ইরানকে সমর্থন জানিয়ে ‘ক্ষুধার্ত হাঙরের’ দাঁতভাঙা জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি পুতিনের

সংগৃহীত ছবি

ইরানকে সমর্থনের পাশাপাশি ইউক্রেন যুদ্ধ আরো তীব্র করার অঙ্গীকার করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি বলেছেন, কেউ রাশিয়াকে গ্রাস করতে চাইলে তাকে ‘দাঁতভাঙা জবাব’ দেওয়া হবে।

কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) বৈঠকে অংশ নেওয়া এবং এর পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় এসব মন্তব্য করেন পুতিন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতেও তেহরানের প্রতি মস্কোর সমর্থন অব্যাহত রাখার কথা জানান তিনি।

ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে কাজ করতেও তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন বলে জানান পুতিন। তার ভাষ্য, ‘আমরা যাদের ভালোভাবে চিনি এবং সাধারণভাবে যাদের ওপর আস্থা রাখি, তাদের সঙ্গে কাজ করতে পুরোপুরি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।’

আরো বাড়ছে ইউক্রেন যুদ্ধের তীব্রতা

মার্কিন সংবাদ সংস্থা দ্য নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, কয়েক মাস ধরে ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগার, জাহাজ ও বিভিন্ন অবকাঠামোতে দূরপাল্লার হামলা চালিয়ে আসছে। এসব হামলার ফলে রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে এবং অর্থনীতিতেও চাপ বেড়েছে বলে দাবি করেছে মস্কো।

পুতিনের দাবি, গত ৪০ দিনে ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার প্রায় ১০০টি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে রাশিয়ার অর্থনীতির যে ক্ষতি হয়েছে, তা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ শতাংশের সমান।

এর জবাবে রাশিয়াও ইউক্রেনে হামলা বাড়িয়েছে। নতুন ধরনের জেটচালিত ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালানোর পাশাপাশি রাজধানী কিয়েভ এবং কৃষ্ণসাগরীয় বন্দরগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। এতে ইউক্রেনের শস্য রপ্তানিও হুমকির মুখে পড়েছে।

পুতিন বলেন, ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় ব্যাপক হামলা চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তার দাবি, রাশিয়ার হামলার কারণে ইউক্রেনের কৃষিপণ্য রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং দেশটি আর্থিক সংকটের ঝুঁকিতে পড়েছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির রাশিয়ায় বেসামরিক বিমান চলাচল অনিরাপদ হয়ে পড়ার মন্তব্যের জবাবে পুতিন ইউক্রেনের ড্রোন হামলাকে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ’ বলে আখ্যায়িত করেন।

কূটনৈতিক গোয়েন্দা তৎপরতা

সম্প্রতি সিআইএর পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফের মস্কো সফর নিয়েও কথা বলেন পুতিন। তিনি বলেন, স্নায়ুযুদ্ধের উত্তেজনাপূর্ণ সময়েও যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ ছিল। তবে বর্তমানে এ ধরনের যোগাযোগ ‘কিছুটা হলেও স্থগিত’ রয়েছে বলে জানান তিনি।

র‍্যাটক্লিফের মস্কো সফরের কয়েক দিন পর উইটকফ ও কুশনারের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে পুতিনের মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়াকে আলোচনার পথে আনতে ওয়াশিংটন কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে চলতি মাসের শেষ দিকে রাশিয়ায় অনুষ্ঠেয় পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর নতুন করে সেনা নিয়োগ বা বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে পুতিন এ ধরনের আশঙ্কাকে ‘আজেবাজে কথা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

ইরানের পাশে থাকার ঘোষণা

এসসিও বৈঠকের ফাঁকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন পুতিন। সেখানে ইরানের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় দেশটির জনগণের ‘সাহস ও দৃঢ়তার’ প্রতি রাশিয়ার সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি। 

পুতিন পেজেশকিয়ানকে বলেন, ‘এ কঠিন সময়ে আপনাদের যে সহায়তা প্রয়োজন, তা দেওয়ার চেষ্টা করছি আমরা। এ বিষয়ে আপনার সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় পণ্যও আমরা সরবরাহ করছি।’

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকেই তেহরানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছে মস্কো। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য রাশিয়া ইরানকে দিয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির পর চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আবারও পরস্পরের ওপর হামলা শুরু করেছে।

হাঙরের ক্ষুধা ও দাঁতভাঙা জবাব

এর আগে রাশিয়ায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এক বৈঠকে ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে পুতিন মেরুভালুক ও ঘাতক তিমির উদাহরণ দিয়েছিলেন। পরে কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে এ বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে পুতিন বলেন, সোভিয়েত আমলে পশ্চিমা দেশগুলোকে ‘সাম্রাজ্যবাদের হাঙর’ হিসেবে বর্ণনা করা হতো। কেউ যদি খাদ্যশৃঙ্খলে আমাদের নিচে নামিয়ে দিতে চায়, আমাদের গিলে খেতে বা গ্রাস করতে চায়, তাহলে তারা দাঁতভাঙা জবাব পেতে পারে।

পুতিন আরো বলেন, ‘এসব হাঙরের ক্ষুধা ও দাঁত দ্রুত বাড়লেও রাশিয়া তার জবাব দিতে প্রস্তুত।’

একই সঙ্গে ইউক্রেনের সঙ্গে আলোচনার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই যে তারাই আমাদের সঙ্গে আবার আলোচনা শুরু করতে চাইছে, ব্যক্তিগত বৈঠকের অনুরোধ করছে।’ তবে এরপরই তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আলোচনা হয় না।’

LEAVE A REPLY