ছবি: রয়টার্স
হিমালয়ের দুর্গম পাহাড়ে বুধবার সকালটা ছিল অন্য দিনের মতোই। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যে বদলে গেল সবকিছু।পাহাড়ের ওপর থেকে বিশাল বরফ ও পাথরের অংশ ভেঙে নিচে নেমে এলো। সেই ধস আছড়ে পড়ল নদীতে। মুহূর্তের মধ্যে নদীর পানি, বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ মিলে তৈরি হলো ভয়ংকর স্রোত। পাহাড়ি নদী পেরিয়ে সেই স্রোত ছুটে গেল নেপাল-চীন সীমান্তের জনবসতির দিকে।
২৬ আগস্টের সেই ঘটনায় নেপাল ও তিব্বতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৭৫ জন। শত শত মানুষ এখনো নিখোঁজ। নেপালে অন্তত ১৫৭ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। তিব্বতে মারা গেছেন আরো তিনজন।নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা ৭০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। নেপালের নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রীও রয়েছেন। প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল, কোনো ভূমিকম্প থেকেই হয়তো এই বিপর্যয়ের শুরু। কিন্তু পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানায়, সেখানে ভূমিকম্প হয়নি। বরং হিমবাহের বরফ ও পাথরের বিশাল ধস থেকেই ভূকম্পন-সদৃশ কম্পন তৈরি হয়েছিল।ঘটনাটি পরে প্রায় ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূকম্পন হিসেবে রেকর্ড হয়।
স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় থাকা হিমবাহের নিচের একটি বড় অংশ ভেঙে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচের উপত্যকায় আছড়ে পড়ে। এরপর বরফ ও পাথরের সেই স্রোত লেন্দে খোলা নদীতে গিয়ে পড়ে। নদী সাময়িকভাবে আটকে যায়। পরে সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে বিপুল পরিমাণ পানি, কাদা, পাথর ও বরফ একসঙ্গে নিচের দিকে ছুটে যায়। এই ঘটনাটি আবার সামনে এনেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- হিমবাহ ধস আসলে কী? এটি কেন হয়? কীভাবে কয়েক টন বরফ একটি নদীকে কয়েক মিনিটের মধ্যে মৃত্যুফাঁদে পরিণত করতে পারে?
হিমবাহ ধস কী
সহজ করে বললে, পাহাড়ের ঢালে জমে থাকা বিশাল বরফের স্তর বা হিমবাহের কোনো অংশ হঠাৎ ভেঙে নিচে নেমে এলে তাকে হিমবাহ ধস বলা যায়। তবে বৈজ্ঞানিকভাবে ঘটনাটি এক ধরনের নয়। কোথাও বরফের বড় অংশ আলাদা হয়ে পড়ে। কোথাও বরফের সঙ্গে পাথর ও মাটি মিশে যায়। আবার কোথাও হিমবাহ গলে তৈরি হওয়া হ্রদের বাঁধ ভেঙে হঠাৎ বিপুল পানি বেরিয়ে আসে। এই ঘটনাগুলোর গতি ও ধ্বংসক্ষমতা একেক রকম। বরফের বড় অংশ পাহাড় থেকে ভেঙে দ্রুত নিচে নামলে তাকে ‘আইস অ্যাভালাঞ্চ’ বা বরফধস বলা হয়। বরফের সঙ্গে পাথর, মাটি ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ মিশে সেটি ‘রক-আইস অ্যাভালাঞ্চ’ বা বরফ-পাথরের ধসের রূপ নেয়। আবার হিমবাহ গলে তৈরি কোনো হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে পানি হঠাৎ বেরিয়ে গেলে তাকে বলা হয় ‘গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড’, সংক্ষেপে জিএলওএফ।
নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনা মূলত বরফ-পাথরের ধস, নদী আটকে যাওয়া এবং পরে আকস্মিক বন্যার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। আন্তর্জাতিক পর্বত গবেষণা সংস্থা আইসিআইএমওডির বিশেষজ্ঞরাও জানিয়েছেন, বরফ ও পাথরের ধস ‘লেন্দে খোলা’ নদীকে আটকে দেওয়ার পর হঠাৎ পানি নেমে আসে।
কীভাবে শুরু হয় একটি হিমবাহ ধস
একটি হিমবাহকে দূর থেকে স্থির মনে হলেও সেটি আসলে সব সময় পরিবর্তনশীল। বরফ ধীরে ধীরে সরে। কোথাও বরফ পাতলা হয়। কোথাও ফাটল তৈরি হয়। কোথাও বরফের নিচে পানি জমে থাকে। পাহাড়ের ঢাল, পাথরের গঠন, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, তুষারপাত এবং বরফের ভেতরের পানির পরিমাণ- সবকিছু মিলে হিমবাহের স্থিতিশীলতা নির্ধারণ করে।
হিমবাহ ধসের প্রথম ধাপ হতে পারে তাপমাত্রা বৃদ্ধি। তাপমাত্রা বাড়লে হিমবাহের ওপরের বরফ গলতে শুরু করে। গলিত পানি ফাটল দিয়ে নিচে ঢুকে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই পানি হিমবাহের ভেতরে বা নিচে জমে চাপ তৈরি করে। দ্বিতীয় ধাপ হলো ফাটল তৈরি ও বড় হওয়া। হিমবাহের বরফে থাকা ফাটল সময়ের সঙ্গে প্রশস্ত হতে পারে। এসব ফাটলে পানি ঢুকলে বরফের ভেতরের চাপ আরো বাড়ে। কোনো পর্যায়ে বরফের একটি অংশ তার নিজের ওজন ধরে রাখতে না পেরে আলাদা হয়ে যেতে পারে। তৃতীয় ধাপ হলো ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাওয়া। হিমবাহের নিচে বরফ, পাথর, মাটি ও পানি থাকে।
পানি সেখানে জমে গেলে বরফ ও পাহাড়ের পাথরের মধ্যকার ঘর্ষণ কমে যেতে পারে। ফলে বিশাল বরফের অংশ হঠাৎ পিছলে যেতে পারে। চতুর্থ ধাপ হলো ধসের সময় গতি বেড়ে যাওয়া। একবার বরফের বড় অংশ ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করলে তার সঙ্গে পাথর, মাটি, বরফের ছোট টুকরা ও পানি যুক্ত হয়। নিচে নামার সময় এই উপাদানগুলো একে অন্যের সঙ্গে মিশে বিশাল ধ্বংসস্তূপ তৈরি করে। ফলে শুরুতে বরফের একটি অংশের ধস শেষ পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ ভয়ংকর ধ্বংসপ্রবাহে পরিণত হতে পারে।
পানি কেন হিমবাহ ধসকে আরো ভয়ংকর করে?
হিমবাহ ধসের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকগুলোর একটি হলো পানি। বরফ গললে পানি তৈরি হয়। এই পানি হিমবাহের ফাটল দিয়ে নিচে ঢুকে জমতে পারে। আবার ধসের সময় বরফের সঙ্গে থাকা পানি বেরিয়ে আসতে পারে। বরফ ও পাথর নদীতে গিয়ে পড়লে নদীর পানি হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে। এর সঙ্গে যোগ হয় কাদা ও পাথর। ফলে নিচে নেমে আসা স্রোত আর সাধারণ পানির স্রোত থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে কাদা, পাথর, বরফ ও পানির ঘন মিশ্রণ। এ ধরনের স্রোত অনেক ভারী এবং ধ্বংসক্ষম। পথের ঘরবাড়ি, সেতু, রাস্তা, বিদ্যুৎকেন্দ্র এমনকি বড় বড় অবকাঠামোও এর সামনে টিকতে পারে না। নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনাতেও এমনটাই হয়েছে। বরফ-পাথরের ধস নদীকে সাময়িকভাবে আটকে দেয়। পরে সেই বাধা ভেঙে গেলে বিপুল পানি ও ধ্বংসাবশেষ দ্রুত নিচে নেমে আসে। নেপালের কয়েকটি এলাকায় নদীর পানি অল্প সময়ের মধ্যে কয়েক মিটার বেড়ে যায়।
সব হিমবাহ ধস কি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হয়?
