ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের যেসব রেকর্ড ভাঙা প্রায় অসম্ভব

ছবি : এআই দিয়ে বানানো

১৯৯২ সালে যাত্রা শুরু করা ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ এখন বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রতিযোগিতামূলক ঘরোয়া ফুটবল আসর। ৩৪ মৌসুমের পথচলায় খেলোয়াড় ও ক্লাবের অসংখ্য অসাধারণ কীর্তি দেখা গেছে।

তবে কিছু রেকর্ড এমন উচ্চতায় পৌঁছেছে, যেগুলো পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ভাঙা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। বর্তমান ফুটবলে খেলোয়াড়দের বিশ্রাম, দলীয় রোটেশন, সূচির চাপ এবং প্রতিযোগিতার তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় এসব রেকর্ডের অনেকগুলোই ভবিষ্যতে অক্ষত থেকে যেতে পারে। 

আগামী ২১ আগস্ট প্রিমিয়ার লিগের ৩৫তম মৌসুম শুরুর আগে দেখে নেওয়া যাক এমন কয়েকটি রেকর্ড, যেগুলো ভাঙা প্রায় অসম্ভব—

অ্যালান শিয়ারারের ২৬০ গোল

প্রিমিয়ার লিগের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা অ্যালান শিয়ারার। ২০০৬ সালে অবসর নেওয়ার আগে ব্ল্যাকবার্ন রোভার্স ও নিউক্যাসল ইউনাইটেডের হয়ে তিনি করেছিলেন ২৬০ গোল।দুই দশক পরও শিয়ারারের রেকর্ড অক্ষত। বর্তমানে দ্বিতীয় স্থানে থাকা হ্যারি কেইন ২১৩ গোল করে প্রিমিয়ার লিগ ছেড়েছে জার্মান বুন্দেসলিগায় গেছেন। ফলে শিয়ারারের ২৬০ গোলের কাছাকাছি এখন কোনো সক্রিয় খেলোয়াড় নেই। তবে ভবিষ্যতে আর্লিং হালান্ডকে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জার হিসেবে দেখা হচ্ছে।দীর্ঘ সময় প্রিমিয়ার লিগে থাকলে এবং বর্তমান গোলের ধারা ধরে রাখতে পারলে নরওয়ের এই স্ট্রাইকার শিয়ারারের রেকর্ড ভেঙে দিতে পারেন। 

চেলসির ৮৬ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ড

২০০৪ সালের মার্চ থেকে ২০০৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত স্ট্যামফোর্ড ব্রিজ যেন প্রতিপক্ষের জন্য দুর্গে পরিণত হয়েছিল। এই সময়ে ঘরের মাঠে টানা ৮৬টি প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচে হারেনি লন্ডনের ক্লাবটি। ক্লদিও রানিয়েরির সময় শুরু হওয়া এই অসাধারণ যাত্রা জোসে মরিনহোর অধীনে আরো সুখকর হয়ে ওঠে। পরে আভ্রাম গ্রান্ট ও লুইস ফেলিপে স্কোলারির সময়ও রেকর্ডটি এগিয়ে যায়।শেষ পর্যন্ত রবিন ফন পার্সির নৈপুণ্যে আর্সেনাল চেলসির এই অপরাজিত যাত্রার অবসান ঘটায়।

ম্যানচেস্টার সিটির ১০০ পয়েন্ট

২০১৭-১৮ মৌসুমে পেপ গার্দিওলার ম্যানচেস্টার সিটি প্রিমিয়ার লিগে এমন এক কীর্তি গড়ে, যা অন্য কোনো দল ছুঁতে পারেনি। সেবার সিটি ৩৮ ম্যাচে ৩২ জয়, ৪ ড্র ও ২ হার নিয়ে সংগ্রহ করে রেকর্ড ১০০ পয়েন্ট। তারা গোল করেছিল ১০৬টি এবং গোল ব্যবধান ছিল +৭৯। মৌসুমের শেষ ম্যাচে সাউদাম্পটনের বিপক্ষে গ্যাব্রিয়েল জেসুসের ৯৪তম মিনিটের গোলেই ১০০ পয়েন্ট নিশ্চিত হয় সিটির। লিভারপুল ২০১৯-২০ মৌসুমে অবিশ্বাস্য শুরু করেছিল। প্রথম ২৭ ম্যাচের ২৬টিতেই জিতেছিল তারা। তবু মৌসুম শেষে তাদের পয়েন্ট দাঁড়ায় ৯৯; সিটির চেয়ে মাত্র ১ পয়েন্ট কম।

