আফ্রিকার প্রকৃত আকার তুলে ধরতে নতুন বিশ্ব মানচিত্র, জাতিসংঘে ভোট

ছবি : রয়টার্স

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ শুক্রবার বিশ্বের প্রচলিত মারকেটর মানচিত্র পরিবর্তনের একটি প্রস্তাবের ওপর ভোট দেবে। প্রস্তাবটি পাস হলে এমন একটি মানচিত্র ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হবে, যেখানে আফ্রিকার প্রকৃত আকার আরো সঠিকভাবে তুলে ধরা হবে।

টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট ডুসি বলেছেন, টোগো এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছে। আফ্রিকান ইউনিয়নের ৫৪টি সদস্য দেশসহ আরো কয়েকটি দেশ প্রস্তাবটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। তবে মোট কতটি দেশ এতে সমর্থন দিয়েছে, তা তিনি জানাননি।

টোগো পশ্চিম আফ্রিকার একটি দেশ।দেশটির পশ্চিমে ঘানা, পূর্বে বেনিন এবং উত্তরে বুরকিনা ফাসো। দক্ষিণে দেশটির ভূখণ্ড গিনি উপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। টোগো বিশ্বের স্বল্পোন্নত দেশগুলোর একটি। রবার্ট ডুসি বলেন, এটি কোনো রাজনৈতিক বিষয় নয়, বরং একটি বৈজ্ঞানিক বিষয়।এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে। তাই বাস্তবতাকে সবার মেনে নেওয়া উচিত।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব বাধ্যতামূলক নয়। তবে প্রস্তাবটি পাস হলে শিক্ষা, প্রযুক্তি ও সরকারি ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত মানচিত্রে পরিবর্তন আসতে পারে। স্কুলের পাঠ্যক্রম এবং দৈনন্দিন প্রযুক্তিতেও নতুন মানচিত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।

ফ্লেমিশ মানচিত্রবিদ জেরার্ডাস মারকেটর ১৫৬৯ সালে নৌযান চালকদের সমুদ্রে পথ চলতে সহায়তার জন্য এই মানচিত্র তৈরি করেছিলেন। প্রায় ৫০০ বছর পরও মারকেটর প্রজেকশন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মানচিত্র পদ্ধতিগুলোর একটি।

তবে মারকেটর প্রজেকশনের একটি বড় সমস্যা হলো, এতে বিষুবরেখার কাছাকাছি অঞ্চলগুলো বাস্তবের তুলনায় ছোট দেখায়। অন্যদিকে মেরুর কাছাকাছি ও উচ্চ অক্ষাংশের অঞ্চলগুলো অনেক বড় দেখায়। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ আফ্রিকা ও গ্রিনল্যান্ড। মারকেটর মানচিত্রে দুটি অঞ্চলকে প্রায় একই আকারের মনে হয়। কিন্তু বাস্তবে আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ বড়।

এদিকে Change.org-এ #CorrectTheMap প্রচারণার আওতায় করা একটি আবেদনে বলা হয়েছে, আফ্রিকার ভেতরে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান, মেক্সিকো এবং ইউরোপের একটি বড় অংশ রাখলেও সেখানে কিছু জায়গা বাকি থাকবে। আবেদনে এরই মধ্যে ১১ হাজারের বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেছেন।

আফ্রিকান ইউনিয়ন ২০২৫ সালের আগস্টে এই প্রচারণার প্রতি সমর্থন জানায়। এরপর প্রচারণাটি এগিয়ে নেওয়ার নেতৃত্ব দিতে টোগোকে অনুরোধ করা হয়।

ইতিহাসবিদ ও ভূগোলবিদরা দীর্ঘদিন ধরে মারকেটর প্রজেকশনের সমালোচনা করে আসছেন। তাদের মতে, এই মানচিত্র পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে তৈরি এবং এতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রকৃত আকার সঠিকভাবে তুলে ধরা হয় না।

প্রচারণার সমর্থকদের কেউ কেউ এই বিষয়টিকে ‘মানচিত্রভিত্তিক ঔপনিবেশিকতা’ বা ‘কার্টোগ্রাফিক কলোনিয়ালিজম’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। তাদের দাবি, মানচিত্রে বিভিন্ন দেশের আকার যেভাবে দেখানো হয়, তা বিশ্ব সম্পর্কে মানুষের ধারণা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে প্রভাবিত করতে পারে।