এখানেই বিষয়টি সবচেয়ে জটিল। কোনো একটি নির্দিষ্ট হিমবাহ ধসকে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলা সব সময় বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়। ভূমিকম্প, পাহাড়ের ঢাল, পাথরের গঠন, অতিরিক্ত তুষার, বরফের ভেতরের পানি, হিমবাহের নিচের পরিস্থিতি- অনেক কারণ এখানে একসঙ্গে কাজ করতে পারে। তবে উষ্ণায়ন হিমবাহ ও পাহাড়ের স্থিতিশীলতা বদলে দিচ্ছে- এ বিষয়ে বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। হিমালয় পৃথিবীর দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা অঞ্চলগুলোর একটি। উষ্ণতা বাড়লে হিমবাহ গলে ছোট হয়। বরফের জায়গায় পানি তৈরি হয়। নতুন হ্রদ তৈরি হতে পারে। পাহাড়ের চিরস্থায়ী বরফ বা পারমাফ্রস্ট গললে পাথরের ঢালও দুর্বল হয়ে যেতে পারে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দশকে নেপালের পাহাড়ে বরফের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলোও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে শুধু হিমবাহ গলছে না, পাহাড়ি পরিবেশের ভারসাম্যও বদলে যাচ্ছে।
ইতালির মারমোলাদা: তীব্র গরমের পর বরফের দেয়াল ভেঙে পড়া
২০২২ সালের ৩ জুলাই ইতালির ডোলোমাইটস পর্বতমালার মারমোলাদা হিমবাহে ভয়াবহ বরফধস হয়। এতে অন্তত ১১ জন মারা যান এবং সাতজন আহত হন। প্রায় ৭০ হাজার ৪০০ ঘনমিটার বরফ, পানি ও সূক্ষ্ম ধ্বংসাবশেষ পাহাড় থেকে নেমে আসে। স্রোত প্রায় ২ দশমিক ৩ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। কোনো কোনো অংশে এর গতি ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত উঠেছিল। ঘটনার আগে ওই এলাকায় অস্বাভাবিক গরম পড়েছিল। গবেষণায় দেখা যায়, ২০২২ সালের মে ও জুন মাসে তাপমাত্রা দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি ছিল। বরফ গলে প্রায় ১৫ হাজার ঘনমিটার পানি তৈরি হয়েছিল।
এর বড় একটি অংশ হিমবাহের ফাটলের মধ্যে জমে ছিল। ধীরে ধীরে পানির চাপ বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত পানির চাপ হিমবাহের নিচের অংশকে অস্থিতিশীল করে তোলে। গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ফাটলে জমে থাকা পানির চাপ হিমবাহের নিচের ঘর্ষণ কমিয়ে দেয়। পানি এমন জায়গায় ঢুকে পড়ে, যেখানে স্বাভাবিকভাবে পানি বের হওয়ার ব্যবস্থা যথেষ্ট ছিল না। ফলে হিমবাহের একটি অংশ হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই ঘটনা দেখায়, তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব সব সময় সরাসরি ‘বরফ গলে বন্যা’ হিসেবে দেখা যায় না। কখনো অতিরিক্ত গলন হিমবাহের ভেতরে এমন পরিবর্তন তৈরি করতে পারে, যা পরে আকস্মিক ধসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সুইজারল্যান্ডের ব্লাটেন: পাহাড় ভেঙে গ্রাম ঢেকে যাওয়ার ঘটনা
২০২৫ সালে সুইজারল্যান্ডের আলপস পর্বতমালার ব্লাটেন গ্রামে ভয়াবহ ধস ঘটে। একটি বিশাল হিমবাহ ও পাহাড়ি ধ্বংসাবশেষ গ্রামের বড় অংশ ঢেকে দেয়। ঘটনার আগে অবশ্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বিপদের আশঙ্কায় প্রায় ৩০০ বাসিন্দাকে সরিয়ে নিয়েছিল। এখানে শুধু বরফ নয়, বরফের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাদা ও পাথর নেমে আসে। ধ্বংসাবশেষ প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং লোঞ্জা নদীর পথ আটকে দেয়। নদীর পানি আটকে গিয়ে সেখানে বড় একটি হ্রদ তৈরি হতে থাকে। পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিজ্ঞানীরা সেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বিশেষ করে আলপসের পারমাফ্রস্ট বা দীর্ঘদিন জমে থাকা