বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ফিফা তাদের বড় বড় টুর্নামেন্টগুলোর স্বত্ব বা অংশীদারি বেসরকারি বিনোয়োগকারীদের কাছে বিক্রির উদ্যোগ নিতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েছে ইউরোপীয় ফুটবলের গভর্নিং বডি উয়েফা। বিতর্কিত এই প্রস্তাবের কড়া জবাব দিতে চলতি সপ্তাহের শেষের দিকেই নিজেদের ৫৫টি সদস্য দেশকে নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসতে যাচ্ছে সংস্থাটি।
ফিফা তাদের বিশ্বকাপসহ প্রধান প্রধান টুর্নামেন্টগুলো পরিচালনার জন্য নতুন একটি বাণিজ্যিক অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বা সাবসিডিয়ারি গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছে। এতে বাইরের বাণিজ্যিক বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কেনার সুযোগ পাবেন। ফিফার দাবি, এই বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্জিত বিপুল অর্থ বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের উন্নয়নে বিলিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। তবে উয়েফার আশঙ্কা, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ফুটবলের নিয়ন্ত্রক কাঠামোর বড় অংশই চলে যাবে বেসরকারি স্বত্বাধিকারীদের হাতে।
মঙ্গলবার ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাবটি প্রকাশের আগেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়লে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় উয়েফা। তারা কড়া ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, ফিফা এবার সত্যি সত্যিই ‘সীমা লঙ্ঘন করেছে’। এ কারণেই ভার্চুয়াল এই জরুরি বৈঠকের ডাক দেওয়া হয়েছে, যেখান থেকে বড় ধরনের কোনো কঠোর সিদ্ধান্ত বা প্রতিহত করার পরিকল্পনা আসতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এই বৈঠকে ফিফা টুর্নামেন্ট বয়কটের বিষয়টিও আলোচনার টেবিলে উঠতে পারে।কারণ ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ) ইতোমধ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছে, এই প্রস্তাব তৈরির আগে তাদের কোনো মতামতই নেওয়া হয়নি। ফিফার মোট ২১টি সদস্য দেশের মধ্যে উয়েফার সদস্য মাত্র এক-চতুর্থাংশ হলেও, বিশ্ব ফুটবলের সেরা দলগুলো কিন্তু ইউরোপেরই। সদ্য শেষ হওয়া ২০২৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের ৮টি দলের ৬টিই ছিল ইউরোপের, এমনকি চ্যাম্পিয়ন হওয়া স্পেনও উয়েফার সদস্য। ফলে উয়েফা ভালো করেই জানে, ইউরোপীয় দেশগুলোকে ছাড়া ফিফার যেকোনো টুর্নামেন্টের বাজারমূল্য মুহূর্তেই তলানিতে গিয়ে ঠেকবে।
ফিফার অজুহাত হলো, বিশ্বজুড়ে ফুটবলের বিকাশের স্বার্থেই এমন নতুন পথ খোঁজা হচ্ছে।কিন্তু ফুটবল বোদ্ধাদের ভয়, উপার্জন বাড়ানোর এই অন্ধ দৌড়ে পুরুষ ও নারী বিশ্বকাপ কিংবা ক্লাব বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টগুলো হয়তো আরো ঘনঘন ও বাড়তি দল নিয়ে আয়োজন করা শুরু হবে। এতে ফুটবলারদের ব্যস্ত সূচিতে বড় প্রভাব পড়বে, যা ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের নতুন কলেবরের কারণে চরম চাপে রয়েছে।
বিবিসি স্পোর্টসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইংলিশ ফুটবলের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন, ফিফার এই পরিকল্পনা ফুটবলের জন্য ততটাই বিপজ্জনক, যতটা ছিল ২০২১ সালের বিতর্কিত ‘ইউরোপীয় সুপার লিগ’। তবে সুপার লিগ প্রকল্প যেমন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মুখ থুবড়ে পড়েছিল, ফিফা ততটা সহজে পিছু হটবে বলে মনে হয় না। কারণ বিশ্বজুড়ে সংস্থাটি উন্নয়ন তহবিল ১০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা এবং ২১১টি সদস্য দেশের প্রতিটিকে ২০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত এককালীন অনুদান দেওয়ার লোভনীয় টোপ দিয়ে রেখেছে।
বাস্তবে ফিফা ও উয়েফার মধ্যকার সম্পর্কের টানাপোড়েন নতুন কিছু নয়। ২০২১ সালে আর্সেনালের সাবেক কোচ ও বর্তমানে ফিফার গ্লোবাল ফুটবল ডেভলপমেন্ট প্রধান আর্সেন ভেঙ্গার যখন প্রতি দুই বছর পর পর বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তখনও গর্জে উঠেছিল উয়েফা।
এমনকি সম্প্রতি শেষ হওয়া বিশ্বকাপের ফাইনালে উয়েফা সভাপতি আলেকজান্ডার সেফেরিন উপস্থিত না থেকে ম্যাচ বয়কট করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে মার্কিন ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগানের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করাসহ একাধিক বিতর্কিত সিদ্ধান্তের প্রতিবাদেই সেই পথ বেছে নিয়েছিলেন তিনি।









































