তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়াই কি হিমবাহ ধসের কারণ?

ছবি : রয়টার্স

হিমবাহ ধসের কারণেই নেপালে আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে অকল্পনীয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে হিমবাহ ধসে পড়ল কেন, সেটা নিয়ে এখন বিজ্ঞানীরা গবেষণায় মেতেছেন।

প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, ভূমিকম্পের কারণেই হিমবাহ ধসে পড়েছে। ঘটনার প্রথম কয়েক ঘণ্টায় নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ভারতীয় বিজ্ঞানীরা প্রাথমিক ভূকম্পন তরঙ্গ দেখে ধারণা করেছিলেন ভূমিকম্পের কারণেই ভূমিধস বা হিমবাহ ধস হয়েছে। 

ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশন-ইসরোর অন্যতম প্রধান শাখা ভারতের ন্যাশনাল রিমোট সেন্সিং সেন্টার-এরআরএসসি স্যাটেলাইটের সাহায্যে একটি প্রাথমিক মূল্যায়ন চালিয়েছে। তাদের প্রাথমিক রিপোর্টেও বলা হয়, একটি ৪.৯ মাত্রার ভূমিকম্প এই হিমবাহের ধসটিকে শুরু করে থাকতে পারে।

ভারতে যখন কোনো পাহাড়ি বিপর্যয় ঘটে, তখন ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তর বা ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজি তাদের সিসমিক গ্রাফে ধরা পড়া কম্পনটি রেকর্ড করে। এনআরএসসি সেই কম্পনের রেকর্ড দেখেই অনুমান করেছিল যে যেহেতু কম্পন হয়েছে, তাই হয়ত ভূমিকম্পই ধসের কারণ।

এখন জানা যাচ্ছে, কম্পনের ঘটনা ঘটেছে ঠিকই, তবে সেটা প্রাকৃতিক ভূমিকম্প নয়। বরং হিমবাহ ধসের কারণেই পৃথিবী কেঁপে উঠেছিল।এই কম্পন ভূ-পৃষ্ঠের ওপরে সৃষ্টি, ভূ-গর্ভ থেকে নয়। 

আমেরিকার ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা-ইউএসজিএস তাদের বিশ্লেষণ আপডেট করে স্পষ্ট জানিয়েছে যে, নেপালে কোনো ভূমিকম্পই হয়নি। পাহাড়ের প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতা থেকে যখন একটি আস্ত হিমবাহ ধসে কোটি কোটি টন বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নিয়ে তীব্র বেগে নিচে আছড়ে পড়ে, তখন তীব্র ভূকম্পনের সৃষ্টি হয়। এই ধসের ফলে সৃষ্ট কম্পনটি পৃথিবীর সিসমিক স্টেশনগুলোতে ধরা পড়েছিল। 

প্রাথমিক সিসমিক সিগন্যাল দেখে এটিকে প্রথমে ৪.৪ মাত্রার (পরে যা ৫.২ বলে নির্ধারণ করা হয়) সাধারণ ভূমিকম্প বলে মনে করা হয়েছিল।ইউএসজিএস নিকটবর্তী সিসমিক স্টেশন এবং দীর্ঘমেয়াদি ভূকম্পন তরঙ্গ বিশদভাবে বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত করেছে যে, ভূগর্ভের প্লেট নড়াচড়ার কারণে কোনো প্রাকৃতিক ভূমিকম্প সেখানে হয়নি।

তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, সিসমিক এনার্জি বা কম্পনটি মূলত হিমবাহ ধসে পড়ার ধাক্কা এবং তার ফলে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষের তীব্র প্রবাহের কারণেই তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ, ধসের কারণে কম্পন হয়েছিল, কম্পনের কারণে ধস নয়।

এখন তাহলে প্রশ্ন হলো, তাহলে এত বড় হিমবাহটি ধসে পড়ল কেন? যদি ভূমিকম্পের কারণে হতো, তাহলে ব্যাখ্যাটা সহজ হতো। ভূমিকম্পই যদি না হবে, তাহলে এত বড় হিমবাহ কে ধাক্কা দিল? 

কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগেরির ভূ-প্রকৃতিবিদ ড্যানিয়েল শুগার এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে জলবায়ু পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত তাপমাত্রা। তীব্র গরমের কারণে হিমবাহ এবং বরফের উপরিভাগ গলে প্রচুর তরল পানি বরফের ফাটল দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। এই পানি হিমবাহের তলদেশে গিয়ে এক ধরনের পিচ্ছিল স্তর তৈরি করে, যার ফলে পাহাড়ের ঢাল থেকে পুরো হিমবাহটি তার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে।

এই ধসে পড়া ধ্বংসাবশেষই নদীর গতিপথ সাময়িকভাবে আটকে দেয় এবং পরে সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে এই বিধ্বংসী আকস্মিক বন্যা বা পাহাড়ি সুনামি ডেকে আনে।

LEAVE A REPLY