পাকিস্তানে আলজাজিরা নিষিদ্ধ!

সংগৃহীত ছবি

পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের ঘটনায় পাকিস্তানে আলজাজিরাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে পাকিস্তান সরকার আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা না দিলেও ব্যবহারকারীদের অনেকেই বলছেন, তারা কাতারভিত্তিক প্রভাবশালী সম্প্রচারমাধ্যম আলজাজিরার ইংরেজি সংস্করণের ওয়েবসাইটে ঢুকতে পারছেন না।

আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ না করলেও পাকিস্তান সরকার কাশ্মীর নিয়ে আলজাজিরার প্রতিবেদনের তীব্র সমালোচনা করেছে। পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় আলজাজিরার বিরুদ্ধে হলুদ সাংবাদিকতার অভিযোগ এনেছে।

মন্ত্রণালয়ের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘মুজাফফরাবাদের নির্দিষ্ট কিছু পোলিং স্টেশন থেকে আলজাজিরার পক্ষপাতমূলক ও বাছাই করা রিপোর্টিং আমাদের নজরে এসেছে। সুপরিকল্পিত টাইমিং এবং নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির শিখিয়ে দেওয়া বক্তব্যের মাধ্যমে চ্যানেলটি কাশ্মীরের নির্বাচন এবং ভোটপ্রক্রিয়াকে ভুলভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছে।’

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ‘এ ধরনের হলুদ সাংবাদিকতা কেবল কায়েমি স্বার্থান্বেষী বহিরাগত শক্তির এজেন্ডাকেই নিশ্চিত করে। তারা এই নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে অবৈধ প্রমাণ করতে চায় এবং কাশ্মীরের জনগণের গণআকাঙ্ক্ষাকে ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে।’

তবে আলজাজিরার বিরুদ্ধে সরকারের এই ক্ষোভ এবং অনানুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা নতুন কিছু নয়। গত ৫ জুন আন্দোলন শুরুর পর থেকেই ইসলামাবাদ আন্দোলনকারীদের পিছু হটাতে সরকার নিষ্ঠুর দমননীতির পাশাপাশি অঞ্চলটিতে খাদ্য, জ্বালানি এবং ওষুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ও জীবনরক্ষাকারী পণ্যের প্রবেশ সীমিত বা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে।ইন্টারনেট ও স্যাটেলাইট সেবা বন্ধ করে দেওয়ার ফলে ব্যাংকিং এবং এটিএম সেবাসমূহ অচল হয়ে পড়েছে।

এ ছাড়া গণমাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ আরোপ, কারফিউ জারি করে সরকার কাশ্মীরকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। আলজাজিরার আগেও নিরাপত্তা বাহিনীর দমনপীড়নের খবর প্রচার করায় একাধিক স্থানীয় ও আঞ্চলিক ডিজিটাল নিউজ পোর্টালের ওপর অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এছাড়া কাশ্মীরের সহিংসতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনামূলক কনটেন্ট প্রচার করায় পাকিস্তানের সাইবার ক্রাইম কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু ইউটিউব চ্যানেলের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে।

বিদেশি সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনের ব্যাপারেও কঠোর অবস্থান নিয়েছে পাকিস্তান সরকার।লাহোর, করাচি এবং ইসলামাবাদ, এই তিনটি প্রধান শহর ছাড়া দেশের অন্য যেকোনো অঞ্চলে রিপোর্টিং করতে গেলে সাংবাদিকদের বাধ্যতামূলকভাবে সরকারের কাছ থেকে বিশেষ অনাপত্তিপত্র নিতে হয়। ফলে কাশ্মীরে গিয়ে স্বাধীনভাবে প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ করা বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তারপরও নির্বাচনকে সামনে রেখে বিবিসি, আলজাজিরাসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম বিশেষ অনুমতি নিয়ে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মির গিয়ে রিপোর্টিং করেছে। গত জুন মাস থেকেই পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে মোবাইল ইন্টারনেট এবং সম্পূর্ণ টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা ব্ল্যাকআউট থাকায় স্থানীয় সাংবাদিকরা তাদের অনলাইন সংস্করণ আপডেট করতে পারছেন না।

কমিটির টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস-সিপিজে, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ আন্তর্জাতিক প্রেস ফ্রিডম ওয়াচডগগুলো পাকিস্তানের এসব পদক্ষেপকে ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর চরম আঘাত’ এবং তথ্য প্রবাহ বন্ধ করে জবাবদিহিতা এড়ানোর একটি স্বৈরাচারী কৌশল হিসেবে তীব্র সমালোচনা করেছে।

কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস তাদের এক্স (সাবেক টুইটার)-অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে সংস্থাটি জানায়, ‘চলমান বিক্ষোভের মধ্যে পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার অবনতিশীল পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে সিপিজে। ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, টেলিযোগাযোগ বন্ধ, রিপোর্টিংয়ে নিষেধাজ্ঞা এবং সাংবাদিকদের আটক ও নিখোঁজ হওয়ার খবরগুলো অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে সাংবাদিকদের ওপর দমনপীড়ন বন্ধ করতে হবে, তথ্যের অবাধ প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার সুযোগ দিতে হবে।’

সংস্থাটি লিখেছে, ‘স্বাধীন সাংবাদিক রাজী তাহির এবং তার সহকর্মী মুহাম্মদ সাইফ ১ আগস্ট থেকে নিখোঁজ রয়েছেন, এমন প্রতিবেদনে সিপিজে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। ইউনিফর্ম পরা ব্যক্তিদের মাধ্যমে তুলে নেওয়ার পর সাংবাদিক রাজী তাহির এবং মুহাম্মদ সাইফ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ যদি তাঁদের রাষ্ট্রীয় হেফাজতে রেখে থাকে, তবে অবশ্যই সেই আটকাদেশের কথা স্বীকার করতে হবে, আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে এবং অবিলম্বে তাঁদের মুক্তি দিতে হবে। অন্যদিকে, কাশ্মীরি সাংবাদিক রাজা ইকরাম, যাকে ১ আগস্ট ইসলামাবাদে আটক করা হয়েছিল, তাকে পরবর্তীতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’

সিপিজে আরো উল্লেখ করেছে যে, মিডিয়া সেন্সরশিপের এই প্রভাব আঞ্চলিক সীমানা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তারা প্রধান প্রধান সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ এবং দীর্ঘদিনের টেলিকম বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে লিখেছে, ‘আলাদাভাবে, কিছু অসমর্থিত সূত্রে জানা গেছে যে, ১ আগস্ট কাশ্মীর থেকে সংবাদ প্রচারের পর পাকিস্তানে আলজাজিরার অ্যাক্সেস সীমিত করা হয়েছে। পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এই সম্প্রচারকারী মাধ্যমটির বিরুদ্ধে ‘হলুদ সাংবাদিকতা’র অভিযোগ এনেছে। এছাড়া সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৫ জুন থেকে পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরজুড়ে আংশিক ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট এবং তীব্র টেলিযোগাযোগ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে।’

গত ৫ জুন ৩৮ দফা দাবিতে আন্দোলন শুরুর পর বিভিন্ন বাহিনীর গুলিতে এ পর্যস্ত একশরও বেশি মানুষ মারা গেছেন। নির্বাচন শুরুর পর গত এক সপ্তাহেই মারা গেছেন ৫০ জনের বেশি।

LEAVE A REPLY