২০২৫ সালে জেনেভায় নাভি পিল্লাই । ছবি: এএফপিআন্তর্জাতিক আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচারে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার মানবাধিকার আইনজীবী ও বিচারক নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত এই আইনজ্ঞ দীর্ঘ কর্মজীবনে বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকার সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নরওয়ের রাজধানী অসলোর নরওয়েজিয়ান নোবেল ইনস্টিটিউট থেকে তার নাম ঘোষণা করা হয়। স্থানীয় সময় সকাল ১১টায়, বাংলাদেশ সময় বিকেল তিন টায় এ ঘোষণা দেওয়া হয়।
নোবেল কমিটির ঘোষণায় আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোকে শক্তিশালী করা এবং গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় নাভি পিল্লাইয়ের সাহসী ও নিষ্ঠাপূর্ণ নেতৃত্বের কথা তুলে ধরা হয়। তার কর্মজীবন বিশ্বজুড়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও মানবিক মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
নাভি পিল্লাই দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে বর্ণবাদী শাসনামলে একটি ভারতীয় তামিল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও বর্ণবাদের পরিবেশে বেড়ে ওঠা পিল্লাই আইন পেশায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কর্মজীবনের শুরুর দিকে বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামীদের আইনি সহায়তা দেওয়ার মধ্য দিয়ে তার পথচলা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার ও মানবাধিকার সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
নাভি পিল্লাই দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি রুয়ান্ডার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটিআর) বিচারক এবং পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিচারক হিসেবেও কাজ করেছেন। এ ছাড়া তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন।
সম্প্রতি তিনি অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডসংক্রান্ত জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগসংক্রান্ত মামলার বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়িত্ব পালনকালে যৌন সহিংসতা ও গণহত্যার মতো অপরাধের বিচারিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে নাভি পিল্লাইয়ের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গণহত্যার উপাদান হিসেবে বিবেচনার ক্ষেত্রে ওই ট্রাইব্যুনালের বিচারিক সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আইনে গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করে।
এ ছাড়া বিদ্বেষমূলক প্রচার ও গণহত্যায় উসকানির দায়ে বিচারপ্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক অপরাধবিচারের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। গুরুতর অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার বিষয়টি নাভি পিল্লাইয়ের দীর্ঘ কর্মজীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
নোবেল কমিটির বক্তব্যে বলা হয়, আইনের শাসন ছাড়া বিশ্বব্যবস্থা অন্যায় ও অমানবিকতার ঝুকিতে পড়ে। সমাজে শান্তি ও বিশৃঙ্খলার মধ্যবর্তী সীমারেখা রক্ষায় বিচারকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সময়ে আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপের প্রেক্ষাপটে নাভি পিল্লাইয়ের মতো ব্যক্তিত্বের কাজ আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কমিটির মূল্যায়নে আরও বলা হয়, নাভি পিল্লাই বিভিন্ন রাষ্ট্র ও জাতীয় নেতাদের জবাবদিহির আওতায় আনার পক্ষে কাজ করেছেন এবং সংঘাতের শিকার মানুষের মধ্যে আশা জাগিয়েছেন। ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার প্রতি তার দীর্ঘদিনের অঙ্গীকার শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়তে আগ্রহী মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা।
সুইডিশ বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের (১৮৩৩-১৮৯৬) নামে নোবেল পুরস্কার প্রবর্তিত হয়। রসায়নবিদ, প্রকৌশলী ও শিল্পপতি নোবেল ডিনামাইট আবিষ্কারের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। নির্মাণ ও খননকাজে তাঁর আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও বিস্ফোরকটি যুদ্ধক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়েছে।
নিজের সম্পদ মানবকল্যাণে কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে আলফ্রেড নোবেল উইল করে যান। তার নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিবছর মানবজাতির কল্যাণে অসামান্য অবদান রাখা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। শান্তি পুরস্কার সেই স্বীকৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিষয়:










































