বইপ্রেমী তাঁরা

বাঁ থেকে খায়রুল বাসা, নাজিয়া হক অর্ষা ও মামুনুর রশীদ

ভাষার মাস, বইয়ের মাস—ফেব্রুয়ারি। রিলস ও শর্টসের এই যুগে বই পড়ার অভ্যাস কমেছে তো বটে। তবু এখনো অনেকে স্বস্তি খোঁজে ছাপা অক্ষরে। ভাষা ও বইমেলার এই মাসে শোবিজের কয়েকজন তারকার কাছে জানতে চাওয়া হলো, সর্বশেষ কোন বইটি পড়েছেন? কেমন লেগেছে সেটা? শুনেছেন কামরুল ইসলাম।

সর্বশেষ যে বই পড়েছি
নাজিয়া হক অর্ষা, অভিনয়শিল্পী

দুই বাড়ি
যখনই মন অস্থির হয় বিভূতির লেখা পড়ি

আমি সব সময়ই কিছু না কিছু পড়তে থাকি। ইদানীং পড়ছি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘দুই বাড়ি’। ভীষণ ভালো লাগছে। আসলে বিভূতির লেখা বরাবরই ভালো লাগে আমার।কারণ তিনি প্রকৃতি ও জীবনকে খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেন। খুব সাবলীলভাবে বর্ণনা করেন। যখনই মন একটু অস্থির হয়, তাঁর লেখা পড়ি। এতে একটু স্বস্তি পাওয়া যায়।তাঁর লেখার মধ্য দিয়ে গ্রাম-বাংলার অপরূপ সময়ে ফেরা যায়। শৈশব-কৈশোরের কথা মনে পড়ে। ‘দুই বাড়ি’র ক্ষেত্রেও তাই হচ্ছে।

সর্বশেষ যে বই পড়েছি
মামুনুর রশীদ, অভিনেতা-নাট্যকার-নির্দেশক

জগৎ কুটির ও ইশকনামা
মনে হয়েছে যেন সমুদ্রে পড়ে গেলাম

দুটো বই পড়েছি। দুটোর কথাই বলব।

একটা হলো অমর্ত্য সেনের ‘জগৎ কুটির’। আত্মজীবনীমূলক বই। তাঁর লেখার ধরন এত চমৎকার, মনে হচ্ছে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে দৌড়াচ্ছি। তাঁর কৈশোর, যৌবন, পুরো বিশ্বে কত মানুষের সঙ্গে তাঁর পরিচয়, কত জ্ঞান অর্জন করেছেন—সব তুলে ধরেছেন।

অসাধারণ একটা বই পড়লাম। একটা পর্যায়ে মনে হয়েছে, যেন সমুদ্রের মধ্যে পড়ে গেলাম। এটা শেষ করেই শুরু করেছি রন্তিদেব সেনগুপ্তের উপন্যাস ‘ইশকনামা’। অযোধ্যার নবাব ওয়াজেদ আলি শাহর জীবন নিয়ে লেখা বইটি। সত্যজিৎ রায়ের ‘শতরঞ্জ কি খিলাড়ি’ ছবিতে আমজাদ খান যে চরিত্র করেছেন, সেটা ওয়াজেদ আলি শাহর। সিপাহি বিদ্রোহের সময় অযোধ্যা থেকে তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় কলকাতায়। তাঁর যে বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবন; একজন নবাব, আবার তিনি শায়েরি লিখছেন, গানের সুর করছেন। ওদিকে সাম্রাজ্য গোল্লায় যাক! বইটি এখনো পড়ছি। দুটো বই আমাকে আলোড়িত করেছে।

সর্বশেষ যে বই পড়েছি
মাসুম রেজা, নাট্যকার

ভেরোনিকা ডিসাইডস টু ডাই
সম্মিলিত পাগলামি সুস্থ মানুষের মতামতের চেয়েও শক্তিশালী

সম্প্রতি পড়েছি পাওলো কোয়েলহোর উপন্যাসিকা ‘ভেরোনিকা ডিসাইডস টু ডাই’। অনেক আগে একবার পড়েছিলাম। কয়েক দিন আগে ভালোভাবে আবার ঝালাই করে নিলাম। এটা তো অসাধারণ বই। ব্রাজিলিয়ান লেখক পাওলো কোয়েলহো। আমি মনে করি, তিনি নোবেল পাওয়ার মতো লেখক এবং যেকোনো বছর পেয়েও যাবেন। বইটির বিষয়বস্তু পাঠককে দারুণভাবে নাড়া দেয়। গল্পের ভেরোনিকা একটা সুখী মেয়ে। কিন্তু হঠাৎ সে সিদ্ধান্ত নেয় আত্মহত্যা করবে। এরপর সে একটি সুইসাইড নোট লেখে বাবার উদ্দেশ্যে। পরে একসঙ্গে অনেক ঘুমের ট্যাবলেট খায় ভেরোনিকা। পরদিন সে নিজেকে আবিষ্কার করে একটি মানসিক হাসপাতালে। অর্থাৎ সে বেঁচে যায়। এর মধ্যেই জানতে পারে, কিছুদিনের মধ্যে সে আসলেই মারা যাবে। অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ খাওয়ার কারণে তার হার্টে সমস্যা দেখা দিয়েছে। মানসিক হাসপাতালের অন্য রোগীদের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। এর মধ্য দিয়ে ভেরোনিকা লক্ষ করে, সুস্থ থাকাকালীন সে যা যা করতে পারেনি, এখন সে সবই করতে পারছে। কারণ সবাই তাকে পাগল ভাবে, আর পাগল সবই করতে পারে। খুব ইন্টারেস্টিং ব্যাপার কিন্তু। বইটাতে একটা প্রসঙ্গ আছে, সম্মিলিত পাগলামি একজন সুস্থ মানুষের মতামতের চেয়েও শক্তিশালী। যেটা আমার দারুণ লেগেছে।