এক মৌসুমে মাত্র ১৫ গোল হজম চেলসির

২০০৪-০৫ মৌসুমে ইংলিশ ফুটবলে নিজের প্রথম মৌসুমেই জোসে মরিনহো চেলসির রক্ষণকে অসাধারণ উচ্চতায় নিয়ে যান। পিওতর চেক, জন টেরি, রিকার্দো কারভালহো, উইলিয়াম গালাস ও ক্লদ মাকেলেলের চেলসি ৩৮ ম্যাচে মাত্র ১৫ গোল হজম করেছিল। প্রতি ম্যাচে গড়ে মাত্র ০.৩৯ গোল হজম করে তারা। পুরো মৌসুমে ২৫টি ক্লিন শিট রাখে চেলসি। আরো অবিশ্বাস্য বিষয় হলো, কোনো ম্যাচেই তারা একটির বেশি গোল হজম করেনি। বর্তমান ফুটবলে আক্রমণাত্মক কৌশল, উঁচু ডিফেন্সিভ লাইন, দ্রুত পাল্টা আক্রমণ এবং যোগ করা সময়ের কারণে পুরো মৌসুমে ২০টির কম গোল হজম করাই খুব কঠিন। তাই সবচেয়ে কম ১৫ গোল খাওয়ার রেকর্ডটি দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে।

‘ইনভিন্সিবল’ আর্সেনাল

আর্সেন ওয়েঙ্গার ২০০২ সালে বলেছিলেন, তার দল আর্সেনাল পুরো লিগ মৌসুম অপরাজিত থাকতে পারে। সে সময় তার মন্তব্য নিয়ে অনেকে হাসাহাসি করেছিলেন। কিন্তু দুই বছর পর ওয়েঙ্গারই শেষ হাসি হাসেন। ২০০৩-০৪ মৌসুমে আর্সেনাল ৩৮ ম্যাচে অপরাজিত থেকে লিগ শিরোপা জেতে। এর মধ্যে ছিল ২৬ জয় ও ১২ ড্র। এই যাত্রা পরের মৌসুমেও অব্যাহত থাকে এবং শেষ পর্যন্ত টানা ৪৯ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ড গড়ে আর্সেনাল। ২০০৪ সালের অক্টোবরে ওল্ড ট্রাফোর্ডে বিতর্কিত এক ম্যাচে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কাছে হেরে সেই রেকর্ডের সমাপ্তি ঘটে। ১০০ পয়েন্টের ম্যানচেস্টার সিটি কিংবা ৯৯ পয়েন্টের লিভারপুলও নিজেদের অসাধারণ মৌসুমে হার এড়াতে পারেনি। 

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের টানা ১৪ ক্লিন শিট

২০০৮-০৯ মৌসুমে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড রক্ষণে এক অসাধারণ রেকর্ড গড়ে। রিও ফার্দিনান্দ ও নেমানিয়া ভিদিচের নেতৃত্বাধীন রক্ষণ এবং গোলরক্ষক এডউইন ফন ডার সারকে সামনে রেখে ইউনাইটেড টানা ১৪টি প্রিমিয়ার লিগ ম্যাচে কোনো গোল হজম করেনি। ২০০৮ সালের ৮ নভেম্বর থেকে ২০০৯ সালের ৪ মার্চ পর্যন্ত ফান ডর সার টানা ১৩১১ মিনিট প্রিমিয়ার লিগে গোল হজম না করে কাটান। এখনকার আক্রমণনির্ভর ফুটবলে টানা ১৪ ম্যাচ গোল না খাওয়ার মতো রেকর্ড আরেকবার গড়া খুব কঠিন। 

জেমস মিলনারের ৬৫৮ ম্যাচ

২০২৬ সালের জুনে ৪০ বছর বয়সে অবসর নেওয়ার সময় জেমস মিলনার প্রিমিয়ার লিগে সর্বোচ্চ ৬৫৮ ম্যাচ খেলার কীর্তি গড়েন। ২০০২ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে লিডস ইউনাইটেডের হয়ে প্রিমিয়ার লিগে অভিষেক হয়েছিল মিলনারের। ২০২৬ সালে ব্রাইটনের হয়ে ক্যারিয়ার শেষ করার আগে তিনি টানা ২৪টি প্রিমিয়ার লিগ মৌসুমে খেলেছেন। এই রেকর্ড গড়তে মিলনারকে দীর্ঘ দুই যুগ ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ের ফিটনেস ধরে রাখতে হয়েছে। পাশাপাশি তাকে গুরুতর চোট এড়িয়ে চলতে হয়েছে এবং বিভিন্ন পজিশনে খেলার সক্ষমতা দেখাতে হয়েছে। বর্তমান ফুটবলে ম্যাচের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, খেলোয়াড়দের নিয়মিত বিশ্রাম দেওয়া এবং স্কোয়াড রোটেশনের কারণে কোনো আউটফিল্ড খেলোয়াড়ের পক্ষে লিগে এত বেশি ম্যাচ খেলা প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছে। 

টানা ৫৫ ম্যাচে গোল

২০০১ সালের মে থেকে ২০০২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত টানা ৫৫ ম্যাচে গোলের কীর্তি গড়েছিল আর্সেন ওয়েঙ্গারের আর্সেনাল। 

এক ম্যাচে ১১ গোল

প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে এক ম্যাচে সর্বোচ্চ ১১টি গোলের রেকর্ড গড়েছিল পোর্টসমাউথ ও রিডিং। ২০০৭ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ফ্র্যাটন পার্কে অনুষ্ঠিত সেই রোমাঞ্চকর ম্যাচে রিডিংকে ৭-৪ গোলে হারায় পোর্টসমাউথ। গোলবন্যার রেকর্ড আজ এখনো অক্ষুণ্ণ রয়েছে।

LEAVE A REPLY