‘মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আপনাদের নকীব হয়েই থাকতে চাই’

নকীব খান

সংগীতজীবনের ৫০ বছর পূর্ণ করেছেন নকীব খান। স্বাধীনতার পরপরই জন্মস্থান চট্টগ্রাম থেকে শুরু হয় তাঁর সংগীতের যাত্রা। বালার্ক ব্যান্ডে গায়ক, পিয়ানিস্ট ও শিল্পী হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ। ১৯৭৪ সালে যোগ দেন সোলসে।

এ ব্যান্ডে প্রায় ১০ বছর ছিলেন নকীব খান। বাবা মারা যাওয়ার পর চট্টগ্রাম ছেড়ে চলে আসেন ঢাকায়। ১৯৮৫ সালে গড়ে তোলেন নিজের ব্যান্ড রেনেসাঁ। সেই থেকে রেনেসাঁ নিয়েই শ্রোতাদের ভালোবাসা কুড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি।

 গত বছরই সুরকার হিসেবে পাঁচ দশক পূর্ণ করেছেন ‘মন শুধু মন ছুঁয়েছে’ গানের এ শিল্পী। এ উপলক্ষে ১৭ জানুয়ারি ‘সুরে সুরে পঞ্চাশে’ আয়োজন করা হয়েছে। কেমন ছিল ৫০ বছরের পথ চলা, এখনকার গান নিয়েও কী ভাবছেন তিনি? নকীব খানের সঙ্গে কথা বলেছেন সুদীপ কুমার দীপ।

সুরকার হিসেবে ৫০ বছর পার করেছেন।

উদযাপনের প্রস্তুতি চলছে। কেমন লাগছে?

এটা অনেক বড় প্রাপ্তি। শুরুতে কখনো ভাবিনি এভাবে পথ চলতে চলতে অর্ধ শতাব্দী পার হয়ে যাবে। এখনো মনে হয়, এই তো সেদিন! আমি হাঁটি হাঁটি পায়ে শুরু করলাম। এর মধ্যে ৫০ বছর! ১৭ জানুয়ারি রাজধানীর তেজগাঁও ইয়ামাহা ফ্ল্যাগশিপ সেন্টারে আমাকে নিয়ে একটা ইভেন্টের আয়োজন করেছে ‘নুর’স ইভেন্ট’।

তাদের ধন্যবাদ। সেদিন আমি শ্রোতাদের আমার দীর্ঘ পথচলার নানা ঘটনা শোনাব। গান গাইব, সঙ্গে থাকবে কবিতাও।

অর্ধ শতাব্দীর এই পথ চলায় নিজের অর্জন নিয়ে কতটা খুশি?

বলে বোঝাতে পারব না, মনের ভেতরকার উপলব্ধি সব সময় শব্দে প্রকাশ করা যায় না। এই দীর্ঘ সময় যারা আমার গান শুনেছেন, সুর পছন্দ করেছেন, মনে গেঁথে রেখেছেন; তাঁদের প্রত্যেকের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। আজ তাঁদের জন্যই আমি নকীব খান হতে পেরেছি। তাঁরা যদি শুরুতেই আমাকে ছুড়ে ফেলতেন, আমার গান পছন্দ না করতেন, তাহলে ৫০ বছর কেন! পাঁচ বছরও আমি গানে থাকতে পারতাম না।

কখনো না-পাওয়া ভিড় করেছে মনের মাঝে?

অবশ্যই। এখনো কিছু করতে পারিনি বলে মনে হয়। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আমার অনেক দায় থেকে যাবে। এই ৫০ বছরে রয়্যালিটি নিশ্চিত করা উচিত ছিল, গানকে আন্তর্জাতিক প্রোপার্টিজে রূপান্তরিত করার দরকার ছিল। কিছুই পারিনি। তবে হ্যাঁ, কিছুটা দায় এড়াতে পারব এই ভেবে যে আমার চেষ্টা ছিল। এখনো আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি। কোনো শিল্পীর যেন শেষ বয়সে দুস্থ হিসেবে পথে দাঁড়াতে না হয় সেই ব্যবস্থা করার আপ্রাণ চেষ্টা আমি করব।

সংগীতের হাতেখড়ি নিয়ে যদি বলতেন…

কেজি ওয়ান থেকেই আমি গান করি। বড় ভাই জিলু খান ছিলেন বিখ্যাত সংগীত পরিচালক। তাঁকে দেখেই উৎসাহ পেতাম। ১৯৭৪ সালে প্রথমবার গানে সুর করেছিলাম। ‘একাকী যখন নির্জনে’ শিরোনামের গানটি লিখেছিলেন প্রয়াত হেনা ইসলাম। মূলত আমার বড় ভাইকে দিয়ে সুর করানোর জন্য বেশ কিছু গীতিকবিতা তিনি দিয়েছিলেন। সেখান থেকেই গানটি সুর করেছিলাম। যদিও গানটি এখনো প্রকাশ করতে পারিনি। এরপর তো ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হলাম। শুরুটা ‘বালার্ক’ দিয়ে। এরপর ‘সোলস’, ‘রেনেসাঁ’, একক গান—কত শত স্মৃতি…।

সুরকার এবং শিল্পীদুটি জায়গাতেই আপনি সফল। তবে নিজেকে বেশি পছন্দ করেন কোন জায়গায়?

