ইন্দোনেশিয়ার ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২০

ছবি : রয়টার্স

ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চলে ফ্লোরেস দ্বীপের কাছে শক্তিশালী ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ জনে। শনিবার ভোরে আঘাত হানা ৭ দশমিক ৭ মাত্রার এই ভূমিকম্পে আরো ছয়জন আহত হয়েছেন।ধ্বংসস্তূপের নিচে দুজন আটকে আছেন বলে এএফপিকে জানিয়েছেন মাউমেরে অনুসন্ধান ও উদ্ধার কর্মকর্তা ফাতুর রহমান।

ভূমিকম্পের পর হাজারো মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যান। সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক ছড়ায় ভূমিকম্পের কেন্দ্রের কাছের নাগেকেও রিজেন্সিতে। সেখানকার বাসিন্দারা সমুদ্রের পানি সরে যেতে দেখে দ্রুত উঁচু জায়গায় চলে যান।সমুদ্রের পানি হঠাৎ সরে যাওয়া সুনামির সম্ভাব্য লক্ষণ হতে পারে। পরে ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষ সুনামির সতর্কতা তুলে নেয়। তবে মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে ফিরে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কারণ পরবর্তী কম্পনে দুর্বল ভবন ধসে পড়তে পারে।

নাগেকেওর ৫৬ বছর বয়সী বাসিন্দা ইয়োহানেস বাবো তখন একটি বাজারে ছিলেন। তিনি বলেন, হঠাৎ মাটি কাঁপতে শুরু করে। কম্পন ছিল খুব শক্তিশালী। সৌভাগ্যক্রমে তখন তিনি ও অন্যরা ঘরের বাইরে ছিলেন। বাবো বলেন, ভূমিকম্প শুরু হওয়ার পর মানুষ আতঙ্কে দৌড়াদৌড়ি করতে থাকে।নিরাপত্তার জন্য তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পাহাড়ের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তার পরিবার নিরাপদে আছে এবং কেউ আহত হয়নি বলেও জানান তিনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইন্দোনেশিয়ার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল ফ্লোরেস দ্বীপের উত্তর উপকূলের কাছে। এটি উপকূলীয় শহর এন্দে থেকে প্রায় ৬৮ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে। ভূমিকম্পটি ছিল অগভীর, ফলে এর প্রভাব কাছাকাছি এলাকায় বেশি অনুভূত হয়েছে।

প্রধান ভূমিকম্পের পর ওই এলাকায় বেশ কয়েকটি শক্তিশালী আফটার শক অনুভূত হয়। এর মধ্যে একটি কম্পনের মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ১। ভূমিকম্পে মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নিরূপণ করা হয়নি। মাউমেরেসহ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকাজ চলছে। টেলিভিশনের ফুটেজে দেখা গেছে, উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে পড়া মানুষদের খুঁজছেন। জাকার্তা থেকে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার পূর্বে মাউমেরে শহরের বাসিন্দা লুকাস লোটার বলেন, হঠাৎ মাটি কাঁপতে শুরু করলে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। ভূমিকম্পের সময় হাসপাতালের রোগীদেরও বাইরে বের করে আনা হয়। তিনি কয়েকটি ভবনের দেয়ালে ফাটল দেখতে পেয়েছেন। লোটার হাসপাতালের রোগীসেবা বিভাগের একজন কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ভূমিকম্পের কম্পন এতটাই শক্তিশালী ছিল যে হাসপাতালে থাকা লোকজনও নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে বাধ্য হন

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে মূলত ছোট শহর ও গ্রাম রয়েছে। সেখানে উঁচু ভবনের সংখ্যা খুব কম। অনেক এলাকায় কোনো উঁচু ভবনই নেই। ভূমিকম্পের পর ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া, জলবায়ু ও ভূ-পদার্থবিজ্ঞান সংস্থা সম্ভাব্য সুনামির সতর্কতা জারি করে। মানুষকে দ্রুত উঁচু জায়গায় চলে যেতে বলা হয়। শুরুতে সমুদ্র থেকে ৫০ সেন্টিমিটার থেকে ৩ মিটার পর্যন্ত উচ্চতার ঢেউ আসতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছিল। পরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর সুনামির সতর্কতা তুলে নেওয়া হয়। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সতর্কতা তুলে নেওয়া হলেও সমুদ্রের পানির উচ্চতা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

ইন্দোনেশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরের ‘রিং অব ফায়ার’ এলাকায় অবস্থিত। জাপান থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বিস্তৃত এই এলাকায় ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত নিয়মিত ঘটে। তাই ইন্দোনেশিয়ায় প্রায়ই শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়। ফ্লোরেস দ্বীপে ১৯৯২ সালে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছিল। ওই ভূমিকম্পের পর সুনামি আঘাত হানে। এতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মানুষ মারা যান। দেশটির ইতিহাসে ২০০৪ সালের ভূমিকম্প ও সুনামি সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগগুলোর একটি। ওই বছর সুমাত্রার উপকূলের কাছে ৯ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। এরপর ভারত মহাসাগরে ভয়াবহ সুনামি আঘাত হানে। পুরো অঞ্চলে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার মানুষ মারা যান। এর মধ্যে শুধু ইন্দোনেশিয়াতেই মারা যান প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার মানুষ। ‘বক্সিং ডে’ নামে পরিচিত ২৬ ডিসেম্বরের ওই দুর্যোগটি ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর একটি। 

২০১৮ সালেও ইন্দোনেশিয়ায় একাধিক ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়। ওই বছর লম্বক দ্বীপে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর কয়েক সপ্তাহ ধরে আরো কয়েকটি ভূমিকম্প হয়। এতে পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় লম্বক ও পাশের সুম্বাওয়া দ্বীপে ৫৫০ জনের বেশি মানুষ মারা যান। একই বছর সুলাওয়েসি দ্বীপের পালু এলাকায় ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর পর সুনামি আঘাত করলে ৪ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ মারা যান বা নিখোঁজ হন।

LEAVE A REPLY