কাজের মধ্যে ডুবে থাকলে সময়ের হিসাব থাকে না কেন?

সংগৃহীত ছবি

কখনো কি এমন হয়েছে, কোনো কাজ করতে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করে দিয়েছেন, অথচ মনে হয়েছে মাত্র কয়েক মিনিট কেটেছে? পছন্দের বই পড়া, ছবি আঁকা, রান্না করা কিংবা কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ করার সময় অনেকেরই এমন অভিজ্ঞতা হয়। কাজের মধ্যে এতটাই ডুবে যাওয়া যে সময়ের হিসাব থাকে না—মনোবিজ্ঞানে এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে ‘ফ্লো স্টেট’ বা গভীর মনোযোগের অবস্থার সম্পর্ক রয়েছে।আর জীবনের এমন অর্থপূর্ণ মুহূর্তগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জাপানের ‘ইকিগাই’ দর্শন।

মনোবিষয়ক ওয়েবসাইট সাইকোলজি টুডেতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে জীবনের উদ্দেশ্য, কাজের প্রতি মনোযোগ এবং সুখের সঙ্গে এসব অভিজ্ঞতার সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।

কেন কাজের মধ্যে ডুবে গেলে সময়ের হিসাব থাকে না?

কোনো কাজে পুরোপুরি মনোযোগী হয়ে পড়লে আশপাশের নানা বিষয় সহজেই মন থেকে সরে যায়। কখনো কখনো সময়ের দিকেও আর খেয়াল থাকে না।মনোবিজ্ঞানে এ ধরনের অভিজ্ঞতাকে বলা হয় ‘ফ্লো স্টেট’।

এই অবস্থায় মানুষ কোনো কাজ, প্রকল্প কিংবা নিজের পছন্দের বিষয়ে এতটাই নিমগ্ন হয়ে পড়ে যে বাইরের বিভ্রান্তি তার মনোযোগ কেড়ে নিতে পারে না। খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে একে প্রায়ই ‘জোনে থাকা’ বলা হয়। তখন তারা প্রতিটি মুহূর্তে খেলার ওপর মনোযোগ ধরে রেখে নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেন।

তবে ফ্লো স্টেট কেবল খেলাধুলা বা কর্মক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। কেউ নতুন কিছু শিখতে গিয়ে, কেউ নিজের ব্যবসা গড়ে তুলতে গিয়ে, আবার কেউ প্রিয়জনের যত্ন নেওয়ার সময়ও এমন গভীর মনোযোগ অনুভব করতে পারেন।

এ ধরনের অভিজ্ঞতা সব সময় আনন্দদায়ক হতে হবে, এমন নয়। কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব কিংবা কঠিন সমস্যা সমাধানের কাজেও মানুষ গভীরভাবে নিমগ্ন হতে পারেন। কাজটি অর্থপূর্ণ মনে হলে তা তাঁর মনোযোগ ও প্রচেষ্টাকে আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।

জীবনে উদ্দেশ্য থাকা জরুরি কেন?

মানুষ শুধু দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর জন্যই কাজ করে না; অনেক কাজের মধ্যে সে নিজের জীবনের অর্থও খুঁজে পায়। চাকরি, পড়াশোনা, পরিবারের যত্ন নেওয়া কিংবা ঘরের কাজ—এসব দায়িত্ব প্রতিদিনের জীবনে একটি কাঠামো তৈরি করে।

সাইকোলজি টুডের নিবন্ধে বলা হয়েছে, জীবনের উদ্দেশ্য ও নিয়মিত কাজ মানুষকে কঠিন সময়েও এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করতে পারে। প্রতিদিনের ছোট ছোট দায়িত্ব পালন করার মধ্য দিয়েও মানুষ নিজের প্রয়োজনীয়তা ও জীবনের অর্থ অনুভব করতে পারে।

অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় ধরে কোনো অর্থপূর্ণ কাজ বা দায়িত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকলে কারও কারও মধ্যে উদ্বেগ, অতিরিক্ত চিন্তা কিংবা জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। অতীতের ভুল বা অনুশোচনা নিয়ে বারবার ভাবার প্রবণতাও বাড়তে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে অবসর সময় কাটানো খারাপ। বিশ্রাম, বিনোদন ও নিজের অনুভূতি নিয়ে ভাবারও প্রয়োজন রয়েছে। মূল বিষয় হলো, জীবনে এমন কিছু থাকা, যা মানুষকে আগ্রহ নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।

জাপানের ‘ইকিগাই’ দর্শন কী বলে?

জাপানি ধারণা ‘ইকিগাই’ বলতে সাধারণভাবে জীবনের অর্থ, বেঁচে থাকার প্রেরণা কিংবা প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার একটি কারণকে বোঝানো হয়। এটি শুধু বড় কোনো লক্ষ্য অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দৈনন্দিন জীবনের ছোট আনন্দ, অর্থপূর্ণ সম্পর্ক, পছন্দের কাজ এবং ব্যক্তিগত তৃপ্তিও ইকিগাইয়ের অংশ হতে পারে।

‘ইকিগাই: দ্য জাপানিজ সিক্রেট টু আ লং অ্যান্ড হ্যাপি লাইফ’ বইয়ের লেখক হেক্টর গার্সিয়া ও ফ্রান্সেস মিরালেসও এমন কাজের প্রতি বেশি সময় দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, যেগুলোতে মানুষ গভীর মনোযোগ ও নিমগ্নতা অনুভব করে।

তাৎক্ষণিক আনন্দ দেয় এমন কাজের বাইরে দীর্ঘমেয়াদি তৃপ্তি এনে দিতে পারে—এমন কাজ খুঁজে নেওয়াও এই দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। যেমন নতুন কোনো দক্ষতা শেখা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, সৃজনশীল কাজে যুক্ত থাকা কিংবা অন্যের উপকারে আসে এমন কিছু করা।

নিজের ‘ফ্লো’ খুঁজে পাবেন যেভাবে

প্রথমেই খেয়াল করুন, কোন কাজগুলো করতে গিয়ে আপনি সময়ের হিসাব ভুলে যান। সেটি হতে পারে বই পড়া, বাগান করা, রান্না, লেখালেখি, খেলাধুলা কিংবা নতুন কিছু শেখা।

এরপর প্রতিদিনের রুটিনে সেই কাজের জন্য কিছুটা সময় রাখুন। কাজটি করার সময় অপ্রয়োজনীয় ফোনের নোটিফিকেশন বা অন্য বিভ্রান্তি কমিয়ে রাখলে মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হতে পারে। পাশাপাশি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী এমন কাজ বেছে নিন, যা একদিকে আগ্রহ জাগায়, অন্যদিকে কিছুটা চ্যালেঞ্জও তৈরি করে।

তবে কোনো কাজে ডুবে থাকার অর্থ নিজের বিশ্রাম, ঘুম কিংবা ব্যক্তিগত দায়িত্ব অবহেলা করা নয়। কাজের সঙ্গে বিশ্রাম ও সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখাও জরুরি।

জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পেতে সব সময় বড় কোনো সাফল্যের প্রয়োজন হয় না। কখনো প্রিয় কাজের জন্য কিছুটা সময় বের করা, পরিবারের পাশে থাকা কিংবা প্রতিদিন নতুন কিছু শেখার মধ্যেও তৃপ্তি পাওয়া সম্ভব।

শেষ পর্যন্ত, সুখের অর্থ সবার কাছে এক নয়। নিজের কাছে কোন কাজ অর্থপূর্ণ, কোন মুহূর্তে মন সবচেয়ে বেশি সজীব থাকে এবং কোন দায়িত্ব পালন করে তৃপ্তি পাওয়া যায়—সেগুলো বুঝে নেওয়াই জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

LEAVE A REPLY