ছবি : রয়টার্স
দ্রুতগতির ট্রেন, আধুনিক শহর আর চোখধাঁধানো অবকাঠামো, গত কয়েক দশকে চীনের ব্যাপক পরিবর্তন দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন সাংবাদিক অ্যান্ড্রু হিগিন্স। কিন্তু দেশটিতে কয়েক মাস কাটানোর পর তার সেই মুগ্ধতা ধীরে ধীরে উদ্বেগে রূপ নেয়।
তার অভিজ্ঞতায়, অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি চীনে বেড়েছে নজরদারি ও মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ইংরেজি সংবাদপত্র ‘চায়না ডেইলি’র আয়োজনে উত্তরাঞ্চলীয় শানশি প্রদেশে মন্দির ও কারখানা পরিদর্শনে গিয়েছিলেন একদল বিদেশি ইনফ্লুয়েন্সার। সফরের শেষ দিকে তাদের একটি বড় ব্যানারের সামনে দাঁড়িয়ে ‘অসাধারণ চীন, অসাধারণ শানশি’ স্লোগান দিয়ে ভিডিও করতে বলা হয়।
এতে অস্বস্তি বোধ করেন হিগিন্স।তিনি ভিডিওতে অংশ নিতে অস্বীকার করেন। তবে সফরে দেখা মন্দিরগুলো এবং সেখানে যাওয়ার নতুন মহাসড়ক তার কাছে সত্যিই অসাধারণ মনে হয়েছিল।
কিন্তু চীনের প্রচারের অংশ হিসেবে বিদেশিদের দিয়ে দেশটির প্রশংসা করানোর বিষয়টি তাকে ভাবিয়ে তোলে। এরপর বেইজিংয়ে থাকা এক পুরোনো বন্ধুর কাছ থেকে বার্তা পান তিনি।৩০ বছরেরও বেশি সময় পর তাদের দেখা করার কথা ছিল। কিন্তু বন্ধুটি জানান, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা তার বাড়িতে গিয়ে সাক্ষাৎ বাতিল করতে বলেছেন। কীভাবে কর্মকর্তারা তাদের পরিকল্পনার কথা জানতে পেরেছেন, তা স্পষ্ট নয়। এই ঘটনা হিগিন্সের কাছে চীনের আরেকটি বাস্তবতা তুলে ধরে।
১৯৮০-৮১ সালে শিক্ষার্থী হিসেবে এবং পরে ১৯৮৭ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত সাংবাদিক হিসেবে চীনে থাকা হিগিন্স গত বছরের সেপ্টেম্বরে ছয় মাসের কাজ নিয়ে আবার দেশটিতে ফেরেন।দীর্ঘ বিরতির পর চীনের দ্রুত উন্নয়ন তাকে মুগ্ধ করলেও, নজরদারি ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তার সেই মুগ্ধতায় ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।
ওই বন্ধু জানান, নিরাপত্তার ভয়ে এখন ঝোপঝাড়কেও শত্রুর লুকিয়ে থাকার জায়গা বলে মনে হয়। তার মতে, উইচ্যাটের মতো অ্যাপ ও নজরদারি ক্যামেরার কারণে মানুষের ওপর নজর রাখা আগের চেয়ে সহজ হয়েছে।
সাংহাইয়ের একটি পার্কে বয়স্ক চীনাদের দেশাত্মবোধক গান গাইতে দেখেছিলেন হিগিন্স। তাদের আনন্দ দেখে পরিবেশটি স্বাভাবিক মনে হলেও, পার্কের একটি সরকারি সাইনবোর্ডে গুপ্তচর ও বিশ্বাসঘাতকদের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা দেওয়া ছিল। সেখানে সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের খবর জানানোর ফোন নম্বরও ছিল।
২০১২ সালে শি চিনপিং ক্ষমতায় আসার পর চীনে নিরাপত্তা নজরদারি ও তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ বেড়েছে বলে উল্লেখ করেন হিগিন্স। বিদেশি অনেক ওয়েবসাইটে প্রবেশও সীমিত করা হয়েছে। চীন সফরে যাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাদের অনেকেই রাজনীতি নিয়ে আলোচনা এড়িয়ে গেছেন। প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের নামও অনেকে সরাসরি উচ্চারণ করতে চাননি।
তবে কয়েকজনের মধ্যে চীনের নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন দেখা গেলেও, অর্থনীতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অনেকে। বিশেষ করে হাইনান দ্বীপে আবাসন ব্যবসার মন্দা অনেক ক্রেতাকে আর্থিক সংকটে ফেলেছে। শানডংয়ের এক অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি ঋণ করে হাইনানে একটি ফ্ল্যাট কিনেছিলেন। পরে ফ্ল্যাটটির দাম এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি কমে যায়। এতে তিনি ঋণের চাপে পড়েন এবং পারিবারিক জীবনেও সমস্যার মুখে পড়েন।
