১৪ হাজার ৫০০ বছর আগে আমেরিকায় বসতি? চিলির প্রত্নস্থল ঘিরে বিতর্ক

আমেরিকায় মানুষের বসতি স্থাপনের ইতিহাস নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। চিলির দক্ষিণাঞ্চলের মন্টে ভার্দে প্রত্নস্থলটি প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ বছর পুরনো কি না, তা নিয়েই গবেষকদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিয়েছে।নতুন এক গবেষণায় স্থাপনাটির বয়স অনেক কম বলে দাবি করা হলেও, সাইটটির গবেষকরা পুরনো বয়সের দাবিই সঠিক বলে জোর দিয়ে আসছেন।

মন্টে ভার্দে প্রত্নস্থলটি ১৯৭০-এর দশকে আবিষ্কৃত হয়। ১৯৯৭ সালে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ভিত্তিতে গবেষকেরা জানিয়েছিলেন, সেখানে প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ বছর আগে মানুষের বসতি ছিল।ওই দাবি তখন আমেরিকায় মানুষের আগমন নিয়ে প্রচলিত ধারণায় বড় পরিবর্তন আনে।

কারণ, দীর্ঘদিন ধরে উত্তর আমেরিকার ক্লোভিস সংস্কৃতিকে আমেরিকায় মানুষের প্রাচীনতম বসতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে দেখা হতো। মন্টে ভার্দের বয়স ১৪ হাজার ৫০০ বছর হলে, সেটি ক্লোভিস-সম্পর্কিত প্রাচীন বসতিগুলোর চেয়েও অন্তত ১ হাজার ৫০০ বছর পুরনো হয়ে যায়। ফলে ধারণা করা হয়, মানুষ প্রচলিত সময়ের চেয়েও আগে আমেরিকা মহাদেশে পৌঁছেছিল।

নতুন গবেষণায় বয়স কমে গেল

তবে চলতি বছরের মার্চে Science জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা পুরনো সেই দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। নতুন গবেষণায় কাঠ, নদীর পলিমাটি ও আগ্নেয় ছাইসহ বিভিন্ন উপাদানের পরীক্ষা করা হয়। গবেষকদের দাবি, মন্টে ভার্দের বয়স প্রায় ৪ হাজার ২০০ থেকে ৮ হাজার ২০০ বছরের মধ্যে।

গবেষণার প্রধান লেখক ইউনিভার্সিটি অব ওয়াইওমিংয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ টড সুরোভেল বলেন, প্রত্নস্থলের নিচে প্রায় ১১ হাজার বছর আগের আগ্নেয় ছাইয়ের একটি স্তর পাওয়া গেছে। তাদের মতে, ওই স্তর যদি মানুষের বসতির নিচে থাকে, তাহলে সেখানে মানুষের উপস্থিতি ১১ হাজার বছরের বেশি পুরনো হওয়ার কথা নয়।

তাদের গবেষণায় আরো বলা হয়, আগে যে ১৪ হাজার ৫০০ বছরের পুরনো কাঠ পাওয়া গিয়েছিল, সেটি মানুষের বসতির সময়ের নয়। নদীর স্রোতে পুরনো কাঠ ও অন্যান্য উপাদান পরে এসে সেখানে জমা হতে পারে বলে তারা মনে করেন।

পুরনো দাবির পক্ষে গবেষকদের পাল্টা যুক্তি

নতুন গবেষণার সঙ্গে অবশ্য একমত নন মন্টে ভার্দে নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা গবেষকেরা। ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটির নৃবিজ্ঞানী টম ডিলেহে এবং আরও কয়েকটি গবেষক দল নতুন গবেষণার পদ্ধতি ও তথ্য বিশ্লেষণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

ডিলেহের নেতৃত্বে প্রকাশিত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নতুন গবেষকেরা মন্টে ভার্দের মূল প্রত্নস্থলে সরাসরি পাওয়া তথ্যের পরিবর্তে আশপাশের ভূতাত্ত্বিক তথ্যের ওপর বেশি নির্ভর করেছেন। তাঁর দাবি, ১৯৭৭ সাল থেকে যারা মন্টে ভার্দে নিয়ে কাজ করেছেন, তারা মানুষের বসতির নিচে ওই কথিত ১১ হাজার বছরের পুরনো আগ্নেয় ছাইয়ের স্তর দেখতে পাননি।

চিলির অস্ট্রাল ইউনিভার্সিটির গবেষকেরাও নতুন গবেষণার সমালোচনা করে ১৪ হাজার ৫০০ বছরের বয়সের দাবিকে সমর্থন করেছেন। তাদের নতুন বিশ্লেষণে ভূতাত্ত্বিক ও পরাগরেণু-সংক্রান্ত তথ্যসহ বিভিন্ন প্রমাণ ব্যবহার করা হয়েছে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই বিতর্ক?

মন্টে ভার্দের বয়স নিয়ে এই বিতর্ক শুধু একটি প্রত্নস্থলের বয়স নির্ধারণের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমেরিকা মহাদেশে মানুষের প্রথম আগমনের ইতিহাস।

যদি ১৪ হাজার ৫০০ বছরের পুরনো তারিখ সঠিক হয়, তাহলে বরফযুগে মানুষ প্রচলিত ধারণার চেয়েও অনেক আগে আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলে পৌঁছেছিল। এতে এশিয়া থেকে উত্তর আমেরিকা হয়ে দক্ষিণে মানুষের বিস্তারের সময়কাল সম্পর্কেও নতুন করে ভাবতে হবে।

মন্টে ভার্দের বিশেষত্ব শুধু এর বয়স নয়। সাইটটিতে কাঠের তৈরি সরঞ্জাম, কাঠামোর অংশ, উদ্ভিদ, সামুদ্রিক শৈবাল, প্রাণীর দেহাবশেষ এবং মানুষের পায়ের ছাপসহ নানা ধরনের জৈব উপাদান পাওয়া গেছে। এসব নিদর্শন প্রাচীন মানুষের জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস ও প্রযুক্তি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়।

এখন দুই পক্ষই আরও গবেষণার কথা বলছে। ফলে চিলির এই প্রাচীন প্রত্নস্থলটি ঠিক কত বছরের এবং আমেরিকায় মানুষের বসতি কত আগে গড়ে উঠেছিল। তার চূড়ান্ত উত্তর পেতে আরও স্বাধীন গবেষণার প্রয়োজন হতে পারে।

LEAVE A REPLY