কৃষকের সার নদীপথে পাচার হচ্ছে মিয়ানমারে

ভোলায় কৃষকের জন্য বরাদ্দ ইউরিয়া ও টিএসপি সার নানা কৌশলে নদীপথে পাচার করা হচ্ছে মিয়ানমারে। পাচারের সময় গত এক মাসে পাচারের সময় বেশ কয়েকটি বড় চালান আটক করেছে কোস্ট গার্ড ও পুলিশ সদস্যরা।সার ডিলারদের যোগসাজশে একটি চক্র এই পাচারে জড়িত বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। 

কৃষকদের অভিযোগ, কয়েকজন অসাধু ডিলার কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার বেশি লাভের আশায় কালোবাজারে বিক্রি করছেন। ডিলারদের কারণে পাচারকারীরা এ সুযোগ পাচ্ছে। ফলে দেশে সারের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হচ্ছে।

পুলিশ ও কোস্ট গার্ড সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের গত তিন মাসে কোস্ট গার্ড দক্ষিণ জোনের অভিযানে প্রায় ৫৫ মেট্রিক টন সারসহ সাতজনকে আটক করা হয়। এ ছাড়া চলতি বছরের মার্চ ও আগস্ট মাসে পুলিশের দুই অভিযানে প্রায় ৮৬ মেট্রিক টন সারসহ পাঁচজনকে আটক করা হয়।

সব মিলে চলতি বছরের আট মাসে কোস্ট গার্ড ও পুলিশের পৃথক অভিযানে প্রায় ১৪১ মেট্রিক টন সারসহ ১২ জনকে আটক করা হয়।

রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) সকালে কোস্ট গার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা লে. কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা বাজারসংলগ্ন মেঘনা নদীতে একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়।

অভিযানে ওই এলাকায় সন্দেহজনক একটি ট্রলারে তল্লাশি করে অবৈধভাবে মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে বহন করা প্রায় আট  মেট্রিক টন (১৬০ বস্তা) ইউরিয়া সারসহ পাচারকাজে ব্যবহৃত ট্রলারটি জব্দ করা হয়। এ সময় চোরাকারবারিরা কোস্ট গার্ডের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।

এর আগে গত ১২ আগস্ট চরফ্যাশন উপজেলায় গভীর রাতে মিয়ানমারে পাচারকালে ট্রাক ও মাছ ধরার ট্রলার থেকে ২৯৩ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করে পুলিশ। এ সময় পাচারের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে চারজনকে আটক করা হয়। 

আটকরা হলেন লক্ষ্মীপুরের রামগতির চর আফজাল এলাকার মোফাজ্জল হোসেনের ছেলে পারভেজ হোসেন; নোয়াখালীর হাতিয়া জাহাজমারা এলাকার হসিউল আলমের ছেলে সিরাজ, চর জব্বারের চর ক্লার্ক এলাকার অহিদ হাওলাদারের ছেলে সোহেল ও হাতিয়া উপজেলার পশ্চিম রসুলপুর এলাকার নবীর উদ্দিনের ছেলে শাহারাজ।পরে আটকদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে তাদের আদালতে পাঠানো হয়। 

পুলিশ জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটকরা মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে সার ট্রলারে ওঠানো হচ্ছিল বলে স্বীকার করেন।

এর আগে গত ৫ মার্চ ভোলা সদর উপজেলায় পাচারের সময় ইলিশা ফেরিঘাট থেকে চারটি ট্রাকে করে এক হাজার ৪২০ বস্তা (৭১ মেট্রিক টন) ইউরিয়া ও টিএসপি সার জব্দ করা হয়। ইলিশা ফেরিঘাট থেকে লক্ষ্মীপুরের মজুচৌধুরী ঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়ার সময় দুইটি ফেরি থেকে সারসহ ট্রাকগুলো জব্দ করে পুলিশ। 

