ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের নেপথ্যে কী

শিক্ষাখাতে অপর্যাপ্ত বরাদ্দ, শিক্ষক সংকট ও জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। তবে দীর্ঘদিনের এসব অসন্তোষের পাশাপাশি দেশটির রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও রাজপথের আন্দোলনের ঐতিহ্যও বিক্ষোভ বিস্তারে ভূমিকা রাখছে।

ফ্রান্সে গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে শিক্ষাখাতে অপর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করে আসছেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা দেশটির বহু উচ্চবিদ্যালয়ের প্রবেশপথ অবরোধ করেছেন। কিছু এলাকায় আন্দোলন সহিংস রূপ নিয়েছে। এতে শত শত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন।গ্রেপ্তার করা হয়েছে হাজারো মানুষকে। তাদের মধ্যে বাইরে থেকে আসা কতজন বিশৃঙ্খলাকারী রয়েছেন, তা জানা যায়নি বলে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, দেশটির ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত স্কুলগুলোতে শিক্ষক সংকট প্রকট। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামোও জরাজীর্ণ।

মঙ্গলবার বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্যারিসের শিক্ষার্থী মাদালেনা বলেন, ‘কখনো কখনো আমাদের শিক্ষকেরা কয়েক সপ্তাহ অনুপস্থিত থাকেন, কিন্তু তাদের পরিবর্তে অন্য কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয় না।’

ফ্রান্সজুড়ে লাখ লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার সময় নিজের স্কুলের পরিস্থিতি তুলে ধরে মাদালেনা আরো বলেন, সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহের সময় তাদের স্কুলের ভবনগুলো ‘প্রচণ্ড গরম’ হয়ে উঠেছিল। তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ শুধু শিক্ষক সংকট ও অবকাঠামোগত সমস্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা এবং সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ক্লাস চলার বিষয়েও অনেকের ক্ষোভ রয়েছে।

ফ্রান্সের টেলিভিশন চ্যানেল ফ্রান্স ২-কে এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আপনি সন্ধ্যা ৭টায় বাড়ি ফেরেন।এরপর ঘুমানোর কিংবা বাড়ির কাজ করার কোনো সময়ই থাকে না।’

উচ্চশিক্ষায় ভর্তির জন্য ফ্রান্সের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘পারকুরসুপ’ নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে।

এই ক্ষোভের শিকড় অনেক গভীরে। বর্তমানে প্রতি ব্যাচের প্রায় ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী বাকালোরেয়া পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এই সনদ তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যোগ্যতা দেয়, যদিও পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয় বা বিষয়ে ভর্তির নিশ্চয়তা দেয় না। ফলে কাঙ্ক্ষিত বিষয়ে ভর্তির জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। এ নিয়ে উদ্বেগের বড় অংশজুড়ে রয়েছে পারকুরসুপ, যার ভর্তি প্রক্রিয়াকে অনেকেই অস্পষ্ট বলে মনে করেন।

শিক্ষার্থীদের এসব অভিযোগ বাস্তব। কিন্তু শুধু এসব কারণ দিয়েই কি বর্তমান আন্দোলনের ধরন ব্যাখ্যা করা যায়? অন্যান্য দেশের তুলনায় ফ্রান্সের পরিস্থিতি কতটা আলাদা?

অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্স সরকার উচ্চবিদ্যালয়ের প্রত্যেক শিক্ষার্থীর পেছনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোর উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের গড় ব্যয়ের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করে।

শিক্ষক সংকট যে প্রকট, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। তবে অন্যান্য দেশের তুলনায় ফ্রান্সে এ সংকট বেশি নয়।

ওইসিডির পরিমাপ অনুযায়ী, বরং সেখানে শিক্ষক পদ শূন্য থাকার হার তুলনামূলক কম। যদিও ফ্রান্সের শিক্ষকেরা অন্যান্য অনেক দেশের শিক্ষকদের তুলনায় কম বেতন পান।

ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের জন্য বিকেল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ে থাকা অবশ্যই একটি সমস্যা। তবে এর প্রধান কারণ ছুটির ঘাটতি নয়; বরং দীর্ঘ মধ্যাহ্নভোজের বিরতি ও জটিল সময়সূচি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য দেশের তুলনায় ফ্রান্সে বিদ্যালয়ের ছুটি বিশেষভাবে দীর্ঘও নয়।

দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ে থাকা ফরাসি শিক্ষাজীবনের দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। তাই শুধু এ বিষয় দিয়ে বর্তমান বিক্ষোভের বিস্ফোরণ ব্যাখ্যা করা কঠিন। একইভাবে উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটির কারণে সৃষ্ট চাপও আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দেয় না।

ইউরোপের অধিকাংশ দেশে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ তরুণ মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রতিযোগিতা সেখানেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে চাপ তৈরি করে।

শিক্ষাখাতে অপর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ, জরাজীর্ণ ভবন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ শিক্ষার্থীদের অসন্তোষের পেছনে ভূমিকা রাখছে। তবে এসব অভিযোগ দিয়ে আন্দোলনের নজিরবিহীন ব্যাপ্তি পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেন, অংশগ্রহণকারী বিদ্যালয়ের সংখ্যা, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি এবং সহিংসতার মাত্রার দিক থেকে এই আন্দোলন ‘নজিরবিহীন’। আন্দোলনের ব্যাপ্তি আরো তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি নিতে হচ্ছে।

হুমকি বা শক্তি প্রয়োগ করে বিদ্যালয় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় অবরোধ করা বেআইনি। এ ধরনের ঘটনায় পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। পাশাপাশি ভাঙচুরকারীরাও এতে যুক্ত হয়। ফলে অনেক শিক্ষার্থী পুলিশের জনতা নিয়ন্ত্রণ অভিযানের মধ্যে পড়ে যান, যেসব অভিযানে প্রায়ই অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠে।

সবশেষ বার্তায় ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু জোর দিয়ে বলেছেন, উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ‘সংঘাতে জড়ানোর’ নির্দেশ নিরাপত্তা বাহিনীকে দেওয়া হয়নি; তাদের দায়িত্ব কেবল আইন প্রয়োগ করা।

শিক্ষার্থীদের এই কৌশল বুঝতে হলে অবরুদ্ধ বিদ্যালয়ের ফটকের বাইরেও তাকাতে হবে। বুঝতে হবে ফ্রান্সের রাজনৈতিক আন্দোলনের ঐতিহ্য। দেশটিতে অনেক সময় নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি রাজপথও ক্ষমতার ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে। শিক্ষার্থীরা এ বিষয়টি অন্যদের মতোই ভালোভাবে জানেন।

১৯৯০ সালের অক্টোবরে প্যারিসের উত্তরে অবস্থিত সেইন-সাঁ-দেনি এলাকায় একটি বিদ্যালয়ে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। বর্তমান অস্থিরতার অন্যতম কেন্দ্র এই এলাকাটি। ওই ঘটনা শিক্ষা খাতে অপর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ ও শিক্ষক সংকটের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার উচ্চবিদ্যালয়গুলোর জন্য বর্তমান মূল্যে প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ইউরোর সমপরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করে।

১৯৯৮ সালের অক্টোবরে একই ধরনের দাবিতে ফ্রান্সজুড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী মিছিল করেন। এর ফলে বিদ্যালয় সংস্কারে প্রায় ১ বিলিয়ন ইউরো এবং অতিরিক্ত ১৪ হাজার কর্মী নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়।

বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মুখে সরকারের সংস্কার উদ্যোগও ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৮৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কার এবং ১৯৯৪ সালে তরুণদের জন্য কম ন্যূনতম মজুরি চালুর উদ্যোগ।

সম্ভবত শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের শক্তির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ২০০৬ সালের ঘটনা। সে বছর ২৬ বছরের কম বয়সীদের নিয়োগ ও চাকরিচ্যুতির নিয়ম শিথিল করে তরুণদের বেকারত্ব মোকাবেলার লক্ষ্যে একটি আইন করা হয়েছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চবিদ্যালয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে অবরোধ এবং সহিংসতাপূর্ণ বিক্ষোভের পর আইনটি প্রত্যাহার করা হয়।

