ছবি : রয়টার্স
দাবানলের ধোঁয়া নিয়ে বিরোধের মধ্যে সিঙ্গাপুরে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ কমিয়েছে ইন্দোনেশিয়া। শনিবার থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির তেল ও গ্যাস খাতের সরকারি তদারককারী সংস্থা এসকেকে মিগাস।
সংস্থাটির প্রধান জোকো সিসওয়ান্তো জানান, সিঙ্গাপুরে প্রতিদিন ৩ কোটি ১০ লাখ স্ট্যান্ডার্ড ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমানো হচ্ছে। এর মধ্যে রিয়াউ দ্বীপপুঞ্জের নাতুনা গ্যাসক্ষেত্র থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ এবং সুমাত্রা থেকে ১ কোটি ৬০ লাখ স্ট্যান্ডার্ড ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ করা হবে।
এএফপিকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জোকো সিসওয়ান্তো বলেন, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অভ্যন্তরীণ গ্যাস সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বজায় রাখতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জোকো সিসওয়ান্তো বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন পরিস্থিতির পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করতে থাকব।’
আপাতত ইন্দোনেশিয়ার গ্যাস সরবরাহ কমানোর প্রভাব শুধু সিঙ্গাপুরের ওপরই পড়েছে। সিঙ্গাপুরের এনার্জি মার্কেট অথরিটি জানিয়েছে, গ্যাস সরবরাহের এই ঘাটতি দেশটির দৈনিক মোট গ্যাস চাহিদার ২ শতাংশেরও কম। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের প্রয়োজনীয় পরিকল্পনাও রয়েছে।
এএফপিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে সিঙ্গাপুরের এনার্জি মার্কেট অথরিটি (ইএমএ) জানিয়েছে, গ্যাস সরবরাহে বিঘ্নের ঘটনায় আমদানিকারকেরা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি ও অন্যান্য পদক্ষেপ নেবেন বলে তারা আশা করছে।জাকার্তার পক্ষ থেকে এক সপ্তাহ ধরে দেওয়া সতর্কবার্তার পরই গ্যাস সরবরাহ কমানোর এই পদক্ষেপ নেওয়া হলো।
‘ইকো-বিজনেস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার পূর্ব কালিমন্তানের উপকূলে একটি গ্যাস স্থাপনা উদ্বোধনের সময় ইন্দোনেশিয়ার জ্বালানিমন্ত্রী বাহলিল লাহাদালিয়া বলেন, যেসব দেশ ইন্দোনেশিয়াকে যথাযথ সম্মান দেখায় না, সেসব দেশে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে তার সরকার।
তিনি বলেন, ‘আমি বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখব। যেসব দেশ ইন্দোনেশিয়ার প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করে, তাদের কাছে জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ করার কথা বিবেচনা করতেও আমি দ্বিধা করব না। লক্ষ্য স্পষ্ট, আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ সবার আগে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে ব্যবহার করা হবে।এটি টিকে থাকার লড়াই।’ তবে তিনি কোনো দেশের নাম উল্লেখ করেননি।
এর আগের দিন ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো পুলিশ, সরকারি কৌঁসুলি ও বন মন্ত্রণালয়কে দাবানলের জন্য দায়ী কম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত সমালোচকদেরও ভর্ৎসনা করেন তিনি।
জনাব প্রাবোও স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, ‘যেসব দেশ ইন্দোনেশীয় জাতিকে অপমান করতে পছন্দ করে, তাদের উদ্দেশে বলছি, উপযুক্ত সময়ে আমরা সংশ্লিষ্ট কম্পানিগুলোর নাম প্রকাশ করব।’
এদিকে সিঙ্গাপুর ধোঁয়া সংক্রান্ত আইন ‘হেজ ল’-এর আওতায় ইন্দোনেশিয়ার ১০টি কম্পানির বিরুদ্ধে আইনি নোটিশ জারি করেছে। সিঙ্গাপুরের সন্দেহ, এসব কম্পানি দাবানল সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে। আগুনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
এ ছাড়া সিঙ্গাপুর স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত সাতটি কৃষি কম্পানির কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে, দাবানলের সঙ্গে তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না। সিঙ্গাপুরের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৯৫ শতাংশ আসে গ্যাস থেকে। তারা মূলত পাইপলাইনের মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়া থেকে গ্যাস আমদানি করে, যার চুক্তিগুলোর মেয়াদ ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ পর্যন্ত রয়েছে।
২০২৪ সালে সিঙ্গাপুরের মোট গ্যাস আমদানির অর্ধেকেরও বেশি ছিল তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)। বর্তমানে এর জন্য দ্বিতীয় একটি টার্মিনাল নির্মাণের কাজ চলছে। ইউএস এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইন্দোনেশিয়া সিঙ্গাপুরে ১৪৫.৩ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করেছে।
বন উজাড় পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘নুসানতারা অ্যাটলাস’-এর তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে দাবানলে ১৯ লাখ হেক্টরেরও বেশি বনভূমি ও অন্যান্য এলাকা পুড়ে গেছে।
ইন্দোনেশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, আগস্টের মাঝামাঝি সময় থেকে দেশটির সাতটি প্রদেশে ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৪৭০ জনেরও বেশি মানুষ তীব্র শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছেন। দাবানলের ধোঁয়ায় সৃষ্ট ধোঁয়াশা ইন্দোনেশিয়ার সীমান্ত ছাড়িয়ে মালয়েশিয়া ও পূর্ব তিমুরেও ছড়িয়ে পড়েছে। এ সংকট নিয়ে আলোচনা করতে আঞ্চলিক জোট আসিয়ান একটি বৈঠক ডেকেছে।
মালয়েশিয়ার পরিবেশমন্ত্রী আর্থার জোসেফ কুরুপ বলেছেন, ধোঁয়া মোকাবিলায় ইন্দোনেশিয়ার কাছে কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করার অধিকার মালয়েশিয়ার রয়েছে। ম্যানিলায় অনুষ্ঠেয় আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর বৈঠকে তিনি বিষয়টি উত্থাপন করবেন বলেও জানিয়েছেন।
সীমানার দুই পাশেই এ নিয়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় সরকারের পদক্ষেপের প্রতিবাদে হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিক্ষোভ করেছেন। শুক্রবার সেন্ট্রাল কালিমন্তান প্রদেশের গভর্নরের কার্যালয়ের সামনে ৫০০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী জড়ো হন। তারা দাবানল পরিস্থিতিকে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ হিসেবে ঘোষণা করার দাবি জানান।
‘স্ট্রেইটস টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় অনেক ভোক্তা ইন্দোনেশীয় পণ্য বর্জন করতে শুরু করেছেন। ইন্দোনেশিয়া সরকারের যোগাযোগ বিভাগের প্রধান শাহগান্দা নাইংগোলানের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এই ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় যে অক্সিজেন পৌঁছায়, তার মূল উৎস ইন্দোনেশিয়ার বন।










































