প্রিয়জন আত্মহত্যার চিন্তায় আছেন কি না, বুঝবেন যেভাবে

সংগৃহীত ছবি

কাছের কোনো মানুষ হঠাৎ সবার থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন, দৈনন্দিন কাজকর্মে আগ্রহ হারাচ্ছেন কিংবা হতাশার কথা বলছেন তাহলে বিষয়টি অবহেলা না করাই ভালো। বিশেষ করে কেউ যদি বলেন, ‘আর কিছুই ভালো লাগছে না’ বা ‘জীবনের কোনো মানে দেখি না’, সেক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে কীভাবে কথা বলতে হবে, কীভাবে পাশে দাঁড়াতে হবে এবং কখন পেশাদার সহায়তা নিতে হবে তা নিয়ে হিন্দুস্তান টাইমসের সঙ্গে কথা বলেছেন ভেদা রিহ্যাবিলিটেশন অ্যান্ড ওয়েলনেসের মনোবিজ্ঞানী সাক্ষী রাই।

পরিবর্তনগুলো খেয়াল করুন

কেউ স্বাভাবিক আচরণ থেকে হঠাৎ বদলে গেলে তা খেয়াল করা জরুরি। পরিবারের সদস্যের সঙ্গে সরাসরি অভিযোগের সুরে কথা না বলে নিজের উদ্বেগের কথা জানানো যেতে পারে।

যেমন, ‘তুমি আগের মতো নেই’ বলার বদলে বলা যেতে পারে, ‘তোমাকে কিছুদিন ধরে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে দেখছি।তোমাকে নিয়ে আমি চিন্তিত। চাইলে আমার সঙ্গে কথা বলতে পারো।

এ ক্ষেত্রে কণ্ঠস্বর শান্ত ও সহানুভূতিশীল হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এতে ওই ব্যক্তি নিজেকে জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়েছেন বলে মনে না করে নিজের কথা বলার সুযোগ পান।

সরাসরি জানতে ভয় পাবেন না

অনেক পরিবার মনে করে, আত্মহত্যার কথা সরাসরি জানতে চাইলে ওই ব্যক্তির মাথায় বিষয়টি ঢুকে যেতে পারে। তবে সাক্ষী রাইয়ের মতে, উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ থাকলে সরাসরি প্রশ্ন করা যেতে পারে।

জিজ্ঞেস করা যেতে পারে, ‘তোমার কি নিজেকে আঘাত করার বা আত্মহত্যা করার চিন্তা হচ্ছে?’

এ ধরনের প্রশ্নের পর দ্রুত আশ্বস্ত করার চেষ্টা না করে ব্যক্তিকে নিজের কথা বলার সুযোগ দেওয়া উচিত।

বেশি জরুরি হলো মন দিয়ে শোনা

কেউ নিজের কষ্টের কথা বললে মাঝপথে থামিয়ে দেওয়া, বিচার করা বা সঙ্গে সঙ্গে সমাধান দেওয়ার চেষ্টা না করে মন দিয়ে শোনা দরকার।

‘আমি বুঝতে পারছি’, ‘এটা নিশ্চয়ই খুব কঠিন সময়’ বা ‘আমাকে বলার জন্য ধন্যবাদ’—এ ধরনের কথায় বোঝানো যায় যে তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

একটি নিরাপদ ও বিচারহীন পরিবেশ তৈরি হলে ওই ব্যক্তি পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিতে আরও আগ্রহী হতে পারেন।

তাৎক্ষণিক ঝুঁকি থাকলে একা রাখবেন না

কেউ যদি আত্মহত্যার কথা বলেন, নির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা জানান, সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উপায় তার কাছে থাকে বা তিনি তাৎক্ষণিক বিপদের মধ্যে থাকেন, তাহলে পরিস্থিতিকে জরুরি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

এ অবস্থায় তাকে একা না রেখে পাশে থাকা বা বিশ্বস্ত কাউকে সঙ্গে রাখার ব্যবস্থা করা জরুরি। সম্ভব হলে বিপজ্জনক জিনিসপত্রে তার প্রবেশাধিকার কমাতে হবে এবং দ্রুত পেশাদার বা জরুরি সহায়তা নিতে হবে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে শুধু পরিবারের সদস্যদের ওপর নির্ভর না করে জরুরি সেবা, মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বা সংকটকালীন সহায়তা ব্যবস্থার সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন।

পেশাদার সহায়তার ব্যবস্থা করুন

অনেক সময় মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে ব্যক্তি নিজেই অস্বস্তি বোধ করতে পারেন। তাকে ‘তোমার চিকিৎসা দরকার’ বলার বদলে পাশে থাকার বার্তা দেওয়া যেতে পারে।

যেমন, ‘তুমি চাইলে আমি তোমার সঙ্গে যাব।’ এতে সাহায্য নেওয়ার বিষয়টি চাপিয়ে দেওয়ার বদলে সহযোগিতার মতো মনে হতে পারে।

ব্যক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী মনোবিজ্ঞানী, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা অন্য কোনো মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে। মানসিক চাপের সঙ্গে মাদক ব্যবহার, আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তন বা দৈনন্দিন জীবন সামলাতে সমস্যা থাকলে আরও কাঠামোবদ্ধ সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে।

তবে কেউ তাৎক্ষণিক আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকলে শুধু পুনর্বাসন বা কাউন্সেলিংয়ের ওপর নির্ভর না করে জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নিতে হবে।

পরিবারের সদস্যদেরও সহায়তা দরকার

কাছের মানুষকে এমন পরিস্থিতিতে দেখলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও ভয়, অপরাধবোধ, রাগ বা অসহায়ত্ব তৈরি হতে পারে। তবে একজনের নিরাপত্তা ও সুস্থতার পুরো দায়িত্ব একা পরিবারের কোনো সদস্যের ওপর নেওয়া উচিত নয়।

প্রয়োজনে পরিবারের সদস্যরাও কাউন্সেলিং বা পেশাদার পরামর্শ নিতে পারেন। অন্য স্বজন ও বিশ্বস্ত মানুষের সহায়তা নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

আত্মহত্যার চিন্তায় ভুগছেন এমন কারও ক্ষেত্রে একটি কথোপকথন হয়তো তার সব সমস্যা সমাধান করবে না। তবে শান্তভাবে কথা বলা, বিচার না করে শোনা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার সঙ্গে তাকে যুক্ত করা সাহায্য পাওয়ার পথটি সহজ করে দিতে পারে।

LEAVE A REPLY