সংগৃহীত ছবি
যুক্তরাজ্যের গ্রেট ব্রিটেন দ্বীপ এবং দক্ষিণ দিকে ফ্রান্সের মূল ভূখণ্ডকে পৃথককারী সংকীর্ণ সাগর ‘ইংলিশ চ্যানেলে’ ছোট নৌকায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের পারাপারের সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ১৪ জনের বিচার শুরু হয়েছে। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে এই বিচার চলছে।২০২১ সালের নভেম্বরে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের মাঝামাঝি সমুদ্রে একটি ইঞ্জিনচালিত ছোট নৌকা ডুবে যায়। নৌকাটিতে থাকা অন্তত ৩০ জন নারী, পুরুষ ও শিশু মারা যায়।
এটিকে ইংলিশ চ্যানেল দিয়ে ছোট নৌকায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের পারাপারের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা হিসেবে ধরা হয়। মামলার ১৪ আসামির বেশির ভাগই আফগান নাগরিক।তাদের বিরুদ্ধে হত্যার দায় এবং সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সদস্য হিসেবে অবৈধভাবে অভিবাসীদের যুক্তরাজ্যে পাঠাতে সহায়তা করার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে বেশির ভাগ আসামিই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। আসামিদের মধ্যে দুজনকে ওই যাত্রার মূল সংগঠক বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তারা এখনো পলাতক।তাই তাদের অনুপস্থিতিতেই বিচার চলছে।
২০২১ সালের ২৩ নভেম্বর সন্ধ্যায় ফ্রান্সের উপকূল থেকে নৌকাটি যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। ইংলিশ চ্যানেলের মাঝামাঝি যাওয়ার পর নৌকাটিতে পানি ঢুকতে শুরু করে। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে নৌকাটি ভারমুক্ত করার চেষ্টা করা হয়। এ সময় যাত্রীরা একে একে পানিতে নেমে যান।কিন্তু সমুদ্রের পানি ছিল প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। এতে অনেকেই ঠাণ্ডায় মারা যান। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আসামিরা ‘নিম্নমানের একটি ছোট নৌকা’ সমুদ্রে নামাতে সহায়তা করেছিলেন। নৌকাটি সমুদ্রযাত্রার জন্য উপযুক্ত ছিল না। এ ছাড়া নৌকাটিতে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মানুষ ছিল। যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত ও মানসম্মত লাইফ জ্যাকেটও ছিল না।
নৌকাটি ডুবে যাওয়ার পর ২৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে আরও চারজন নিখোঁজ রয়েছেন বলে নিশ্চিত করা হয়। নিহতদের অনেকেই ছিলেন ইরাকি কুর্দি। তবে সোমালিয়া, ইথিওপিয়া, মিসর ও আফগানিস্তানের নাগরিকও ওই নৌকায় ছিলেন। নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী শিশুটির বয়স ছিল মাত্র সাত বছর। বিচার শুরু হওয়ার পর নিহতদের কয়েকজন স্বজন প্যারিসে গেছেন। তাদের অনেকেই আদালতে উপস্থিত থেকে বিচারপ্রক্রিয়া দেখছেন। এই বিচার প্রায় তিন সপ্তাহ চলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নিহতদের অনেক পরিবারের হয়ে আদালতে লড়ছেন আইনজীবী ইমানুয়েল দাউদ। বিচার শুরুর সময় তিনি মানবপাচারকারীদের কঠোর সমালোচনা করেন। দাউদ বলেন, মানবপাচারকারীরা চরম নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়েছে। অভিবাসীরা নাবিক নন এবং বিপজ্জনক ছোট নৌকায় সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার জন্য তাদের প্রয়োজনীয় দক্ষতাও নেই। তিনি বলেন, মানবপাচারকারীরা খুব ভালোভাবেই জানে তারা কী করছে। তারপরও তারা জেনেশুনে অভিবাসীদের এমন ঝুঁকির মধ্যে পাঠায়, যেখানে তাদের মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে।
ফরাসি কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, আসামিরা অভিবাসীদের থাকার জায়গা ও পরিবহনের ব্যবস্থা করেছিলেন। তারা যে নৌকায় অভিবাসীরা ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, সেটিও সরবরাহ করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া অভিবাসীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও তাদের কয়েকজন জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে। তবে আসামিদের অনেকেই নিজেদেরও অভিবাসী হিসেবে দাবি করেছেন। তাদের বক্তব্য, এই ঘটনায় তারা কোনোভাবে জড়িত থাকলেও মূল সংগঠকদের নির্দেশেই কাজ করেছেন। তারা নিজেরা এই যাত্রার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন না।
নৌকাটি ডুবে যাওয়ার পর ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য- দুই দেশেই তদন্ত শুরু হয়। দুর্ঘটনার আগে নৌকায় থাকা যাত্রীরা একাধিকবার সাহায্যের জন্য ফোন করেছিলেন বলে জানা যায়। এরপরও বিপদে পড়া মানুষদের উদ্ধারে ব্রিটিশ ও ফরাসি নৌযানগুলো সময়মতো কেন পৌঁছাতে পারেনি, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ফ্রান্সে এ ঘটনায় সাত সামরিক সদস্যের বিরুদ্ধেও বিচারিক তদন্ত চলছে। তাদের মধ্যে সামুদ্রিক উদ্ধারকেন্দ্রের কর্মী এবং একটি নৌবাহিনীর জাহাজে থাকা সদস্য রয়েছেন। বিপদে থাকা মানুষদের সহায়তা না করার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে কি না, তা নিয়ে তদন্ত চলছে। তাদের বিচার হওয়া উচিত কি না, সে সিদ্ধান্ত একজন বিচারক নেবেন।
যুক্তরাজ্যেও এ ঘটনা নিয়ে তদন্ত হয়েছে। ব্রিটিশ তদন্তে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে কর্মীর সংকট থাকায় ডোভারে দেশটির উপকূলরক্ষী বাহিনীর সক্ষমতা সীমিত ছিল। দুর্যোগের রাতে খারাপ আবহাওয়ার কারণে একটি নজরদারি বিমানও পাঠানো সম্ভব হয়নি। তদন্তে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। ছোট নৌকায় থাকা অভিবাসীরা বিপদের কথা জানালে তা অনেক সময় বাড়িয়ে বলেন- এমন একটি ধারণা উপকূলরক্ষী বাহিনীর মধ্যে প্রচলিত ছিল। এর ফলে নৌকায় থাকা মানুষের প্রকৃত বিপদের মাত্রা ঠিকভাবে বোঝা হয়নি বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।










































