ইরানের তেলের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বড় সুবিধাভোগী হতে পারে ভারত

ইরানের তেল শিল্পকে অপ্রত্যাশিত স্বস্তি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন ৬০ দিনের জন্য একটি বিশেষ ছাড় (ওয়েভার) ঘোষণা করেছে, যার ফলে আগামী ২১ আগস্ট পর্যন্ত ইরানের অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের উৎপাদন, বিক্রি, সরবরাহ এবং আমদানি কার্যক্রম চালানো যাবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা, সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক পরিদর্শন পুনরায় চালুর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক দেশ ভারত এই সিদ্ধান্ত থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে লাভবান হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে ভারতীয় বন্দরে ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার ভিড়বে না, তবে দীর্ঘদিন পর নয়াদিল্লির সামনে নতুন একটি বড় জ্বালানি উৎসের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। 

যুক্তরাষ্ট্র কী ঘোষণা করেছে?

মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় (ট্রেজারি) একটি অস্থায়ী সাধারণ লাইসেন্স জারি করেছে, যার আওতায় ইরানের ক্রুড অয়েল, পেট্রোলিয়াম পণ্য ও পেট্রোকেমিক্যালস সংশ্লিষ্ট লেনদেন অনুমোদন করা হয়েছে। এর মধ্যে জাহাজ পরিবহণ, বীমা ও ব্যাংকিং সেবাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

২১ আগস্ট পর্যন্ত কার্যকর থাকা এই ছাড়কে স্থায়ীভাবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হিসেবে নয় বরং ইরানের সঙ্গে আস্থা বৃদ্ধির একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইরান আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে (আইএইএ) পুনরায় পরিদর্শনের সুযোগ দিতে এবং বিস্তৃত কূটনৈতিক আলোচনায় অংশ নিতে সম্মত হওয়ার পরই এই সিদ্ধান্ত এসেছে।

ঘোষণার পরপরই আন্তর্জাতিক তেলবাজারে প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অতিরিক্ত তেল সরবরাহের সম্ভাবনায় অপরিশোধিত তেলের দাম কমতে শুরু করে।

ভারতের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ভারত তার মোট তেল চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওঠানামা সরাসরি দেশটির আমদানি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, সরকারি অর্থনীতি এবং ভোক্তাদের জ্বালানি খরচের ওপর প্রভাব ফেলে।

গত কয়েক বছরে ভারতের তেল আমদানির উৎসে বড় পরিবর্তন এসেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ভারত ছাড়মূল্যের রুশ তেলের অন্যতম বড় ক্রেতায় পরিণত হয়। বর্তমানে ভারতের মোট তেল আমদানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ থেকে ৪০ শতাংশ আসে রাশিয়া থেকে।

অন্যদিকে সৌদি আরব, ইরাক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপরও ভারতের নির্ভরতা রয়ে গেছে। ২০২৫ সালে ভারতের মোট তেল আমদানির প্রায় অর্ধেকই এসেছে ওপেকভুক্ত দেশগুলো থেকে।

এ অবস্থায় ইরানের তেল আবার বাজারে ফিরলে ভারতের জন্য সরবরাহের একটি নতুন বিকল্প তৈরি হবে।

ইরানের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ সম্পর্ক

২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগে ইরান ছিল ভারতের অন্যতম প্রধান তেল সরবরাহকারী দেশ।

প্রতিযোগিতামূলক দাম, সহজ ঋণ সুবিধা এবং তুলনামূলক কম পরিবহণ ব্যয়ের কারণে ভারতীয় পরিশোধনাগারগুলো ইরানি তেলকে গুরুত্ব দিত। তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ভারতীয় কোম্পানিগুলোকে ইরান থেকে তেল আমদানি বন্ধ করতে হয়।

বর্তমান ছাড়ের ফলে ভারতীয় পরিশোধনাগার ও ইরানি সরবরাহকারীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

ভারত কি আবার ইরানি তেল কিনতে পারবে?

তাৎক্ষণিকভাবে বড় পরিসরে নয়।

কারণ বর্তমান ছাড়ের মেয়াদ মাত্র ৬০ দিন এবং এটি চলমান কূটনৈতিক আলোচনার অগ্রগতির ওপর নির্ভরশীল। সাধারণত তেল পরিশোধনাগারগুলো দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা ছাড়া বড় আকারের ক্রয়চুক্তিতে যেতে চায় না।

তবে এই সিদ্ধান্ত স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে আলোচনা ইতিবাচক হলে ধীরে ধীরে ইরানের তেল আবার বৈশ্বিক বাজারে ফিরতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়লে দাম কমার সম্ভাবনা থাকে। ফলে ভারত সরাসরি ইরানি তেল বেশি না কিনলেও বৈশ্বিক দামের পতন থেকে লাভবান হতে পারে।

হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব

ভারতের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগরকে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের সঙ্গে যুক্ত করা এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে ভারতের বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি হয়।

সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা এবং তেলের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফনের শঙ্কা তৈরি হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতায় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফলে এ রুটে ঝুঁকি কমলে ভারত সরাসরি উপকৃত হবে।

কমতে পারে ভারতের আমদানি ব্যয়

ভারতের বার্ষিক তেল আমদানি ব্যয় ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে সামান্য পতনও দেশটির জন্য বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলার সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

এ কারণেই তেল উৎপাদনকারী অঞ্চলের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিবর্তনের দিকে গভীর নজর রাখে নয়াদিল্লি।

বিশ্লেষকদের মতে, যদি ইরানের তেল আবার বড় পরিসরে বাজারে ফিরতে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কমে আসে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম চাপে থাকতে পারে। এর ফলে ভারতের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আমদানি ব্যয় কমানো এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য উন্নত করার প্রচেষ্টা আরও শক্তিশালী হবে।

সূত্র: এনডিটিভি

LEAVE A REPLY