সমালোচকদের কেউ কেউ মনে করেন, মারকেটর মানচিত্রে বিশ্বের দক্ষিণাঞ্চলের দেশগুলোকে বাস্তবের তুলনায় ছোট দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে উত্তর গোলার্ধের দেশগুলোকে তুলনামূলক বড় করে দেখানো হয়েছে। একইভাবে বিষুবরেখার কাছের অঞ্চলগুলোও মানচিত্রে সংকুচিত হয়ে দেখা যায়।

তাদের মতে, এ ধরনের উপস্থাপনা আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্য সম্পর্কে মানুষের ধারণাকে প্রভাবিত করেছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় থাকা বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যকেও এটি আরো শক্তিশালী করেছে।

মারকেটর প্রজেকশনের অন্যতম প্রধান সমালোচক ছিলেন জার্মান ইতিহাসবিদ আর্নো পিটার্স। ১৯৭৩ সালে তিনি গ্যাল-পিটার্স প্রজেকশনের ওপর ভিত্তি করে পিটার্স বিশ্ব মানচিত্র তৈরি করেন। পরে এটি মারকেটর মানচিত্রের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

টোগোর #CorrectTheMap প্রচারণায় ২০১৮ সালের ‘ইকুয়াল আর্থ’ মানচিত্র ব্যবহারের পক্ষে প্রচার চালানো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক একদল মানচিত্রবিদ এই নকশা তৈরি করেন। প্রচারণার সমর্থকদের দাবি, নতুন এই মানচিত্র আফ্রিকা সম্পর্কে মানুষের প্রচলিত ধারণা পরিবর্তন করতে এবং বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের করে আনতে সহায়তা করবে।

ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান জেএস হেল্ডের লন্ডনভিত্তিক সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট জেজে ইনোকও মনে করেন, মারকেটর প্রজেকশনে আফ্রিকার প্রকৃত আকার দৃশ্যত ছোট করে দেখানো হয়।

তিনি বলেন, #CorrectTheMap প্রচারণাটি আফ্রিকান দেশগুলোর বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে আরো বেশি প্রভাব এবং বিশ্বে আফ্রিকাকে কিভাবে উপস্থাপন করা হবে, সে বিষয়ে আরো বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত।

ইনোকের মতে, সম-ক্ষেত্রফলভিত্তিক একটি মানচিত্র ব্যবহার করা হলে শিক্ষা ও জনসচেতনতার জন্য নির্ভুল ভিত্তি তৈরি হবে। একই সঙ্গে আফ্রিকার জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বকে পুরোনো ও বিকৃত ধারণার মাধ্যমে দেখার প্রবণতাও কমবে। এদিকে টোগোর কর্তৃপক্ষ আশা করছে, মারকেটর মানচিত্র পরিবর্তনের প্রস্তাবটিও জাতিসংঘে আফ্রিকান ইউনিয়ন-সমর্থিত সাম্প্রতিক আরেকটি প্রস্তাবের মতো সফল হবে।

চলতি বছরের মার্চে ঘানার উদ্যোগে দাস ব্যবসাকে ‘মানবতার বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি প্রস্তাব জাতিসংঘে পাস হয়। এতে ১২৩টি দেশ পক্ষে ভোট দেয়। বিপক্ষে ভোট দেয় তিনটি দেশ এবং ৫২টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে।

ঘানার এই সাফল্য মারকেটর মানচিত্র পরিবর্তনের সমর্থকদেরও আশাবাদী করেছে। প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা তৈরিতে আগামী বছরের প্রথম প্রান্তিকে টোগোর রাজধানী লোমেতে একটি বৈঠকের আয়োজনের পরিকল্পনা করছে দেশটির সরকার। ওই বৈঠকে ইউনেসকো, আফ্রিকান ইউনিয়ন এবং গুগল ম্যাপসের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট ডুসি বলেন, ‘যারা প্রশ্ন করেন, এখন কেন, তাদের আমি বলি, কেন নয়? আমরা যখন বিশ্বের মানচিত্রের দিকে তাকাই, তখন আমাদের নিজেদের আখ্যান পরিবর্তনের সময় এসেছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আফ্রিকায় আমাদের নিজেদের যা পরিবর্তন করার ক্ষমতা আছে, তা পরিবর্তনের দায়িত্ব নেওয়ার সময় এসেছে।’

LEAVE A REPLY