মাটি ও বরফ গলে যাওয়ায় পাহাড়ের পাথুরে কাঠামো দুর্বল হতে পারে। সুইজারল্যান্ডের হিমবাহ পর্যবেক্ষণকারী বিজ্ঞানী ম্যাথিয়াস হুসও উষ্ণায়নের কারণে পাথরের ভেতরের স্থিতিশীলতা কমে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেন। পারমাফ্রস্ট হলো এমন এক ধরনের মাটি, শিলা বা পলি যা একটানা কমপক্ষে দুই বছর বা তার বেশি সময় ধরে শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস (০° সে বা ৩২° ফারেনহাইট) বা তার চেয়ে কম তাপমাত্রায় সম্পূর্ণরূপে জমে বা হিমায়িত অবস্থায় থাকে।
রাশিয়ার কোলকা: কয়েক মিনিটে ১২৫ মানুষের মৃত্যু
হিমবাহ ধসের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর একটি রাশিয়ার কোলকা হিমবাহের ধস। ২০০২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ককেশাস পর্বতমালায় মাউন্ট জিমারাই-খোখের ঢাল থেকে পাথর ও ঝুলন্ত হিমবাহের বিশাল অংশ নিচের কোলকা হিমবাহে আছড়ে পড়ে। এরপর কোলকা হিমবাহ ভেঙে বরফ, তুষার, পাথর ও কাদার বিশাল স্রোত জেনালডন নদীর উপত্যকায় নেমে আসে। স্রোতটি প্রায় ২৪ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। পথে জনবসতি গ্রাস করে। অন্তত ১২৫ জন বরফ ও ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়েন। পরে মাত্র ২০টি মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়। ঘটনাটির ভয়াবহতা বোঝা যায় এর গতিবেগ থেকে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, উপত্যকায় ১০ কোটি ৫০ লাখ থেকে ১২ কোটি ৫০ লাখ ঘনমিটার বরফ ও পাথর জমা হয়েছিল। আরো প্রায় ২ কোটি ঘনমিটার উপাদান বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিল।
সিসমিক রেকর্ড এবং একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঘড়ির তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা অনুমান করেছিলেন, ধসের প্রধান স্রোত ঘণ্টায় প্রায় ১৮০ কিলোমিটার গতিতে ছুটে যেতে পারে। কোলকা ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল- এর কারণ নিয়ে দীর্ঘদিন নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিজ্ঞানীরা ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির প্রভাব, পাথর ও বরফের ধস এবং পানির ভূমিকা নিয়ে গবেষণা করেন। আগের কয়েক মাসে দুটি ছোট ভূমিকম্পও হয়েছিল। পাহাড়ের কোথাও আগ্নেয়গিরির গ্যাস বের হওয়ার চিহ্নও পাওয়া যায়। তবে কোলকার আগের ইতিহাসও ভয়াবহ। ১৯০২ সালে একই হিমবাহে বড় ধসের ঘটনায় ৩২ জন মারা গিয়েছিলেন। ১৯৬৯ সালেও সেখানে হিমবাহ দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল।
ভারতের উত্তরাখণ্ড: হিমবাহ ধসের সঙ্গে পাহাড়ি বন্যার যোগ
২০২১ সালে ভারতের উত্তরাখণ্ডের চামোলি জেলায় হিমবাহের একটি অংশ ভেঙে পড়ার পর ভয়াবহ বন্যা হয়। এতে ২০০ জনের বেশি মানুষ মারা যান বা নিখোঁজ হন। দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ধ্বংস হয়ে যায়। সেই ঘটনায় বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, পাহাড়ের ওপর থেকে বিপুল পরিমাণ পাথর ও বরফ নিচে নেমে এসে পানি ও ধ্বংসাবশেষের একটি অত্যন্ত দ্রুত স্রোতে পরিণত হয়েছিল। গবেষণায় এটিকে প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ ঘনমিটার পাথর ও হিমবাহের বরফের ধস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যা পরে অত্যন্ত গতিশীল ধ্বংসপ্রবাহে পরিণত হয়েছিল। অর্থাৎ একটি হিমবাহ ধসের বিপদ শুধু পাহাড়ের নিচের কয়েক কিলোমিটারে সীমাবদ্ধ থাকে না। নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে সেটি অনেক দূরের জনবসতিতেও আঘাত করতে পারে।
কেন আগে থেকে বোঝা এত কঠিন?
