লাইভ চলাকালে গুলিতে হত্যা, কেন টার্গেট মেক্সিকোর ইনফ্লুয়েন্সাররা?

মেক্সিকোর সিনালোয়া রাজ্যে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এক তরুণ ইনফ্লুয়েন্সারকে সরাসরি লাইভস্ট্রিম চলাকালে গুলি করে হত্যা করার ঘটনা ঘটেছে। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর থেকে মেক্সিকোর সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও অপরাধী চক্রগুলোর (কার্টেল) মধ্যকার সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

একটি ফাস্টফুড রেস্তোরাঁর বাইরে দুই বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছিলেন তরুণ ইনফ্লুয়েন্সার সিজার গাস্তেলুম। তখন তিনি ফেসবুকে লাইভস্ট্রিমে যুক্ত ছিলেন। হঠাৎ করেই একটি মোটরসাইকেলে দুই ব্যক্তি তার দিকে এগিয়ে আসে। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বাইকের চালক গাস্তেলুমের মাথায় একদম কাছ থেকে গুলি করে দ্রুত চম্পট দেয়। পুরোটাই ঘটে লাইভে উপস্থিত শত শত দর্শকের চোখের সামনে। 

ঘটনার বিস্তারিত প্রকাশ না করলেও সিনালোয়া রাজ্যের প্রসিকিউটরের কার্যালয় জানিয়েছে, তদন্তের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হলো গাস্তেলুমের পোস্ট করা কিছু বিষয়বস্তু—যার বেশ কয়েকটি একটি নির্দিষ্ট অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। 

যদিও কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে গাস্তেলুম কোনো হুমকি পাননি কিংবা পুলিশের কাছেও কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকার সূত্রে তিনি অভিযুক্ত ছিলেন না। তবুও দুই বছর আগে সিনালোয়া কার্টেলের দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী অপরাধী গোষ্ঠীর মধ্যে প্রাণঘাতী যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১০ জন কনটেন্ট ক্রিয়েটর প্রাণ হারালেন।

মেক্সিকোর ইবেরোআমেরিকান ইউনিভার্সিটির যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ক্লদিয়া আরুনিয়া জানান, নেটদুনিয়ার অ্যালগরিদম এবং ড্রাগ কার্টেল—উভয়ই দ্রুততম উপায়ে ভোগবাদ ও বিলাসী জীবনকে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে প্রচার করে। এখন আর নিয়মতান্ত্রিক ক্যারিয়ারের চেয়ে রাতারাতি উত্থানকেই সাফল্যের মডেল ধরা হয়।

তিনি আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিলাসী জীবন তুলে ধরে তা পরোক্ষভাবে মাদকের ব্যবসার চালচিত্র ও শক্তির সঙ্গে মিলিয়ে প্রচার করা হয়, যা ‘নারকো-সংস্কৃতি’কে উৎসাহিত করে। গাস্তেলুম নিজেও দামী গাড়ি, নৈশজীবন ও বিলাসবহুল সফরের ছবি শেয়ার করতেন। এমনকি ২০২৪ সালে খুন হওয়া আরেক ইনফ্লুয়েন্সার ‘এল গোর্ডো পেরুসি’র কবরে ছবি তুলতেও তাকে দেখা গেছে। 

তবে কনটেন্ট ক্রিয়েটররা নিজেদের ‘নারকো-ইনফ্লুয়েন্সার’ তকমা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের দাবি, কুশিয়াকানের মতো জায়গায় একজন তরুণ ও পরিচিত মুখ হিসেবে বিলাসী জীবন দেখালেই কার্টেলদের টার্গেটে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। 

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের মতো কাজ করা এই কার্টেলগুলো নিজেদের ‘ব্র্যান্ড’ প্রচার করার জন্য ইনফ্লুয়েন্সারদের ব্যবহার করে থাকে। ফলে দুটি দল যখন একে অপরের মুখোমুখি হয়, তখন একদলের হয়ে প্রচারণা চালানো ব্যক্তিত্বরা অন্যদলের কাছে সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। 

যেমন, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে কুশিয়াকানের আকাশে বিমান থেকে প্রচারপত্র ফেলা হয়। সেখানে ২৫ জন ইনফ্লুয়েন্সার ও সংগীতশিল্পীকে ‘লা মায়িজা’ দলের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযুক্ত করা হয়। এদের মধ্যে চারজনকে হত্যার তালিকায় ‘নির্মূল’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে আরও দুজন খুন হন। 

সরকারের অবস্থান ও পদক্ষেপ 

এই ঘটনা প্রসঙ্গে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবাম জানিয়েছেন, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি এবং নির্দেশদাতাদের শাস্তির আওতায় আনতে স্থানীয় ও জাতীয় কর্তৃপক্ষ একযোগে কাজ করছে। একই সঙ্গে মেক্সিকো সরকার নানা পদক্ষেপে অপরাধ ও অপরাধী সংস্কৃতির সঙ্গে পপ কালচারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চালাচ্ছে। 

অফিশিয়াল তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মেক্সিকোতে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ৪৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। তা সত্ত্বেও, গাস্তেলুমের মতো প্রকাশ্যে লাইভস্ট্রিমে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে গভীর আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে—যা ইঙ্গিত দেয় যে রাস্তায় কিংবা ডিজিটাল মাধ্যমে, ড্রাগ কার্টেলগুলোর রক্তক্ষয়ী ক্ষমতার বলয় এখনো বিদ্যমান। 

সূত্র: বিবিসি 

LEAVE A REPLY