যক্তি। জানিয়ে রাখা ভালো, এই তথ্য সরবরাহকারীরা সারাক্ষণ মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকেন। মাঠের খেলা টিভিতে সম্প্রচার হতে আজকাল ৩০ সেকেন্ডের মতো সময় লাগে। তো, তথ্য সরবরাহকারীর কাজ হলো মাঠে বসে তাৎক্ষণিক প্রতিটি বলের বার্তা দ্রুততম সময়ে জুয়াড়িকে অবহিত করা। তাতে বাজির দর নিজেদের পক্ষে রাখা সহজ হয়। আবার মাঠ থেকে খেলোয়াড়ের ইঙ্গিতপূর্ণ ইশারার তথ্যও জুয়াড়ি প্রতিষ্ঠানের কাছে সরবরাহ হয় গ্যালারি থেকে। একটু খুলে বলি। ধরুন, কোনো ব্যাটার হঠাৎ গ্লাভস বদলাতে চাচ্ছেন। কিংবা কোনো বোলারের কোমর থেকে রুমাল পড়ে গেল। এমন ইঙ্গিতের ফল কী হবে, তা নিয়ে দুই পক্ষ আগে থেকে নির্ধারণ করে রাখে। এত দিনে এমন আরো কত চমৎকারিত্ব তৈরি হয়েছে, কে জানে!
দুর্নীতি দমন সংস্থার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারাও নিয়ত জুয়ার নতুন নতুন পন্থার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন। কিন্তু প্রতিকার করতে পারছেন না। নির্দিষ্ট খেলোয়াড়, কর্মকর্তা, দল কিংবা ম্যাচকে ঘিরে তৈরি সংশয় নিয়ে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে হন্যে হয়ে ঘুরছেন আকুর কর্মকর্তারা। কিন্তু তদন্তের গভীরে যাওয়ার পথ আর খুঁজে পাচ্ছেন না তাঁরা। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষার ধারাবলে সন্দেহভাজন খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত নথি নাড়াচাড়ার সুযোগ নেই আকুর কর্মকর্তাদের।
অথচ যদি আইনি সুযোগ থাকত, তাহলে শত সতর্কতা সত্ত্বেও সন্দেহভাজনদের ‘ট্রেইল’ ঠিক খুঁজে পেতেন তদন্ত কর্মকর্তারা। একজন সন্দেহভাজন এবং তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের যোগাযোগ ও আয়-ব্যয় ঘাঁটাঘাঁটি করলে সূত্র মিলে যেতে পারে। জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়টি তখন স্রেফ আনুষ্ঠানিকতা আর থাকত না।
তদন্তে সহায়ক আইন কবে প্রণীত হবে, কে জানে। আপাতত আইসিসির পুরনো একটি পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারে বিসিবি। সেটি হলো, অতি সন্দেহভাজনদের ক্রিকেট থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখা। ঘটা করে কাউকে নির্বাসনে পাঠানোর এখতিয়ার নেই বিসিবির। তবে ইনিয়ে-বিনিয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি কিংবা ঢাকার ক্লাবগুলোকে সন্দেহভাজনদের তালিকা কিন্তু দিতে পারে বিসিবি। আর জাতীয় লিগ ও বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগ বিসিবির নিজস্ব আয়োজন। অনায়াসে সেসব ক্রিকেটার ও কর্মকর্তাকে উপেক্ষা করতে পারে বিসিবি। এতে ক্রিকেটসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিশ্চিত একটা সতর্কবার্তা পেয়ে যাবেন। অবশ্য জুয়ায় জড়িয়ে নিষিদ্ধ হওয়ার হুমকি সবার জানা। তবু বৈশ্বিক ক্রিকেটে এর ব্যাপ্তি বাড়ছে। তাতে জুয়া ক্রিকেট থেকে পুরোপুরি দূর করা কঠিন বটে। তবে অভিযুক্তদের ক্রিকেট থেকে দূরে রেখে বোর্ড অন্তত নিজের চেষ্টাটা চালিয়ে যেতে পারে।










































