ছবি : পিন্টারেস্ট
নানা পাটেকারের আকস্মিক মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে ভারতীয় চলচ্চিত্রজগতে। ৮ অক্টোবর ৭৫ বছর বয়সে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান বর্ষীয়ান এই অভিনেতা।গোয়ার বাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর চিকিৎসকদের একটি দল সেখানে পৌঁছায়। পরে তাকে দোনা পাউলার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলে ভোর ৫টা ২০ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
প্রায় পাঁচ দশকের অভিনয়জীবনে নানা পাটেকার নিজের স্বতন্ত্র অভিনয়শৈলী দিয়ে দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন। তবে পর্দার বাইরেও তার জীবন ছিল নানা সংগ্রাম, অভিজ্ঞতা ও বৈচিত্র্যে ভরা।শৈশবের আর্থিক সংকট থেকে শুরু করে থিয়েটার, সংসার, কৃষিকাজ, রান্না ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ততা—নানার ব্যক্তিজীবনের এমন অনেক অধ্যায় রয়েছে, যেগুলো হয়তো অনেকেরই অজানা।
.jpg)
১. আসল নাম বিশ্বনাথ পাটেকার
নানা পাটেকারের আসল নাম ছিল বিশ্বনাথ পাটেকর। ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের মুরুড-জঞ্জিরায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ছোটবেলায় পাওয়া ‘নানা’ ডাকনামটিই পরে তার পরিচয়ের সঙ্গে স্থায়ীভাবে জড়িয়ে যায়।
দুই ভাই অশোক ও দিলীপের সঙ্গে শৈশব কাটে তার। পরে পরিবারের সঙ্গে মুম্বাইয়ে চলে যান। শৈশবটা খুব একটা সহজ ছিল না। পরিবারের আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন নানা। পরবর্তী সময়ে ভারতের অন্যতম পরিচিত অভিনেতা হয়ে উঠলেও নিজের শৈশবের সেই সাধারণ জীবনের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল গভীর।

২. ১৩ বছর বয়সেই শুরু হয়েছিল কাজ
অভিনেতা হওয়ার অনেক আগে থেকেই জীবিকার জন্য কাজ করতে হয়েছিল নানাকে। প্রায় ১৩ বছর বয়সে স্কুলে পড়ার পাশাপাশি মুম্বাইয়ের চুনাভাট্টি এলাকায় সিনেমার পোস্টার আঁকার কাজ শুরু করেন তিনি।
সেই কাজ থেকে মাসে মাত্র ৩৫ রুপি আয় করতেন। কর্মস্থলে যেতে কয়েক কিলোমিটার হেঁটে যেতে হতো তাকে। পোস্টার আঁকার পাশাপাশি জেব্রা ক্রসিং আঁকার কাজও করেছেন তিনি।
পরে এক সাক্ষাৎকারে নানা জানিয়েছিলেন, সেই বয়সের ক্ষুধা, অভাব ও অপমান তাকে জীবন সম্পর্কে অনেক কিছু শিখিয়েছে। তার অভিনয় শেখার ক্ষেত্রেও বাস্তব জীবনের সেই অভিজ্ঞতার বড় ভূমিকা ছিল।

৩. তৃতীয় শ্রেণি থেকেই অভিনয়ের সঙ্গে পরিচয়
বলিউডে পা রাখার বহু আগেই অভিনয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল নানার। পুরোনো এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময়ই গ্রামের নাটকে অংশ নিতেন।
পরিবারে থিয়েটারের বিশেষ কোনো পরিবেশ ছিল না। শুরুতে এ পথে তাকে উৎসাহ দেওয়ার মতো কেউও ছিলেন না। কিন্তু নিজের আগ্রহে অভিনয় চালিয়ে যান নানা। পরবর্তী সময়ে মারাঠি থিয়েটারে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। সেই থিয়েটারই তার অভিনয়জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে ওঠে।

৪. স্ত্রী ছিলেন তার সংগ্রামের সময়ের সঙ্গী
১৯৭৮ সালে নীলকান্তি পাটেকারকে বিয়ে করেন নানা। নীলকান্তি তখন ব্যাংকে চাকরি করতেন এবং নানার তুলনায় আর্থিকভাবে কিছুটা স্বচ্ছল ছিলেন।
নানার অভিনয়জীবনের শুরুর দিকে থিয়েটার থেকে আয় ছিল খুবই কম। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, একটি নাটকের জন্য প্রায় ৫০ রুপি পেতেন তিনি। অন্যদিকে তার স্ত্রী মাসে প্রায় ২ হাজার ৫০০ রুপি আয় করতেন।
নানা নিজের পছন্দের কাজ চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। সেই সময় নীলকান্তি তাকে উৎসাহ দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, তিনি যে কাজ বিশ্বাস করেন সেটিই যেন করে যান, একসময় সেখান থেকেই টাকা আসবে।
পরবর্তী সময়ে দুজন আলাদা থাকলেও তাদের আইনগতভাবে বিবাহবিচ্ছেদ হয়নি।