এটাই হিমবাহ ধসের সবচেয়ে বড় সমস্যা। ভূমিকম্পের মতো সব হিমবাহ ধসের আগে পরিষ্কার সংকেত পাওয়া যায় না। কোথাও বড় ফাটল দেখা যায়। কোথাও হিমবাহের গতি বাড়ে। কোথাও পানি জমে। কিন্তু অনেক সময় এসব পরিবর্তন খুব ধীরে ঘটে এবং চোখে সহজে ধরা পড়ে না। মারমোলাদা নিয়ে গবেষণায় বলা হয়েছে, বরফ ধসের কয়েক দিন আগে সেখানে স্পষ্ট গর্জন, হঠাৎ গতি বৃদ্ধি বা নতুন বড় ফাটলের মতো সতর্ক সংকেত দেখা যায়নি। ঘটনাটির আগে হিমবাহটিতে পর্যাপ্ত যন্ত্রগত পর্যবেক্ষণও ছিল না। বিজ্ঞানীরা বলছেন, কিছু ক্ষেত্রে কয়েক দিন আগে সম্ভাব্য বিপদ শনাক্ত করা সম্ভব হলেও তার জন্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ দরকার। তাপমাত্রা, বরফের গতি, ফাটলের পরিবর্তন, পানির চাপ, ভূকম্পন- অনেক তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করতে হয়।
স্যাটেলাইট এখন গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র
কোলকা বিপর্যয়ের পর বিজ্ঞানীরা স্যাটেলাইটকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। কারণ দুর্গম পাহাড়ে সব সময় মানুষের পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়। কুয়াশা, তুষার, ধস ও অস্থিতিশীল পাহাড় সেখানে গবেষকদের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। কোলকা নিয়ে গবেষণায় নাসার টেরা স্যাটেলাইট, ল্যান্ডস্যাট, বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট এবং আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের ছবিও ব্যবহার করা হয়েছিল। এসব ছবির মাধ্যমে ধসের আগে ও পরে হিমবাহের অবস্থার তুলনা করা হয়। এমনকি ২০০২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর, ধসের মাত্র সাড়ে আট ঘণ্টা আগে তোলা ল্যান্ডস্যাটের ছবিও পরে বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। সেখানে দেখা যায়, ধসের আগের সপ্তাহগুলোতে হিমবাহের ওপর পাথর ও বরফ পড়ার পরিমাণ বাড়ছিল। বর্তমানে প্রযুক্তি আরো উন্নত। উচ্চ রেজল্যুশনের স্যাটেলাইট, ড্রোন, রাডার, জিপিএস, তাপমাত্রা সেন্সর এবং ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা ব্যবহার করে ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহের পরিবর্তন শনাক্ত করা সম্ভব।
নেপালের এবারের বিপর্যয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো- পাহাড়ের কোনো ঘটনাই বিচ্ছিন্ন না।
একটি হিমবাহের অংশ ভেঙে পড়ল। সেটি নদীতে আঘাত করল। নদী আটকে গেল। প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হলো। বাঁধ ভেঙে গেল। তারপর পানি, বরফ, পাথর ও কাদা একসঙ্গে নেমে গেল। কয়েকটি নদী ও উপত্যকা পেরিয়ে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ল বহু দূর পর্যন্ত। এই পুরো প্রক্রিয়াকে বলা যায় ‘ক্যাসকেডিং ডিজাস্টার’। সহজ ভাষায়, একটি বিপর্যয় থেকে একের পর এক নতুন বিপর্যয়ের সৃষ্টি। এ কারণেই শুধু হিমবাহ পর্যবেক্ষণ করলেই হবে না। নদী, হিমবাহের নিচের হ্রদ, পাহাড়ের ঢাল, সেতু, রাস্তা ও জনবসতিকেও একই ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। নেপালে এ ধরনের ঝুঁকি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটিতে দুই হাজারের বেশি হিমবাহ-হ্রদ রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ২১টি সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচিত।
ভবিষ্যতের পাহাড় কেমন হবে?