হিগিন্সের অভিজ্ঞতায়, চীনের বর্তমান বাস্তবতায় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত উন্নতির পাশাপাশি নজরদারি, রাজনৈতিক নীরবতা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। চীনে কঠোর নজরদারি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক অ্যান্ড্রু হিগিন্স।
তার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, দেশটিতে নজরদারির কারণে সাধারণ মানুষ ও বিদেশি সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও মত প্রকাশের ক্ষেত্রে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়। সাংহাইয়ের একটি জাদুঘরের বাইরে ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে এক চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যের বাগ্বিতণ্ডা হয়।
পুলিশের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি তাদের ‘পোশাক পরা গুণ্ডা’ বলে আখ্যা দেন। তার অভিযোগ, জনগণের সেবা করার কথা থাকলেও কর্তৃপক্ষ প্রায়ই তা ভুলে যায়। এ সময় তার মেয়ে আশপাশের নজরদারি ক্যামেরার কথা মনে করিয়ে দিয়ে তাকে চুপ করতে বলেন।
হিগিন্স জানান, সাংহাইয়ে নিজের বাসা থেকে মেট্রো স্টেশনে যাওয়ার পথে তিনি ৩০টিরও বেশি নজরদারি ক্যামেরা দেখেছেন। স্টেশনে যাত্রীদের ব্যাগ তল্লাশির পাশাপাশি নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন সরঞ্জামও রাখা ছিল। বিদেশি সাংবাদিকদের ওপর নজরদারি ও গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ চীনে দীর্ঘদিনের বিষয়।
হিগিন্সের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৮০-এর দশকেও বিদেশি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ আনা হতো।১৯৮৬ সালে মার্কিন সাংবাদিক জন বার্নসকে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে অভিযোগ প্রত্যাহার করা হলেও তাকে চীন থেকে বহিষ্কার করা হয়।
একইভাবে, ১৯৯১ সালে ইনার মঙ্গোলিয়ায় দমন-পীড়নসংক্রান্ত কমিউনিস্ট পার্টির গোপন নথি হাতে পাওয়ার পর হিগিন্সকেও চীন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল বলে তিনি জানান।
চীনে বিদেশি সাংবাদিকদের ওপর নজরদারি এখনো চলছে বলে অভিযোগও করেছেন সাংবাদিক অ্যান্ড্রু হিগিন্স। তার দাবি, আগে ক্যামেরা লাগানো ব্যাগ দিয়ে সাংবাদিকদের অনুসরণ করা হতো। এখন স্মার্টফোন, স্মার্ট চশমা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির মাধ্যমেও নজরদারি করা হচ্ছে।
হিগিন্স জানান, চীনের দাজাই ও হাইনান সফরের সময় তাকে ও তার সঙ্গীদের অনুসরণ করা হয়েছিল। হাইনানে এক ব্যক্তি তাদের সৈকত পর্যন্ত অনুসরণ করে মোবাইলের ক্যামেরা তাদের দিকে তাক করে রাখেন।
চীনে উইচ্যাটসহ বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহারকারীদের তথ্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারে বলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এ কারণে পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেও সতর্ক ছিলেন হিগিন্স। তবে এক পুরোনো বন্ধু নিজেই তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
সাংহাইয়ে দুপুরের খাবার খেতে গিয়ে তারা ১৯৮০-এর দশকের স্মৃতি ও পুরোনো বন্ধুদের নিয়ে কথা বলেন। তাদের বেশির ভাগই এখন চীনের বাইরে থাকেন। ওই বন্ধু ‘ব্লসমস সাংহাই’ নামের একটি টেলিভিশন সিরিজের প্রশংসা করেন। সিরিজটিতে ১৯৯০-এর দশকে চীনের দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নতি ও তুলনামূলক উন্মুক্ত পরিবেশের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তবে এবারের আলোচনায় তারা রাজনীতি এড়িয়ে যান।
ছাত্রজীবনে চীনে গিয়ে অর্থনৈতিক সংকটের চিত্র দেখেছিলেন সাংবাদিক অ্যান্ড্রু হিগিন্স। কয়েক দশক পর দেশটিতে ফিরে তিনি দেখেছেন ব্যাপক উন্নয়ন। তবে তার মতে, অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা কমেছে এবং নজরদারি বেড়েছে। প্রথমবার চীনের জিনান শহরে থাকার সময় চাল, কাপড় ও দেশলাইয়ের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসও সহজে পাওয়া যেত না। এসব কিনতে রেশন কুপন লাগত। শহরটি তখনো মাও সে তুংয়ের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ক্ষতি কাটিয়ে উঠছিল।