৫. আড়াই বছর বয়সে মারা যায় বড় ছেলে
নানার ব্যক্তিজীবনের সবচেয়ে কষ্টের অধ্যায়গুলোর একটি ছিল বড় ছেলে দুর্বাসার মৃত্যু। প্রায় আড়াই বছর বয়সে মারা যায় তার ছেলে। জন্মের পর থেকেই দুর্বাসা অসুস্থ ছিল এবং তার বেশ কিছু শারীরিক জটিলতা ছিল বলে জানা যায়। এর মধ্যে একটি চোখের সমস্যাও ছিল। বহু বছর পর নিজের সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নানা স্বীকার করেছিলেন, সন্তানের অসুস্থতার সময় তিনি প্রথম দিকে সন্তানের কষ্টের চেয়ে মানুষ কী ভাববে, সেটি নিয়ে বেশি চিন্তা করতেন। এই উপলব্ধিও তার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
দুর্বাসার মৃত্যুর পর নানা ও নীলকান্তির আরেক ছেলে হয়। তার নাম মালহার পাটেকার।

৬. দিনে ৬০টি পর্যন্ত সিগারেট খেতেন
একসময় ধূমপানের প্রতি মারাত্মকভাবে আসক্ত ছিলেন নানা পাটেকার। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, দিনে ৬০টি পর্যন্ত সিগারেট খেতেন।
দিনের প্রায় সব সময়ই ধূমপান করতেন তিনি। এমনকি গোসলের সময়ও সিগারেট খাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন নানা। একপর্যায়ে তার গাড়িতে সিগারেটের গন্ধ এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছিল যে মানুষ সেখানে বসতেও চাইত না বলে তিনি জানিয়েছিলেন।
তবে ৫৬ বছর বয়সে হঠাৎ করেই ধূমপান ছেড়ে দেন নানা। ২০১২ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, এক সকালে ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধান্ত নেন—আর সিগারেট খাবেন না।

৭. অভিনয়ের পাশাপাশি রান্নাও ছিল তার পছন্দ
সিনেমার বাইরের জীবনে রান্না করা ছিল নানার অন্যতম পছন্দের কাজ। শুধু রান্না করাই নয়, অন্যদের খাওয়াতেও তিনি আনন্দ পেতেন।
২০১৫ সালে এক সাক্ষাৎকারে নানা জানিয়েছিলেন, শুটিংয়ের সময় কখনো কখনো পুরো চলচ্চিত্রের ইউনিটের জন্য রান্না করতেন তিনি। একটি ইউনিটে প্রায় ১১০ জন থাকলেও তাদের জন্য রান্না করার অভিজ্ঞতা ছিল তার।
রান্নার প্রতি নিজের ভালোবাসা নিয়ে নানা এমনও বলেছিলেন যে, অভিনেতার চেয়ে তিনি নিজেকে ভালো রাঁধুনি মনে করেন।

৮. কৃষিকাজের সঙ্গে ছিল গভীর সম্পর্ক
চলচ্চিত্রের ব্যস্ত জীবনের বাইরে কৃষিকাজের প্রতিও নানার ছিল গভীর আগ্রহ। মহারাষ্ট্রের সিংহগড় দুর্গের কাছে তার একটি খামার ছিল।
সেখানে ধান, বাদাম, রসুন ও পেঁয়াজ চাষ করতেন তিনি। কৃষিকাজের সঙ্গে তার এই সম্পর্ক শুধু ব্যক্তিগত আগ্রহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কৃষকদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়েও কাজ করেছেন তিনি।
খরাপ্রবণ মহারাষ্ট্রের কৃষকদের সহায়তায় তার প্রতিষ্ঠিত নাম ফাউন্ডেশন কাজ করেছে।

৯. সিনেমার চরিত্রের বাইরেও সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক
সেনা কর্মকর্তার চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে বাস্তব জীবনেও সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন নানা পাটেকার।
১৯৯১ সালের ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ সিনেমায় অভিনয়ের আগে টেরিটোরিয়াল আর্মিতে যোগ দিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ নেন তিনি। পরে টেরিটোরিয়াল আর্মিতে ক্যাপ্টেন হিসেবে কমিশন পান এবং মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের সময়ও তিনি সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজের সেবা দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

১০. ছেলেকে সরাসরি অভিনেতা বানাননি
নানার ছেলে মালহার পাটেকারেরও চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহ ছিল। তবে বাবার তারকা পরিচয় ব্যবহার করে তাকে সরাসরি অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পথে হাঁটেননি নানা।
জানা যায়, নানা নিজেই পরিচালনা করছিলেন ‘আব তাক ছাপ্পান’-এর একটি সিক্যুয়েল। সেখানে মালহারের অভিনয়ের সুযোগ তৈরি হলেও নানা সেই প্রস্তাবে সম্মতি দেননি।
পরে মালহার অভিনয়ের বদলে চলচ্চিত্র নির্মাণের দিকে এগিয়ে যান। তিনি পরিচালক রামগোপাল ভার্মার সঙ্গে সহকারী হিসেবেও কাজ করেন।
শৈশবের আর্থিক সংকট থেকে থিয়েটারে পথচলা, সংসার ও ব্যক্তিগত শোক, রান্না ও কৃষিকাজের প্রতি ভালোবাসা—নানা পাটেকারের জীবন তাই শুধু পর্দার সাফল্যের গল্প নয়। সংগ্রাম ও নিজের পছন্দের কাজের প্রতি নিষ্ঠার মধ্য দিয়েই তৈরি হয়েছিল তার আলাদা পরিচয়।









































