এই সময়ের হলিউড তারকা, বিশেষ করে অভিনেত্রীরা দর্শকদের যতই মুগ্ধ করুক না কেন, এই ইন্ডাস্ট্রিতে অতীতে এমন কিছু অভিনেত্রী ছিলেন, যাদের সৌন্দর্য্যরে জাদুর কাছে নত হয়েছিলেন অনেক রথী মহারথী। সোনালী যুগের সেসব নায়িকাদের সৌন্দর্য কেবল প্রশংসিতই হয়নি বরং আইকনিকও হয়ে উঠেছে। এমনকি কয়েক দশক পরেও তাদের অবয়ব, স্বাভাবিক সৌন্দর্য এবং পর্দার উপস্থিতি দর্শকদের স্মৃতিতে গেঁথে রয়েছে। শুধু সৌন্দর্যই নয়, ফ্যাশনের দিক থেকেও তারা ছিলেন অনবদ্য। হলিউডের এমন কালজয়ী দশ অভিনেত্রী, যারা সিনেমা এবং ফ্যাশন জগতে চিরন্তন স্মৃতি হয়ে আছেন, তাদের নিয়ে সাজানো হয়েছে এই ফিচার লিখেছেন শাহনাজ হেনা
অড্রে হেপবার্ন (১৯২৯-১৯৯৩)
ব্রিটিশ অভিনেত্রী অড্রে হেপবার্ন ছিলেন ক্লাসিক সৌন্দর্য এবং মার্জিততার প্রতীক। তাকে দেওয়া হয়েছিল ‘কুইন অফ অল কুইন্স’র উপাধি। তার হরিণীর মতো চোখ, রাজহাঁসের মতো ঘাড় (এটি একটি প্রশংসামূলক বিশেষণ) এবং মার্জিত আচরণের জন্য ব্যাপকভাবে পরিচিত ছিলেন এ অভিনেত্রী। অড্রের বেশিরভাগ সিনেমাই বক্স অফিসে হিটের তকমা পেয়েছে। তবে সবচেয়ে আইকনিক ভ‚মিকা ছিল তার অভিনীত ‘ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফানি’স (যা মেরিলিন মনরোর জন্য তৈরি হওয়ার কথা ছিল), ‘রোমান হলিডে’ এবং ‘সাবরিনা’য়। এই রেট্রো ক্লাসিকগুলি কেবল তার অভিনয় প্রতিভাই প্রদর্শন করেনি, বরং তার ফ্যাশন-ফরোয়ার্ড ব্যক্তিত্বও দেখিয়েছে। শুধু পর্দায় নয়, অড্রে হেপবার্ন গ্লামার এবং স্পটলাইটের বাইরেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিলেন। বর্ণাঢ্য জীবনের শেষের দিকে ইউনিসেফের সাথে মানবিক কাজ তার সৌন্দর্যের আভাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
মেরিলিন মনরো (১৯২৬-১৯৬২)
মেরিলিন মনরো হলেন সেই নাম যাকে ছাড়া হলিউডের সুন্দরীদের তালিকা অসম্পূর্ণ থাকত। তার শারিরীক সৌন্দর্য্য এতটাই আকর্ষণীয় ছিল যে, তখনকার অসংখ্য পুরুষের হৃদয়ের রানী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। এখনও বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সিনেভক্তের প্রিয় মেরিলিন মনেরো। যদিও বেশিরভাগ সিনেমায় তাকে হলিউডের সাদাসিধা মেয়ে হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছিল। তবে ‘সাম লাইক ইট হট’, ‘জেন্টলম্যান প্রেফার ব্লন্ডস’ এবং বিখ্যাত ‘দ্য সেভেন ইয়ার ইচ’র মতো সিনেমায় তার আকর্ষণীয় আবেদনময় উপস্থিতি দর্শকদের মোহিত করেছে। রিল লাইফ এবং বাস্তব জীবন যে পুরোপুরি আলাদা মেরিলিন মনরো তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। সিনেমায় গ্ল্যামারাস উপস্থিতি সত্ত্বেও ব্যক্তিজীবনে তার একটি দুর্বলতা ছিল, যা তার নিরাপত্তাকে জটিল করে তুলেছিল। তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি রবার্ট এফ কেনেডির সঙ্গে তার সম্পর্কের কথাও শোনা গিয়েছিল। হয়তো এ কারণেই তার জীবনে করুণ ইতিহাস লেখা হয়েছিল। ব্যক্তিজীবন বিভিন্ন বিতর্কের মধ্যেই তাকে অতিবাহিত করতে হয়েছে। তথাপিও তার ঝলসানো সৌন্দর্য তাকে চিরন্তন আইকন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ইনগ্রিড বার্গম্যান (১৯১৫-১৯৮২)
