সংগৃহীত ছবি
সকালে ঘুম থেকে উঠে এক কাপ গরম চায়ে চুমুক না দিলে অনেকেরই দিন শুরু হতে চায় না। আড্ডা, কাজের ফাঁকে বিরতি কিংবা বৃষ্টির দিনে জানালার পাশে বসে চা পান অভ্যাসটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ।তবে চা কতটা গরম, সেদিকে কি কখনো খেয়াল করেছেন? অতিরিক্ত গরম পানীয় পান করার সঙ্গে খাদ্যনালির ক্যান্সারের ঝুঁকিরও সম্পর্ক রয়েছে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অতিরিক্ত গরম চা শরীরের কী ক্ষতি করে?
চা, কফি কিংবা স্যুপ যে পানীয়ই হোক, অতিরিক্ত গরম অবস্থায় পান করলে তা মুখ ও গলার ভেতরের সংবেদনশীল আবরণে আঘাত করতে পারে। বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে খাদ্যনালির ভেতরের সুরক্ষামূলক আবরণ। খাদ্যনালি হলো মুখ থেকে পাকস্থলী পর্যন্ত বিস্তৃত একটি নল, যার মধ্য দিয়ে খাবার ও পানীয় পাকস্থলীতে পৌঁছায়।এর ভেতরের আবরণ শরীরের নরম টিস্যুকে সুরক্ষা দেয়। কিন্তু খুব গরম পানীয় পান করলে এই আবরণে তাপজনিত ক্ষতি হতে পারে।
হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে পরামর্শক ক্লিনিক্যাল অনকোলজিস্ট চিকিৎসক সপ্তর্ষি ঘোষ জানিয়েছেন, অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রার পানীয় বারবার পান করলে খাদ্যনালিতে পুনঃপুন তাপজনিত আঘাত লাগতে পারে। বিষয়টি শুধু চায়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়।গরম কফি, স্যুপ কিংবা অন্য যেকোনো পানীয়ও অতিরিক্ত গরম অবস্থায় পান করলে একই ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।
যেভাবে বাড়তে পারে ক্যান্সারের ঝুঁকি
খাদ্যনালির ভেতরের আবরণে বারবার আঘাত লাগলে শরীর স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত কোষ মেরামত করার চেষ্টা করে। এ সময় নতুন কোষ তৈরি হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের ক্ষতি ও কোষ পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া চলতে থাকলে কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রমে পরিবর্তন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
চিকিৎসক সপ্তর্ষি ঘোষের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বারবার আঘাত এবং পরবর্তী কোষ পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদে এমন কিছু জৈবিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, যা ক্যান্সার তৈরির প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে এক কাপ গরম চা পান করলেই ক্যান্সার হবে। উদ্বেগের বিষয় হলো, নিয়মিত অত্যন্ত গরম পানীয় পান করার দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাস। খাদ্যনালির ক্যান্সারের পেছনে আরো বেশ কিছু পরিচিত ঝুঁকির কারণ রয়েছে। এর মধ্যে তামাক ব্যবহার ও অ্যালকোহল গ্রহণ উল্লেখযোগ্য। তাই ক্যান্সারের ঝুঁকি বিবেচনায় শুধু চা পানের অভ্যাস নয়, সামগ্রিক জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ।
কতটা গরম চা পান করা ঝুঁকিপূর্ণ
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, ৬০ থেকে ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার পানীয় এড়িয়ে চলা ভালো। অর্থাৎ, চা তৈরি করার পরপরই পান না করে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা উচিত, যাতে তা আরামদায়ক তাপমাত্রায় নেমে আসে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সারও (আইএআরসি) ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় পান করা পানীয়কে খাদ্যনালির ক্যান্সারের সম্ভাব্য ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করেছে।
সহজভাবে বললে, চা এতটাই গরম হওয়া উচিত নয় যে তা পান করার সময় মুখ বা গলায় জ্বালাপোড়া কিংবা পোড়ার অনুভূতি হয়। চায়ের ওপর থেকে ধোঁয়া উঠছে কি না, সেটিই তাপমাত্রা বোঝার নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি নয়। তবে পান করার আগে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা একটি ভালো অভ্যাস।
চা পান করার অভ্যাসে আনুন ছোট পরিবর্তন
প্রতিদিনের চা পানের অভ্যাস পুরোপুরি বদলে ফেলার প্রয়োজন নেই। বরং কয়েকটি সহজ বিষয় মেনে চললেই অতিরিক্ত গরম পানীয়ের সংস্পর্শ কমানো সম্ভব। চা তৈরি করেই পান করবেন না, কাপের মধ্যে ঢেলে কয়েক মিনিট অপেক্ষা করুন, যাতে তাপমাত্রা কমে আসে।
- ছোট চুমুক দেয়ার আগে তাপমাত্রা বুঝুন : প্রথম চুমুক দেওয়ার সময় চা মুখ বা গলায় জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করছে কি না, খেয়াল করুন। খুব গরম মনে হলে আরও অপেক্ষা করুন।
- কফি ও স্যুপের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকুন : শুধু চা নয়, যেকোনো গরম পানীয় বা তরল খাবার আরামদায়ক তাপমাত্রায় এনে পান করুন।
- দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিগুলোও গুরুত্ব দিন : তামাক পরিহার করা এবং অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা খাদ্যনালির ক্যান্সারের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে মনে রাখা দরকার, চা নিজেই সমস্যা নয়; বরং অতিরিক্ত গরম অবস্থায় নিয়মিত পান করার অভ্যাসই উদ্বেগের বিষয়। তাই পরেরবার ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ হাতে নিলে তাড়াহুড়া করে চুমুক দেবেন না। কয়েক মিনিট অপেক্ষা করুন, চা কিছুটা ঠান্ডা হতে দিন। ছোট্ট এই অভ্যাসটি আপনার খাদ্যনালিকে অপ্রয়োজনীয় তাপজনিত আঘাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করতে পারে।









