তবে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনটি ট্রাকের চালক পালিয়ে গেলেও মো. আরমান (৩০) নামের এক চালককে আটক করা হয়। তার আগে ওই দিন বিকেলে ভোলার খেয়াঘাটে অবস্থিত বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) গুদাম থেকে ওইসব সার ট্রাকে তোলা হয়। 

এরও আগে মনপুরা ও হাতিয়া অঞ্চল থেকে একই রুটে পাচারকালে ৭৬০ ব্যাগ সার জব্দ করা হয়। গত মাসে চরফ্যাশন ও মনপুরা সীমানায় চর নিজামে তিন হাজার বস্তা সার পাচারে বাধা দেন জেলেরা।

ভোলার বিসিআইসির বাফার গুদামে দক্ষিণাঞ্চলের সার মজুদ রাখা হয়। ওই গুদাম থেকে ডিলাররা সার তোলেন। অভিযোগ রয়েছে, ডিলাররা সার তোলার সময় সরাসরি আসেন না। তাদের কথিত প্রতিনিধি ডিলারের পক্ষে সার তোলেন। ওই সার সরাসরি চলে যায় মিয়ানমারের উদ্দেশে। কোস্ট গার্ডের সদর দপ্তরের পাশেই রয়েছে ওই বাফার গুদাম।

স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নীতিমালা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট এলাকায় সরকার নিযুক্ত ডিলারের বিক্রয়কেন্দ্র থাকতে হবে। কিন্তু ভোলার অধিকাংশ এলাকার ডিলারদের গ্রামে কোনো বিক্রয়কেন্দ্র নেই। তারা শহরে নামমাত্র একটি দোকান রেখে সার বিক্রি করে থাকেন। ফলে কৃষকের সার সংগ্রহে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এ ছাড়া ডিলাররা সংশ্লিষ্ট এলাকায় সার বিক্রি না করে বেশি  দামে কালোবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন। আর সেখান থেকে সেসব সার চলে যাচ্ছে পাশের দেশ মিয়ানমারে।

গত এক বছর ধরে ভোলা থেকে সার পাচারের বিষয়টি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। আগে সড়কপথে পাচার করা হলেও সড়কপথ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় রুট পরিবর্তন করেছে পাচারকারীরা। তারা ভোলার বিভিন্ন ঘাট থেকে মাছ ধরার বড় নৌকা, বালু বহনকারী বাল্কহেডে করে সার পাচার করছে।

বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. সাহাবুদ্দিন ফরাজী বলেন, কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন সারের সংকট নেই, অথচ মাঠ পর্যায়ে কৃষকরা সার পাচ্ছেন না। এর মূল কারণ হলো সিন্ডিকেট ও পাচারকারী। দীর্ঘদিন ধরে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সার পাচার করছে একটি অসাধু চক্র, যার প্রমাণ হিসেবে আমরা বিভিন্ন সময় আটক হওয়ার ঘটনা থেকে দেখতে পাচ্ছি। 

প্রশাসন হয়তো মাঝেমধ্যে দু-একটি চালান আটক করতে সক্ষম হয়, কিন্তু বেশির ভাগই প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে পার পেয়ে যায়, যার ফল ভোগ করতে হয় কৃষকদের। কৃষকের সার কৃষকের হাতে পৌঁছাতে এবং সার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানান এ কৃষক নেতা।

কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লে. কমান্ডার সাব্বির আলম বলেন, নৌপথে চোরাচালান ও পাচার রোধে কোস্ট গার্ড সব সময় অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। পাচার রোধে ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

ভোলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. খাইরুল ইসলাম মল্লিক কালের কণ্ঠকে বলেন, বর্তমানে ভোলায় সারের কোনো সংকট নেই। সারপাচার রোধে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট ডিলারদের প্রতি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। 

উপপরিচালক বলেন, প্রতি মাসেই সার তোলা, বিক্রি এবং মজুদের বিষয়টি কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ভোলার কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার যাতে বাইরে পাচার হতে না পারে, সে ব্যাপারে কৃষি বিভাগ কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

LEAVE A REPLY