ছবি : রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের দুই অর্থনীতিবিদ রবার্ট হল ও মাইকেল উডফোর্ড ২০২৬ সালের অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার জিতেছেন। সোমবার রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস তাদের নাম ঘোষণা করে।
আনুষ্ঠানিকভাবে ‘দ্য সেভেরিগেস রিক্সব্যাংক প্রাইজ ইন ইকোনমিক সায়েন্সেস ইন মেমোরি অব আলফ্রেড নোবেল’ নামে পরিচিত এই পুরস্কার এ বছরের সর্বশেষ নোবেল পুরস্কার। এর অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা, যা প্রায় ১২ লাখ মার্কিন ডলারের সমান।
এই দুই বিজয়ী নতুন সামষ্টিক অর্থনৈতিক মডেল তৈরি করেছেন, যা কার্যকর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নীতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। এসব মডেলের মাধ্যমে উপযুক্ত সময়ে রাজস্ব ও মুদ্রানীতি গ্রহণ করা সম্ভব।ফলে অর্থনীতিতে ক্ষতিকর ওঠানামার তীব্রতা কমাতে পারে।
তাদের গবেষণায় দেখানো হয়েছে, পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত কীভাবে পুরো অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। হল ও উডফোর্ডের গবেষণায় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের খরচ, সঞ্চয় এবং ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাদের তৈরি অর্থনৈতিক মডেল সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কার্যকর নীতি গ্রহণে সহায়তা করে।এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক মন্দা ও অস্থিরতা কমানোর পথ সহজ হয়।
হলের গবেষণায় উঠে এসেছে, ভবিষ্যৎ আয় সম্পর্কে মানুষের প্রত্যাশা তাদের খরচের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হলে সাধারণত বেশি খরচ করে। আবার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা বদলালে খরচের সিদ্ধান্তেও পরিবর্তন আসে। তবে নতুন তথ্য আগে থেকে জানা সম্ভব নয় বলে, মানুষের খরচের পরিবর্তন সব সময় আগাম অনুমান করা যায় না।
১৯৭৮ সালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে হল তার এই ধারণা তুলে ধরেন। পরবর্তী সময়ে তার গবেষণা মানুষের ভোগ ও ব্যয়ের আচরণ নিয়ে আধুনিক অর্থনৈতিক গবেষণার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে ঋণ নেওয়ার সুযোগ না থাকা বা পর্যাপ্ত সঞ্চয় না থাকার কারণে কিছু পরিবারের খরচের সিদ্ধান্ত তার তত্ত্বের সঙ্গে নাও মিলতে পারে।
অন্যদিকে মাইকেল উডফোর্ডের গবেষণা সরবরাহ ও চাহিদার আকস্মিক পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্যকর অর্থনৈতিক নীতি তৈরিতে সহায়তা করেছে। পণ্যের ঘাটতি বা উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে সরবরাহ কমতে পারে। আবার নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে কম খরচে বেশি পণ্য উৎপাদন সম্ভব হলে সরবরাহ বাড়ে।
একইভাবে ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী খবর পেলে মানুষ বেশি খরচ করতে পারে, ফলে চাহিদা বাড়ে। নেতিবাচক খবরের কারণে চাহিদা কমতেও পারে। এসব পরিবর্তনে অর্থনীতির ভারসাম্য নষ্ট হলে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার, সরকারি ব্যয় ও করনীতিতে পরিবর্তন এনে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখার নীতির ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠায় অবদানের জন্য রবার্ট ই হল ও মাইকেল উডফোর্ডকে ২০২৬ সালের অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতি পুরস্কার নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যান জন হাসলার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘বিজয়ীদের গবেষণা এমন একটি স্থিতিশীল তাত্ত্বিক ভিত্তি দিয়েছে, যেই মডেল বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকার অর্থনৈতিক মডেল ব্যবহার করছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘জ্বালানি সংকট কিংবা পরিবারের ভোগব্যয়ের আকস্মিক পরিবর্তনের মতো অর্থনৈতিক অভিঘাত মোকাবিলায় তাদের গবেষণা আমাদের আরো ভালোভাবে প্রস্তুত করেছে।’ ১৯৬৯ সালে প্রথমবারের মতো অর্থনীতিতে এই পুরস্কার দেওয়া হয়। তবে এটি আলফ্রেড নোবেলের ১৮৯৫ সালের উইলে নির্ধারিত মূল পাঁচটি পুরস্কারের অন্তর্ভুক্ত নয়। সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই পুরস্কারটি পরে চালু করে।
এ পর্যন্ত অর্থনীতিতে নোবেলজয়ীদের অধিকাংশই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। এ পুরস্কারজয়ী নারীর সংখ্যা মাত্র তিনজন। সর্বশেষ ২০২৩ সালে ক্লডিয়া গোল্ডিন যুক্তরাষ্ট্রে সময়ের সঙ্গে মজুরি ও কর্মসংস্থানে লিঙ্গের প্রভাব নিয়ে গবেষণার জন্য এ পুরস্কার পান।
ক্ল্যারিভেটের অধীন ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্টিফিক ইনফরমেশনের বিশ্লেষণে মুদ্রানীতি, তথ্যপ্রযুক্তির অর্থনীতি এবং বিবর্তনভিত্তিক অর্থনৈতিক তত্ত্ব নিয়ে কাজ করা গবেষকদের সম্ভাব্য পুরস্কারজয়ী হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। গত বছর অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন জোয়েল মোকির, ফিলিপ আগিয়োঁ ও পিটার হাউইট।
প্রযুক্তি ও উৎপাদনপদ্ধতির উদ্ভাবন কীভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার মান বাড়াতে পারে, সে বিষয়ে ‘ক্রিয়েটিভি ডিসট্রাকশন’ তত্ত্ব নিয়ে কাজের জন্য তাদের এই পুরস্কার দেওয়া হয়।










