সব সময় সুরকার হিসেবে নিজেকে দেখতে পছন্দ করি। গীতিকারের পর সুরকারই একটি গান সৃষ্টি করেন। শিল্পী তো সেই, যে গানে পারফরম করেন। সুরকারদের শুধু সুর করা নয়, অনেক অনেক দায়িত্বও থাকে। কোন গান কোন শিল্পীকে দিয়ে গাওয়াবেন, কোন শিল্পী গাইলে গানটি ক্লিক করবে এগুলো সুরকারই সিদ্ধান্ত নেন। ‘হৃদয় কাদামাটির কোনো মূর্তি নয়’ গানটি সুর করার পর অনেকেই বলেছিলেন আমাকে গাইতে। তবে আমি গাইনি। সুরকার হিসেবে মনে হয়েছে গানটির জন্য একটা হাস্কি ভয়েজ দরকার। আমি বেছে নিলাম বগী ভাইকে। তিনি কিন্তু এই গানের আগে কখনো বাংলায় গান করেননি। সব সময় ইংরেজি গাইতেন। দেখেন, তিনি গাওয়ার পর শ্রোতারা গানটি লুফে নিলেন। নিলুফার ইয়াসমিনের কণ্ঠেও পেল সমান জনপ্রিয়তা।

গত পাঁচ দশকে ব্যান্ডের নানা চড়াই-উতরাই পার হয়েছে। এখনকার অবস্থান নিয়ে আপনি কতটা সন্তুষ্ট?

পাঁচ দশকে অন্তত পাঁচটা প্রজন্ম এসেছে। গানেও এসেছে পরিবর্তন। এটা মেনে নিতে হবে। এখন টেকনোলজিনির্ভর গান হচ্ছে। তবে এটা হওয়ার কথা ছিল না। মানুষের দাস হওয়ার কথা টেকনোলজিকে, অথচ আমরা টেকনোলজির দাস হয়ে যাচ্ছি। এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না, পাঁচ দশক পর জানা যাবে এই সময়ের কোন গান টিকে আছে, কোনটা হারিয়ে গেছে। এখনকার শিল্পীদের বলতে চাই, যে গানে লিরিক্যাল ভ্যালু নেই, মেলোডি নেই, সে গান কখনো কালজয়ী হবে না। এ আই দিয়ে তো হরহামেশা গান হচ্ছে। কোনোটা কি হৃদয় ছুঁতে পেরেছে? সত্যিকার অর্থে টেকনোলজি কখনো আবেগকে ছুঁতে পারে না। আবেগ আসে হৃদয় থেকে।

এই প্রজন্মের শিল্পীদের গান কেমন লাগে?

অনেক মেধাবী শিল্পী আছে এই প্রজন্মে। আমিও অনেকের সঙ্গে কাজ করেছি, করছি। সরাসরি কারো নাম বলতে চাই না। তবে তাদের কাছে আমার চাওয়া, সস্তা জনপ্রিয়তার দিকে না ছুটে ভালো গানের দিকে নজর দাও। তাহলে বাংলা গানের সমৃদ্ধি হবে, নিজেদেরও স্থায়িত্ব বাড়বে। এখন অনেকেই ভাইরাল গানের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। পাঁচ বছর আগের ভাইরাল গানটি এখন কোথাও কি বাজতে শোনা যায়? আমি শুনি না। বুঝতে হবে তারকা হওয়া সহজ, তবে ঝরে পড়াটা আরো সহজ। ভালো কথা, ভালো সুরের গান হয়তো ধীরে ধীরে মানুষের কাছে পৌঁছায়, তবে সেটা একবার পৌঁছালে থেকে যায়।

আপনার শ্রোতাদের উদ্দেশে কিছু বলুন…

একটাই কথা, আমি কৃতজ্ঞ। আমাকে অর্ধশতাব্দী আপনারা সঙ্গে রেখেছেন। পৃথিবীর যে প্রান্তেই যাই, আপনাদের ভালোবাসা পেয়েছি, শ্রদ্ধা পেয়েছি। একজন শিল্পী এরচেয়ে বেশি কিছু চায় না। আপনারা সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আপনাদের নকীব হয়েই থাকতে চাই।

LEAVE A REPLY