খুব কম অভিনেত্রীই তাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি প্রকাশ করেছেন, এবং সত্যি বলতে, ইনগ্রিড বার্গম্যান সম্ভবত সেই তালিকার শীর্ষে রয়েছেন। এই সুইডিশ সুন্দরী বুদ্ধিমত্তা এবং ন্যুনতম মেকআপ দিয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে তাজা বাতাসের শ্বাস নিয়ে এসেছিলেন। ‘নটোরিয়াস’, ‘গ্যাসলাইট’ এবং অবশ্যই, ‘ক্যাসাব্লাঙ্কা’য় অসাধারণ অভিনয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক তারকা হয়ে ওঠেন এই হলিউড সুন্দরী।
মারলিন ডিট্রিচ (১৯০১-১৯৯২)
মারলিন ডিট্রিচ! একজন নারী, একটা মিথ, সর্বোপরি কিংবদন্তি। গভীর কণ্ঠস্বর, রহস্যময় আকর্ষণ এবং দারুন স্টাইল দিয়ে হলিউডে সৌন্দর্য এবং প্রলোভনকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন মারলিন। জার্মান বংশোদ্ভ‚ত এ অভিনেত্রী এবং গায়িকা তার সাহসী ভ‚মিকা দিয়ে আলোড়ন তুলেছিলেন, যা সেই সময়ে খুব কম অভিনেত্রীই করতে পেরেছিলেন। ‘উইটনেস ফর দ্য প্রসিকিউশন’ সিনেমায় তার চরিত্র, ক্রিস্টিন ভোলের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে? এছাড়াও ‘স্টেজ ফ্রাইট’, ‘অ্যা ফরেন অ্যাফেয়ার’ এবং ‘মরক্কো’তে তার অভিনয়ের কথা দর্শক ভুলবে না কখনোই। কারণ, এটা যদি কেউ ভুলে যায় তাহলে তা একটি অপরাধের চেয়ে কম কিছু নয়। অনেকেই জানেন না, তিনি সেই সময়ে স্বৈরশাসক হিটলারের শাসনের বিরুদ্ধে বহুবছর পরোক্ষভাবে লড়াই করেও কাটিয়েছিলেন। পরে যখন তিনি জার্মান নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নতুন নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেন তখন তাকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলা হয়।
গ্রেস কেলি (১৯২৯-১৯৮২)
গ্রেস কেলি ছিলেন দারুন পরিশীলিততার মূর্ত প্রতীক। গ্রেস শান্ত আচরণের জন্যও পরিচিত ছিলেন। আলফ্রেড হিচককের বিখ্যাত ‘রিয়ার উইন্ডো’, ‘টু ক্যাচ অ্যা থিফ’ এবং ‘ডায়াল এম ফর মার্ডার’র মতো ক্লাসিক সিনেমা দিয়ে পর্দায় আলো ছড়িয়ে দিয়েছিলেন গ্রেস। তার সময়ে একইসঙ্গে মার্জিত এবং দৃঢ়-ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন অভিনেত্রীর উদাহরণ ছিলেন একমাত্র তিনিই। হতে পারে। অভিনয় ক্যারিয়ারের পাশাপাশি তার রাজকীয় উপাধিও ছিল। মোনাকোর প্রিন্স রেইনিয়ারকে বিয়ে করেছিলেন তিনি, কোনও বিতর্ক তৈরি না করেই হলিউড আইকন থেকে রাজকুমারী গ্রেস হয়েছিলেন। তবু আজও, তিনি সর্বকালের সবচেয়ে প্রশংসিত মহিলাদের একজন।
রিটা হেওয়ার্থ (১৯১৮-১৯৮৭)
হলিউডের ‘প্রেমের দেবী’ রিতা হেওয়ার্থ ১৯৪০-এর দশকে সিনেমাশিল্পের গ্ল্যামারকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। ব্র“কলিনের বাসিন্দা তার লাল চুল এবং ভুবন ভোলানো হাসির জন্য বিখ্যাত ছিলেন। ‘গিল্ডা’ সিনেমায় শুধু অভিনয়ই নয়, নৃত্য প্রতিভা এবং তার চৌম্বকীয় যৌন আবেদন এখনও দর্শকের চোখ জুড়ায়। তবে পর্দার আড়ালে তিনি ছিলেন অনেক আলাদা। একেবারেই লাজুক ও শান্ত। প্রথমে মার্গারিটা ক্যানসিনো নামে একজন স্বর্ণকেশী মহিলা হিসাবে পরিচিত ছিলেন তিনি। পরে নাম পরিবর্তন করে রিটা হেওয়ার্থ হয়ে উঠেন।