সর্বশেষ যে বই পড়েছি
মাসুদ হাসান উজ্জ্বল, নির্মাতা ও সংগীতশিল্পী

দ্য সেলেস্টিন প্রফেসি
বিষয়বস্তু আধ্যাত্মিক কাঠামো থ্রিলার ঘরানার

সম্প্রতি পড়েছি জেমস রেডফিল্ডের ‘দ্য সেলেস্টিন প্রফেসি’। এটা মূলত মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক বিষয়বস্তু নিয়ে লেখা একটা উপন্যাস। প্রাচ্যের প্রাচীন দর্শন এবং নতুন যুগের আধ্যাত্মিকতার ধারণা নিয়ে লেখা। প্রধান চরিত্রটি পেরুর একটি প্রাচীন পাণ্ডুলিপিতে থাকা ৯টি আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টির একটি সিরিজ খুঁজে বের করতে এবং বুঝতে একটি যাত্রা শুরু করে। আধ্যাত্মিক বিষয়বস্তু নিয়ে রচিত হলেও এর কাঠামো খানিকটা থ্রিলার ঘরানার। বইটি একজন বর্ণনাকারীর দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা, যিনি তাঁর জীবনের একটি পরিবর্তনকালীন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। বইটি প্রথম পড়েছিলাম ১৯৯৫ সালে। এখন আবার নতুন করে পড়লাম। এ ধরনের রচনা বরাবরই আমাকে আনন্দ দেয়। স্কুলজীবনে আমার পড়া এমন আধ্যাত্মিক-দার্শনিক যাত্রার আরেকটি গল্প হেরমান হেসের ‘সিদ্ধার্থ’।

সর্বশেষ যে বই পড়েছি
মৌটুসী বিশ্বাস, অভিনয়শিল্পী

কমলকুমার মজুমদারের গল্পসমগ্র
তাঁর শব্দচয়ন এত সুন্দর!

এখন পড়ছি কমলকুমার মজুমদারের গল্পসমগ্র। উনাকে আমি আবিষ্কার করেছি কিছুদিন আগেই। অপর্ণা সেন ও তাঁর স্বামী কল্যাণ রায়ের এক সাক্ষাৎকারে। কানে হেডফোন গুঁজে প্রায়ই এ রকম ইন্টারভিউ শুনতে থাকি। তাঁদের সাক্ষাৎকারটা ছিল বাংলা ভাষা নিয়ে। সেখানেই কমলকুমার মজুমদারের কথা শুনেছি। এরপর আমি বই অর্ডার করে সংগ্রহ করলাম। ছোটগল্পের বই। একটি গল্প পড়লাম ‘লাল জুতো’। এটা তিনি লিখেছিলেন ১৩৪৪ বঙ্গাব্দে। প্রায় এক শ বছর আগে। খুব সিম্পল একটি গল্প। কিন্তু ভাষার প্রয়োগ, শব্দচয়ন এত সুন্দর! জুতার অবস্থা খুব খারাপ, এর জন্য টাকা চাইতে হবে। এটা বোঝাতে তিনি একটি জায়গায় লিখেছেন, ‘জুতোর অবস্থা অসম্মানজনক।’ এ রকম ছোট ছোট কিন্তু চমৎকার জিনিসগুলো আছে। আমরা ক্রমেই সুন্দর শব্দগুলো হারিয়ে ফেলছি। কারণ চর্চা কমে গেছে। প্রমিত বাংলায় কয়জন কথা বলেন! তবে আমি এবং আমার মেয়ে প্রমিত বাংলায় কথা বলি। হ্যাঁ, ভাষা নদীর মতো বহমান। পরিবর্তন আসাই স্বাভাবিক। তবে প্রমিত বাংলা এবং সুন্দর সুন্দর শব্দের কারণে কমলকুমার মজুমদারের গল্পগুলো আমার ভীষণ ভালো লাগছে।

সর্বশেষ যে বই পড়েছি
খায়রুল বাসার, অভিনয়শিল্পী

রাত ভ’রে বৃষ্টি
বইটা পড়ে আশ্চর্য হয়েছি

ব্যস্ততার কারণে নিয়মিত পড়ার সুযোগ হয় না। সম্প্রতি পড়েছি বুদ্ধদেব বসুর ‘রাত ভ’রে বৃষ্টি’। বইটি পড়ে আশ্চর্য হয়েছি উনার লেখার ধরন দেখে। শব্দ-ভাষা সহজ, তবে হাইলি স্মার্ট। মানে জটিল না, সহজে হৃদয়ের সঙ্গে সংযোগ ঘটে। বলা যায়, তাঁর লেখায় একটা ম্যাজিক আছে। পড়তে পড়তে এমন হয়, আমিই গল্পের ভেতরে ঢুকে গেছি। মনে হয়েছে, গল্পের চেয়ার-টেবিল নিজেই স্পর্শ করছি। উপন্যাসটি এক দম্পতিকে ঘিরে। তাদের মধ্যকার সম্পর্কের টানাপড়েন, সংসার ও ভালোবাসা নিয়ে স্ত্রীর স্বপ্ন, সেটা যথাযথভাবে পূর্ণ না হওয়া নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত, অন্য মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া, আবার ন্যায্য-অন্যায্যতার বিষয়েও ভাবা—সব দিক খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন লেখক।

LEAVE A REPLY