পরে চীনের নেতা দেং জিয়াওপিং অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে দেশকে সমৃদ্ধ করার উদ্যোগ নেন। তার আমলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ নিয়ে আলোচনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ ছিল। কিন্তু বর্তমান নেতা শি চিনপিংয়ের আমলে দলীয় নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে মনে করেন হিগিন্স।
এই লেখক জানান, তিনি যখন শানডং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন, তখন ক্যাম্পাসটি সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। এখন সেখানে নিরাপত্তারক্ষী ও নজরদারি ক্যামেরা রয়েছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও অংশ নিতে খ্রিস্টানদের নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র দেখাতে হয়। চীনের উন্নয়নের আরেকটি উদাহরণ জিনান শহরের রেল যোগাযোগ।
একসময় বেইজিং থেকে সেখানে যেতে সারা রাত লাগত। এখন দ্রুতগতির ট্রেনে দুই ঘণ্টারও কম সময়ে পৌঁছানো যায়। জিনানে এক পুরোনো সহপাঠীর সঙ্গে দেখা হলে তিনি অতীতের তুলনামূলক উন্মুক্ত পরিবেশের কথা স্মরণ করেন। তার মতে, চীনে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটলেও এখন অনেক বিষয়ে মানুষকে নীরব থাকতে হয়।
চীনের অতীত সম্পর্কে জানতে সাংবাদিক অ্যান্ড্রু হিগিন্সের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র ছিলেন সাবেক মার্কিন সেনা জেমস ভেনেরিস।
‘লাও ওয়েন’ নামে পরিচিত এই ব্যক্তি কোরীয় যুদ্ধের সময় চীনা সেনাদের হাতে বন্দি হওয়ার পর চীনেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরে জিনান শহরে বসবাস শুরু করেন। চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় মার্কিন গুপ্তচর হিসেবে অভিযুক্ত হয়ে চাকরি হারান ভেনেরিস। তাকে ঠেলাগাড়ি টানার কাজ করতে বাধ্য করা হয়। এ সময় তার দ্বিতীয় স্ত্রীও তাকে ছেড়ে চলে যান।
১৯৮০ সালে হিগিন্সের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তখন তিনি আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি পড়ানোর চাকরি পেয়েছিলেন এবং নতুন করে সংসার শুরু করেছিলেন। তবে রাজনৈতিক ঝামেলা এড়াতে নিজের বাসায় মাও সে তুং ও তৎকালীন নেতা হুয়া গুওফেংয়ের ছবি টাঙিয়ে রাখতেন।
একদিন হিগিন্স তাকে জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার হল থেকে হুয়া গুওফেংয়ের ছবি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে ভেনেরিস বলেন, ‘সবকিছু কী যে গোলমেলে!’ ২০০১ সালে জিনান শহরে তার মৃত্যু হয়। চীনের জিনান শহরে জেমস ভেনেরিসের সমাধি তৈরি করা হয় যুক্তরাষ্ট্রে থাকা তার ছেলের অর্থে।
সমাধিফলকে লেখা রয়েছে, তিনি মারা যাননি, ‘শুধু অদৃশ্য হয়ে গেছেন’। তাকে চীনের মানুষকে ভালোবাসতেন এমন একজন আমেরিকান হিসেবে স্মরণ করা হয়েছে। চীনের ইতিহাসের অন্যতম বেদনাদায়ক ঘটনা ১৯৮৯ সালের তিয়েনআনমেন স্কয়ারের বিক্ষোভ। ওই বছরের ৩ ও ৪ জুন রাতে সেনাবাহিনী গুলি চালিয়ে বিক্ষোভকারীদের দমন করে।
বর্তমানে তিয়েনআনমেন স্কয়ারে প্রবেশ করতে আগাম অনুমতি নিতে হয়। সাংবাদিক অ্যান্ড্রু হিগিন্স ও তার স্ত্রী সেখানে যেতে অনুমতি নেন। এরপর তিনটি নিরাপত্তা চৌকিতে তাদের প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। শেষ তল্লাশির সময় এক নিরাপত্তারক্ষী তার স্ত্রীর কলমে লাল কালি আছে বলে আপত্তি জানান। পরে এক কর্মকর্তা কাগজে লিখে পরীক্ষা করে দেখেন, কলমের কালি লাল নয়, বাদামি। এরপর তাদের স্কয়ারে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।











































