আমাদের পরিপাকতন্ত্রে বাস করে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ব্যাকটেরিয়া ও অণুজীব। এর মধ্যে কিছু উপকারী হলেও কিছু ক্ষতিকর।শরীরে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার চেয়ে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বেড়ে গেলে দেখা দিতে পারে নানা জটিলতা। অন্ত্রের এই ভারসাম্যহীনতা কেবল পরিপাকতন্ত্রই নয়, প্রভাব ফেলতে পারে পুরো শরীরের দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যের ওপর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্ত্রে কোনো গণ্ডগোল দেখা দিলে শরীর বিভিন্ন উপসর্গের মাধ্যমে তার সংকেত দেয়। চলুন, জেনে নেওয়া যাক অন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার প্রধান কিছু লক্ষণ সম্পর্কে।
হজমের সমস্যা
পেটের সমস্যার লক্ষণগুলো সাধারণত পাকস্থলী ও অন্ত্রে অনুভূত হয়। এর মধ্যে রয়েছে পেট ব্যথা, গ্যাস, পেট ফাঁপা, ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য ও বুকজ্বালা। মাঝেমধ্যে এমন অস্বস্তি হওয়া স্বাভাবিক হলেও তা যদি সপ্তাহ ধরে চলতে থাকে, তবে তা ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম বা ইনফ্ল্যামেটরি বাওয়েল ডিজিজ এর মতো রোগের লক্ষণ হতে পারে।
চলমান ক্লান্তি ও অবসাদ
পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া বা শক্তি কমে যাওয়ার পেছনে অন্ত্রের সংযোগ থাকতে পারে।কারণ, মেজাজ ও ঘুম নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন সেরোটোনিনের প্রায় ৯৫ শতাংশই উৎপন্ন হয় অন্ত্রে। এ ছাড়া অন্ত্রের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের কারণে শরীর আয়রন ও ভিটামিন বি১২-এর মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সঠিকভাবে শোষণ করতে পারে না, যা পরবর্তীতে ক্লান্তি বা অবসাদের সৃষ্টি করে।
ত্বকের নানা সমস্যা
একজিমা, সোরিয়াসিস ও রোসেসিয়ার মতো রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট চর্মরোগগুলোর সাথে অন্ত্রের গভীর যোগসূত্র রয়েছে। ‘গাট-স্কিন অ্যাক্সিস’ বা অন্ত্র-ত্বক অক্ষের মাধ্যমে অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের পরিবর্তন ত্বকের প্রদাহকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে।
ঘন ঘন অসুস্থতা
রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা মূলত অন্ত্রের সাথেই ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে।অন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হলে সর্দি, ফ্লু বা বিভিন্ন সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এমনকি দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে অটোইমিউন রোগ হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
খাদ্য সংবেদনশীলতা
আগে যেসব খাবার কোনো সমস্যা ছাড়াই খাওয়া যেত, তা খাওয়ার পর শরীর খারাপ লাগলে বুঝতে হবে অন্ত্রে ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য বদলে গেছে। নির্দিষ্ট কিছু খাবার ভাঙতে বা হজম করতে শরীর যখন করা শরীরের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে, যা খাদ্য সংবেদনশীলতার সৃষ্টি করে।
মেজাজ ও চিন্তাভাবনার পরিবর্তন
মস্তিষ্ক এবং অন্ত্র ‘গাট-ব্রেইন অ্যাক্সিস’ নামক ব্যবস্থার মাধ্যমে একে অপরের সাথে যুক্ত। অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার পরিবর্তন মেজাজ, স্মৃতিশক্তি এবং মানসিক চাপের মাত্রাকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে। গবেষকদের মতে, অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম বিষণ্ণতা, উদ্বেগ ও জ্ঞানীয় সমস্যার সাথেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখার উপায়
অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়াগুলোর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে জীবনযাত্রায় কিছু সহজ পরিবর্তন আনা যেতে পারে:
খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার রাখা।
অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলা।
পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা।
নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করা।
আপনার যদি ওপরে উল্লেখিত লক্ষণগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয় কিংবা খাওয়ার পর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে, তবে দেরি না করে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সময়মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে আইবিএস, পুষ্টির অভাব বা খাদ্য অসহিষ্ণুতার মতো সমস্যাগুলো শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় জীবনযাত্রার পরিবর্তন আনলেই ফেরা সম্ভব সুস্থ ও প্রাণবন্ত জীবনে।










































