রোমান স্তারোভোইত। ছবিসূত্র : এএফপি
সপ্তাহের শুরুতেই রাশিয়ায় ঘটে গেল এক নাটকীয় ও চমকে দেওয়া ঘটনা। সোমবার সকালে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বরখাস্ত করেন রাশিয়ার পরিবহন মন্ত্রী রোমান স্তারোভোইতকে। আর সেই দিন বিকেলেই মস্কোর উপকণ্ঠের একটি পার্কে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করা হয় তার মৃতদেহ। পাশে পড়ে ছিল একটি পিস্তল।
রুশ তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে তারা ধারণা করছেন, রোমান স্তারোভোইত আত্মহত্যা করেছেন। রাশিয়ার জনপ্রিয় ট্যাবলয়েড মস্কভস্কি কোমসোমোলেতস এদিন লিখেছে, ‘রাষ্ট্রপতির বরখাস্তের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একজন ফেডারেল মন্ত্রীর আত্মহত্যা— রাশিয়ার ইতিহাসে এ এক অভূতপূর্ব ঘটনা।’
রাশিয়ায় কোনো সরকারি মন্ত্রীর আত্মহত্যার শেষ দৃষ্টান্ত পেতে গেলে ফিরে যেতে হবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের আগের সময়ে। ১৯৯১ সালের আগস্টে ব্যর্থ কমিউনিস্ট অভ্যুত্থানের পর সোভিয়েত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস পুগো আত্মহত্যা করেন।
এরপর এত উচ্চপদস্থ কোনো কর্মকর্তার আত্মহত্যার ঘটনা আর দেখা যায়নি।
ক্রেমলিন এখনো পর্যন্ত স্তারোভোইতের মৃত্যুর বিষয়ে খুব কমই বলেছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভকে এক কনফারেন্স কলে প্রশ্ন করা হয়, ‘রাষ্ট্রপতির বরখাস্তের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একজন ফেডারেল মন্ত্রীর মৃতদেহ উদ্ধারে আপনি কতটা স্তব্ধ?’
উত্তরে পেসকভ বলেন, ‘স্বাভাবিক মানুষ মাত্রই এ ঘটনায় স্তব্ধ হবে। আমরাও স্তব্ধ হয়েছি।
তদন্ত চলমান, তাই বিস্তারিত কিছু বলা সম্ভব নয়। অনুমান করা যায়, তবে তা মিডিয়া ও বিশ্লেষকদের কাজ, আমাদের নয়।’
রাজনৈতিক মহলে জোর গুঞ্জন
রাশিয়ার অনেক সংবাদমাধ্যম স্তারোভোইতের মৃত্যুকে সংযুক্ত করেছে ইউক্রেন সীমান্তবর্তী কুরস্ক অঞ্চলের কিছু বিতর্কিত ঘটনার সঙ্গে। ২০২৪ সালের মে মাসে পরিবহন মন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার আগে স্তারোভোইত পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে কুরস্ক অঞ্চলের গভর্নর ছিলেন। সেই সময় তিনি সরকারের বিপুল অর্থে ইউক্রেন সীমান্ত বরাবর প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন।
কিন্তু সেই নির্মাণ ইউক্রেনীয় বাহিনীর অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ব্যর্থ হয়। এর জেরে কুরস্কের কিছু অঞ্চল ইউক্রেন বাহিনীর দখলে চলে যায়।
পরে স্তারোভোইতের উত্তরসূরি গভর্নর আলেক্সেই স্মিরনভ ও তার সাবেক ডেপুটি আলেক্সেই দেদোভকে গ্রেপ্তার করা হয় কোটি কোটি রুবলের দুর্নীতির অভিযোগে। রুশ ব্যবসায়িক দৈনিক কোমারসান্ট আজ বলেছে, ‘স্তারোভোইত এই দুর্নীতি মামলার অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত হয়ে উঠতে পারতেন।’
যদিও রুশ কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কিছু জানায়নি, তবে ধারণা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে অভিযুক্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই হয়তো স্তারোভোইত আত্মহত্যা করেন। নিউ ইয়র্কের দ্য নিউ স্কুলের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অধ্যাপক নিনা ক্রুশচেভা বলেন, ‘রাশিয়ায় গত কয়েক বছরে স্টালিন-যুগের মতো রাজনৈতিক পুনর্নির্মাণ ঘটছে। সেখানে একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আত্মহত্যা করছেন, কারণ তিনি আর এই ব্যবস্থার মধ্য থেকে বের হতে পারছেন না। এটা অনেকটা ১৯৩৭ সালের মতো — যেমন স্টালিনের মন্ত্রী সের্গো অর্ডজনিকিদজে সেই সময় নিজেকে গুলি করেছিলেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘একজন মন্ত্রী যদি মনে করেন, তার সামনে বিকল্প শুধু দীর্ঘমেয়াদি কারাবাস আর পরিবারের ধ্বংস, তাহলে আত্মহত্যাই যেন একমাত্র রাস্তা। এতে বোঝা যায়, বর্তমান রাশিয়া কতটা দমনমূলক।’
রাষ্ট্রীয় টিভিতে নীরবতা
স্তারোভোইতের এই চাঞ্চল্যকর মৃত্যুর খবর সংবাদপত্রে শিরোনাম হলেও, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় টিভি এই বিষয়ে একপ্রকার নীরবই থেকেছে। রাশিয়া-১-এর সন্ধ্যার প্রধান খবরের বুলেটিনে চার মিনিটের একটি প্রতিবেদন প্রচারিত হয়েছিল নতুন ভারপ্রাপ্ত পরিবহন মন্ত্রী আন্দ্রে নিকিতিনের নিয়োগ নিয়ে। কিন্তু তাতে স্তারোভোইতের বরখাস্ত কিংবা তার মৃত্যুর বিষয়ে একটি শব্দও উচ্চারিত হয়নি।
খবরের বুলেটিনের শেষ দিকে ৪০ মিনিট পর সংবাদ উপস্থাপক মাত্র ১৮ সেকেন্ড সময়ে তার মৃত্যুর খবরটি উল্লেখ করেন। ফলে অনেক রুশ নাগরিকই হয়তো বুঝতেই পারেননি কতটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে গেছে।
রাজনৈতিক বার্তা : উর্ধ্বমুখী নয়, পতনের শেষ বিন্দু মৃত্যু
অধ্যাপক নিনা ক্রুশচেভা আরো বলেন, ‘আগে যেখানে কেউ আঞ্চলিক পর্যায় থেকে উঠে এসে ধনী ও প্রভাবশালী হতেন, এখন সেই পথে এগোলেই বিপদ। এখন ওপরের দিকে ওঠার সুযোগ নেই, নিচের দিকেও যাওয়া মানে মৃত্যুর দিকে যাত্রা।’ রোমান স্তারোভোইতের মৃত্যু মনে করিয়ে দেয়, রাশিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার চক্র থেকে ছিটকে পড়া কতটা মারাত্মক হতে পারে। এ যেন শুধুই একটি আত্মহত্যা নয়, বরং গোটা সিস্টেমের একটি সতর্ক সংকেত।
সূত্র : বিবিসি










