আইনটি সংসদে পাস হয়েছিল এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জাক শিরাক তাতে স্বাক্ষরও করেছিলেন। তারপরও আন্দোলনের মুখে তা বাতিল করা হয়। ফলে ফ্রান্সের প্রাপ্তবয়স্করাও দেখিয়েছেন, সড়ক অবরোধের মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সিদ্ধান্ত বদলানো সম্ভব।

২০১৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত চলা ‘ইয়েলো ভেস্ট’ বা হলুদ জ্যাকেট আন্দোলনের সময় দেশজুড়ে দোকানপাটে লুটপাট এবং সরকারি ভবনে হামলার ঘটনা ঘটে। আন্দোলনের মুখে সরকার জ্বালানি কর বৃদ্ধির পরিকল্পনা বাতিল করে এবং ১০ বিলিয়ন ইউরো ব্যয়ের অনুমোদন দেয়।

রাজপথের আন্দোলন সব সময় জয়ী হয় না।
১৯৬৮ সালের ছাত্র-অভ্যুত্থান ফ্রান্সের প্রতিটি আন্দোলনকারী গোষ্ঠীর কাছে একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হলেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাধ্যমেই সেই আন্দোলনের অবসান ঘটে।

বর্তমান হাইস্কুলের শিক্ষার্থীরা এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী, যেখানে বিক্ষোভকারীরা জনগণের বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার প্রশ্নে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

জনমতের সমর্থন ও সরকারের দুর্বল অবস্থান

বর্তমান পরিস্থিতিতে আপাতদৃষ্টিতে শিক্ষার্থীদের পাল্লাই ভারী। বিএফএমটিভির জন্য পরিচালিত এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ফ্রান্সের ৭২ শতাংশ মানুষ শিক্ষার্থীদের দাবিকে যৌক্তিক মনে করেন এবং ৫৫ শতাংশ এই আন্দোলনকে সমর্থন করেন।

অনেক শিক্ষক, শ্রমিক ইউনিয়ন ও বামপন্থী রাজনীতিকের সমর্থন পাওয়ায় আন্দোলনকারীরা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। বৃহস্পতিবার বিকেলে আরো একটি সমাবেশের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

অন্যদিকে সরকার এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দুর্বল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতায় নয় বছর থাকার পর প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ ব্যাপক অজনপ্রিয় হয়ে পড়েছেন। ছয় মাস পর অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি আবার প্রার্থী হতে পারবেন না।

২০২৪ সালের জুনে আগাম নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে ফ্রান্সের জাতীয় পরিষদ কার্যত অচলাবস্থায় পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু নিজেকে সাম্প্রতিক স্মৃতির মধ্যে ‘সবচেয়ে দুর্বল প্রধানমন্ত্রী’ বলে বর্ণনা করেছেন। সংসদে বাজেট পাস করাতে পারবেন কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে চলমান এই মুখোমুখি অবস্থানে সরকারের দুর্বলতাই শেষ পর্যন্ত একটি সুবিধা হয়ে উঠতে পারে। কারণ, আর্থিক সংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে সরকার সহজে ছাড় দিতে পারছে না।

ঋণ গ্রহণের ব্যয় বৃদ্ধি, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ দশমিক ৪ শতাংশের সমান বাজেট ঘাটতি এবং ১৯৪০-এর দশকের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানো সরকারি ঋণের বোঝা—সব মিলিয়ে লেকর্নু আর্থিক ও রাজনৈতিক উভয় দিক থেকেই সীমাবদ্ধতার মুখে রয়েছেন।

রাজপথে জনরোষের তীব্র চাপের মুখে তার পূর্বসূরিরা যেভাবে ছাড় দিয়েছিলেন, লেকর্নুর পক্ষে তা করা কঠিন হতে পারে।

সূত্র : বিবিসি

LEAVE A REPLY