স্কুলে বুলিংয়ের শিকার হওয়া, অভিনয়ের প্রস্তাব পেতে শারীরিক সম্পর্কের চাপ এবং চার বছরের প্রেমের সম্পর্কে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন—জীবনের এমন কঠিন অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ্যে এনেছেন ভারতীয় অভিনেত্রী নীতি টেইলর। জানিয়েছেন, সাবেক প্রেমিক তাকে অপমান করার পাশাপাশি মারধর করতেন, এমনকি সিগারেটের ছ্যাঁকাও দিতেন।এসব ঘটনার প্রভাব এখনো তার মনে রয়ে গেছে।
‘ক্যায়সি ইয়ে ইয়ারিয়াঁ’, ‘গুলাম’, ‘বড়ে আচ্ছে লাগতে হ্যায়’ ও ‘অ্যালায়েন্স’-এর মতো ধারাবাহিকে অভিনয় করে পরিচিতি পেয়েছেন নীতি। সম্প্রতি ‘হটারফ্লাই’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতাগুলো তুলে ধরেন তিনি। কথা বলেন স্কুলজীবনের বুলিং, কাস্টিং কাউচ, সাবেক প্রেমিকের নির্যাতন এবং সহশিল্পীর সঙ্গে মনোমালিন্য নিয়েও।
স্কুলে বুলিংয়ের শিকার, স্কুলে প্রতিদিন কাঁদতেন
স্কুলজীবনকে নিজের জীবনের অন্যতম খারাপ সময় বলে উল্লেখ করেছেন নীতি। তার ভাষ্য, ১৬ জন মেয়ের একটি দলের সদস্য ছিলেন তিনি। তাদের স্কুলের বিপরীতে ছিল ছেলেদের একটি স্কুল। দলের অনেকেই সেখানকার ছেলেদের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ালেও নীতি তাদের প্রেমিকদের প্রতি কখনো আগ্রহ দেখাননি।তবে তাদের কয়েকজন নীতিকে মেসেজ পাঠাতে শুরু করেন। প্রত্যাখ্যাত হওয়ার বিষয়টি কেউ কেউ মেনে নিতে পারেননি বলে তার ধারণা।
এরপরই শুরু হয় অপমান ও হয়রানি। বান্ধবীদের প্রেমিকদের সঙ্গে কথা বলার অভিযোগ তুলে তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হতো। স্কুলের শৌচাগার ও বাসস্টপসহ বিভিন্ন জায়গায় লিখে রাখা হয়েছিল তার বাড়ির ফোন নম্বর।সে সময় মুঠোফোনের ব্যবহার সীমিত থাকায় ল্যান্ডফোনে আসতে শুরু করে আপত্তিকর কল।

নীতি বলেন, স্কুলে আমাকে প্রচুর বুলিং ও র্যাগিংয়ের শিকার হতে হয়েছিল। সেই সময়টা ছিল আমার জীবনের অন্যতম খারাপ অধ্যায় এবং আমি কখনোই সেই দিনগুলোর কথা আর মনে করতে চাই না। আমার দলের অধিকাংশ মেয়েই ওই স্কুলের কোনো না কোনো ছেলের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছিল। আমি তাদের প্রেমিকদের আশপাশে দেখতাম ঠিকই, কিন্তু তাদের প্রতি কখনোই কোনো আগ্রহ দেখাইনি কারণ তারা আমার বান্ধবীদের প্রেমিক ছিল। তবে তাদের অনেকেই আমাকে মেসেজ করা শুরু করেছিল। আমার ধারণা, তাদের মধ্যে কেউ কেউ উপেক্ষা বা প্রত্যাখ্যান মেনে নিতে পারেনি।
জানান, সহপাঠীদের কেউ কেউ তাকে কুরুচিপূর্ণ প্রশ্ন করত, গায়ে পানি ও খাবার ছুড়ে মারত, এমনকি তাকে নিয়ে অশ্লীল কথাও লিখত। তার সম্পর্কে অপমানজনক ছবি আঁকা হতো। এসব ঘটনায় প্রায় প্রতিদিন স্কুলবাসে বসে কাঁদতেন তিনি। বিষয়টি বাবা-মাকে জানানোর পর তারা তাকে পরীক্ষায় মনোযোগ দিতে বলেন এবং পরীক্ষা শেষ হলে শহর ছেড়ে যাওয়ার আশ্বাস দেন।