হিমবাহ পৃথিবীর প্রাচীন প্রাকৃতিক জলাধার। বছরের পর বছর তুষার জমে বরফে পরিণত হয়। সেই বরফ ধীরে ধীরে নিচের দিকে নামে। গরমকালে বরফ গলে নদীতে পানি যোগ করে। এভাবেই পাহাড়ি অঞ্চলের অনেক নদীর পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু উষ্ণ পৃথিবীতে এই ব্যবস্থা বদলে যাচ্ছে। হিমবাহ ছোট হচ্ছে। বরফ পাতলা হচ্ছে। নতুন হ্রদ তৈরি হচ্ছে। পাহাড়ের ঢালে বরফ ও পাথরের সম্পর্ক বদলাচ্ছে। কোথাও পারমাফ্রস্ট গলছে। কোথাও অতিরিক্ত পানি জমছে। এর মানে এই নয় যে আগামী দিনে প্রতিটি হিমবাহ ধসে যাবে। বরং ঝুঁকির ধরন আরো জটিল হচ্ছে। কোলকা আমাদের দেখিয়েছে, বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথর কয়েক মিনিটে কী করতে পারে। মারমোলাদা দেখিয়েছে, দীর্ঘদিনের উষ্ণতা কীভাবে হিমবাহের ভেতরে পানি জমিয়ে আকস্মিক ধসের পরিবেশ তৈরি করতে পারে। ব্লাটেন দেখিয়েছে, হিমবাহের সঙ্গে পাহাড়ের পাথর ও পারমাফ্রস্টের সম্পর্ক কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আর নেপালের এবারের ঘটনা দেখিয়ে দিল, একটি হিমবাহ ধস কীভাবে নদীকে সঙ্গে নিয়ে কয়েকটি জনপদে একসঙ্গে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
তাই হিমবাহ ধসকে শুধু ‘পাহাড় থেকে বরফ পড়ে যাওয়া’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি অনেক সময় একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার শেষ মুহূর্ত। তাপমাত্রা বাড়ছে। বরফ গলছে। পানি জমছে। ফাটল বাড়ছে। পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হচ্ছে। তারপর কোনো এক মুহূর্তে ভারসাম্য ভেঙে যাচ্ছে। আর সেই মুহূর্তে পাহাড়ের ওপরের কয়েক কোটি ঘনমিটার বরফ, পাথর ও পানি কয়েক মিনিটেই নেমে আসতে পারে নিচের পৃথিবীতে। নেপালের লেন্দে খোলা নদীর তীরে বুধবার যারা ছিলেন, তাদের কেউ হয়ত জানতেনই না যে কয়েক হাজার মিটার ওপরে কী ঘটছে। কিন্তু পাহাড়ের চূড়ায় শুরু হওয়া সেই ঘটনা তাদের কাছে পৌঁছাতে খুব বেশি সময় নেয়নি।
এই কারণেই হিমবাহ ধসের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র শুধু বাঁধ বা উদ্ধারকারী দল নয়। আগাম সতর্কতা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, স্যাটেলাইট নজরদারি এবং ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি জনবসতিকে সময়মতো সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা থাকা জরুরী। কারণ পাহাড়ের বরফ ধসে পড়ার মুহূর্তকে হয়তো থামানো যাবে না। কিন্তু সেই বরফের স্রোতে মানুষ যেন হারিয়ে না যায়, সেটি নিশ্চিত করা অনেকটাই সম্ভব।









