এলিজাবেথ টেলর (১৯৩২-২০১১)
দীঘল কালো চুল এবং বিখ্যাত বেগুনি চোখ এলিজাবেথ টেলরকে করে তুলেছিল সৌন্দর্যের মূর্ত প্রতীক। যদিও তিনি শিশুশিল্পী হিসেবে তার পর্দার যাত্রা শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ‘ক্লিওপেট্রা’, ‘ক্যাট অন অ্যা হট টিন রুফ’ এবং ‘হু ইজ অ্যাফ্রেড অফ ভার্জিনিয়া উলফ’-এ অভিনয়ের মাধ্যমে দারুন প্রভাব ফেলেছিলেন। টেলরের সৌন্দর্য সময়ের সাথে সাথে বিকশিত হয়েছিল, কিন্তু তীব্র আবেগ দিয়েও সবসময় নিজের দর্শকদের মুগ্ধ করে রেখেছিলেন টেলর। অড্রে হেপবার্নের মতো, তিনি পরে এইডস অ্যাডভোকেসিতে তার মানবিক কাজের জন্য পরিচিত হয়ে ওঠেন।
গ্রেটা গার্বো (১৯০৫-১৯৯০)
এই সুইডিশ অভিনেত্রী ছিলেন রহস্য এবং আকর্ষণের মূর্ত প্রতীক, যা তাকে হলিউডের সবচেয়ে আকর্ষণীয় তারকাদের একজন করে তুলেছিল। তিনি ‘ফ্লেশ অ্যান্ড দ্য ডেভিল’র মতো নির্বাক সিনেমা এবং পরে ‘আনা ক্রিস্টি’ এবং ‘ক্যামিল’র মতো সবাক সিনেমায় তার অপরূপ সৌন্দর্য এবং তীব্র, মনকাড়া অভিনয় দিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেছিলেন। ব্যক্তিজীবনে খুবই চাপা স্বভাবের এই অভিনেত্রী ক্যারিয়ারের শীর্ষে থাকাকালীন হলিউড ছেড়ে চলে যান। কারণ হিসাবে বলেছিলেন, কাজের চাপে তিনি ক্লান্ত।
আভা গার্ডনার (১৯২২-১৯৯০)
আভা গার্ডনার তার তীক্ষ্ণ সৌন্দর্য এবং যৌনাবেদনের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তার পান্না চোখ এবং আÍবিশ্বাসী আচরণ দিয়ে সেসময় হলিউডবাসীদের মুগ্ধ করে রেখেছিলেন এ অভিনেত্রী। ‘দ্য কিলার্স’, ‘মোগাম্বো’ এবং ‘দ্য বেয়ারফুট কনটেসা’র মতো হিট সিনেমার মাধ্যমে খ্যাতির আকাশ ছুঁয়েছিলেন আভা। ক্যামেরার বাইরে সমানভাবে সুন্দরী কয়েকজন অভিনেত্রীর মধ্যে একজন তিনি। সেই সময়ে একজন মহিলা হিসেবে তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং দারুন স্বাধীনচেতা ছিলেন, যিনি হলিউড এবং জাঁকজমকের বাইরেও নিজের মতো করে জীবনযাপন করতে পছন্দ করতেন।
লরেন বাকাল (১৯২৪-২০১৪)
স্মোকি ভয়েস ও গভীর দৃষ্টির মাধ্যমে কয়েক দশক ধরে তরুদের হৃদয় কেড়ে নিয়েছিলেন লরেন। ‘নোয়া’ সিনেমাটি তাকে একজন আইকনে পরিণত করেছিল। তবে তাকে সবচেয়ে বড় সাফল্য এনে দিয়েছিল এ অভিনেত্রী হামফ্রে বোগার্টের বিপরীতে ‘টু হ্যাভ অ্যান্ড হ্যাভ নট’। লরেনের সৌন্দর্য ছিল সমভাবে মনোমুগ্ধকর। তার আবেদন এতটাই মোহনীয় ছিল যে, যে কেউ তার যে কোনো নির্দেশ নির্দ্ধিধায় পালন করতে সম্মত হতেন। বেশ আত্মবিশ্বাসী এবং বুদ্ধিমতিও ছিলেন এ অভিনেত্রী। বার্গম্যানের মতো, লরেনকে কখনই অতিরিক্ত গ্ল্যামারাস দেখানোর জন্য সাজাতে হয়নি; তার শক্তি এবং যৌনাবেদন স্বাভাবিকভাবেই এসেছিল।










