চার বছরের সম্পর্কে শারীরিক নির্যাতন
‘ক্যায়সি ইয়ে ইয়ারিয়াঁ’র প্রথম মৌসুমের শুটিং চলাকালে একটি নিপীড়নমূলক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন নীতি। তার দাবি, সাবেক প্রেমিক তার পোশাক নিয়ে আপত্তি জানাতেন। ছোট পোশাক পরলে বলতেন, অন্যরা তার দিকে তাকিয়ে আছে। কোথায় যাচ্ছেন কিংবা কারো কাছাকাছি দাঁড়াচ্ছেন কেন—এসব নিয়েও জবাবদিহি করতে হতো তাকে।
একবার প্রেমিকের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গিয়ে অস্বস্তি বোধ করায় বান্ধবীদের সঙ্গে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন নীতি। তবে প্রেমিককে বিদায় জানাতে গেলে তিনি তাকে বাধা দেন। বান্ধবীরা তাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে চাইলেও প্রেমিক তাতে রাজি হননি।
এরপর বাড়ির বাইরে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে। নীতির ভাষ্য, সাবেক প্রেমিক তাকে ধরে ধাক্কা দেন এবং চড় মারেন। পুরো ঘটনা ভবনের সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে। বান্ধবীরা তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেও প্রেমিক তাকে ছাড়তে চাইছিলেন না।
নীতি আরও জানান, ঘটনার পরও তাকে মানসিকভাবে হেনস্তা করা হয়। একপর্যায়ে সাবেক প্রেমিক তাকে সিগারেটের ছ্যাঁকা দেন। সেই ক্ষতের দাগ এখনো তার শরীরে রয়েছে। তার ত্বকে সহজেই কেলয়েড তৈরি হওয়ায় দাগটি স্পষ্ট হয়ে আছে।
/bollyy/media/post_attachments/d3e61b85-ceb.jpg)
‘তুমি খাটো, মোটা, দেখতে বাজে’
শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি সাবেক প্রেমিকের কাছ থেকে নিয়মিত অপমানজনক কথাও শুনতে হতো নীতিকে। তার দাবি, প্রেমিক তাকে বলতেন, ‘তুমি খুব খাটো, তুমি খুব মোটা, তোমাকে দেখতে খুব বাজে।’ এভাবে তাকে নিজের চেহারা ও যোগ্যতা নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগতে বাধ্য করতেন।
সম্পর্কটি টিকিয়ে রাখতে নীতি প্রেমিকের নানা কাজ করে দিতেন। তার ঘরের ফ্রিজ ও মাইক্রোওয়েভ পরিষ্কার করা, রান্না করা, এমনকি প্রেমিকের বাবা-মা বেড়াতে এলে তাদের ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার কাজও করতেন। প্রেমিকের কথামতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি প্রকাশ ও তাকে ট্যাগ করতেন।
চার বছর ধরে চলা ওই সম্পর্ক তার আত্মবিশ্বাসে গভীর প্রভাব ফেলে। সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার পরই বিষয়টি বুঝতে পারেন তিনি। নীতি জানান, এখনো কেউ তার সৌন্দর্যের প্রশংসা করলে তা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।
অভিনেত্রীর মতে, বেড়ে ওঠার সময় নিজের মূল্য বুঝতে শেখা অত্যন্ত জরুরি। অন্য কাউকে নিজের আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাস নষ্ট করতে দেওয়া উচিত নয়।

কাস্টিং কাউচের অভিজ্ঞতা
দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রে কাজ করার সময় কাস্টিং কাউচের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন নীতি। জানান, দুটি সিনেমায় অভিনয়ের পর প্রথম ছবির পরিচালক তাকে নতুন একটি সিনেমায় কাজের প্রস্তাব দেন। কিন্তু চরিত্রটি পেতে হলে পরিচালকের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়াতে হবে বলে জানানো হয়। এমন প্রস্তাবে হতবাক হয়ে যান অভিনেত্রী। ঘটনাটি তাকে এতটাই আঘাত করেছিল যে, এরপর আর সিনেমায় কাজ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি।
নীতি বলেন, আমি মাত্র দুটি সিনেমায় অভিনয় করেছিলাম। আমার প্রথম সিনেমার পরিচালক পরবর্তীতে আরেকটি প্রজেক্টের জন্য আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু তিনি যখন আমাকে ফোন করলেন, তখন বললেন যে এবার চরিত্রটি পেতে হলে আমাকে তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়াতে হবে। আমি এতটাই হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম যে কী প্রতিক্রিয়া দেখাব, তা বুঝতে পারছিলাম না। আমি কেবল ফোনটা কেটে দিলাম, তার নম্বর ব্লক করলাম এবং কী ঘটেছে তা জানানোর জন্য মাকে ফোন করলাম। তিনি বয়সে অনেক বড় ছিলেন এবং এর আগেও তাকে অন্য নারীদের সঙ্গে দেখেছি। তিনি কখনো আমার কাছে এমন আবদার করে বসবেন, তা আমি কখনোই ভাবিনি। সেই ঘটনাটি আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করল যে আমি আর কখনোই সিনেমায় কাজ করব না। আমি পুরোপুরি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম এবং তাঁকে কী বলব, তা বুঝে উঠতে পারছিলাম না।
.jpg)
‘গুলাম’-এর সেটেও সমস্যার মুখে
‘গুলাম’ ধারাবাহিকে কাজ করার সময় এক সহ-অভিনেতার সঙ্গে সমস্যার কথাও জানিয়েছেন নীতি। তার ধারণা, ধারাবাহিকে তিনি যে মনোযোগ পাচ্ছিলেন, তা ওই সহশিল্পী ভালোভাবে নেননি।
নীতি জানান, তারা একই মেকআপশিল্পীর কাছ থেকে মেকআপ নিতেন। কিন্তু ওই সহশিল্পী দরজা বন্ধ করে রাখতেন, যাতে মেকআপশিল্পী নীতির কাছে যেতে না পারেন। একবার মেকআপশিল্পীকে নিজের ঘরে আটকে রাখার ঘটনাও ঘটেছিল বলে দাবি করেন তিনি।
এ ছাড়া তাকে নিয়ে নেতিবাচক প্রতিবেদন প্রকাশের বিষয়েও ক্ষোভ জানান নীতি। তার ধারণা, কিছু প্রতিবেদন অর্থের বিনিময়ে প্রকাশ করা হয়েছিল। সেসব প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে সেটে দেরিতে আসা, মেজাজ দেখানো ও উদ্ধত আচরণের অভিযোগ তোলা হয়েছিল। অথচ তিনি সব সময় সময়নিষ্ঠ থাকার চেষ্টা করতেন বলে জানান অভিনেত্রী। এসব অভিযোগ তাকে কষ্ট দিয়েছিল।










































