সংগৃহীত ছবি
বন্ধু, সহকর্মী কিংবা পরিবারের কারও ওজন কমেছে। তাকে দেখে সবাই প্রশংসা করছেন।কিন্তু এমন দৃশ্য দেখার পর নিজের শরীর নিয়েই হঠাৎ অসন্তুষ্টি তৈরি হচ্ছে অনেকের। আয়নায় নিজেকে বারবার দেখা, নিজের ওজন নিয়ে দুশ্চিন্তা কিংবা সেদিন কী খেয়েছেন, তা নিয়ে নতুন করে হিসাব শুরু করা—এমন অভিজ্ঞতা অস্বাভাবিক নয়।
অথচ আগের দিনও নিজের শরীর নিয়ে হয়তো তেমন কোনো অস্বস্তি ছিল না। তাহলে অন্য কারও ওজন কমার খবর শুনে নিজের শরীর নিয়ে নেতিবাচক চিন্তা তৈরি হয় কেন?
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক তুলনা, সৌন্দর্য নিয়ে প্রচলিত ধারণা, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি এবং অতীতের ডায়েট করার অভিজ্ঞতা।অন্যের ওজন কমানো অনেক সময় নিজের শরীর সম্পর্কে পুরোনো দুশ্চিন্তা ও অনিরাপত্তাকে আবার সামনে নিয়ে আসে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী সাইকোলজি টুডে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছে।
অন্যের ওজন কমানো মানেই কি সুস্থ হয়ে ওঠা?
সমাজে ওজন কমানোকে প্রায়ই সাফল্য হিসেবে দেখা হয়। কেউ আগের চেয়ে চিকন হলে তাকে অভিনন্দন জানানো কিংবা তাঁর চেহারার প্রশংসা করার প্রবণতা রয়েছে।কিন্তু ওজন কমার পেছনে সব সময় সুস্থতার বিষয়টি কাজ করে না।
অসুস্থতা, বিষণ্নতা, মানসিক চাপ, পর্যাপ্ত খাবার না খাওয়া কিংবা খাদ্যাভ্যাসজনিত সমস্যার কারণেও কারও ওজন কমতে পারে। আবার কেউ নিজের ইচ্ছায় ওজন কমালেও তাঁকে অতিরিক্ত প্রশংসা করা থেকে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে চিকন শরীরই বেশি সুন্দর বা গ্রহণযোগ্য।
এ ধরনের প্রশংসার আরেকটি নেতিবাচক দিক রয়েছে। কেউ পরে আবার ওজন বাড়ালে তার মনে হতে পারে, আগের মতো তাঁকে আর আকর্ষণীয় মনে করা হচ্ছে না।এমনকি কেউ সরাসরি নেতিবাচক মন্তব্য না করলেও নিজের মধ্যে লজ্জা বা অপরাধবোধ তৈরি হতে পারে।
অন্যের ওজন কমলে পুরোনো স্মৃতি ফিরে আসে
অন্যের ওজন কমতে দেখলে বিষয়টি শুধু ঈর্ষা বা হিংসার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ডায়েট করেছেন কিংবা খাদ্যাভ্যাসজনিত সমস্যার মধ্য দিয়ে গেছেন, তাঁদের মধ্যে পুরোনো অভিজ্ঞতা ফিরে আসতে পারে।
অনেকেই শরীরের গঠন নিয়ে অস্বস্তির কারণে বন্ধুদের সঙ্গে সাঁতার কাটতে যান না, পছন্দের পোশাক কেনেন না কিংবা অনুষ্ঠানে অংশ নিতে চান না। তারা ভাবেন, ওজন কমলেই এসব কাজে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন।
কিন্তু পরে বুঝতে পারেন, শরীর পরিবর্তনের অপেক্ষায় থাকতে গিয়ে জীবনের অনেক আনন্দের মুহূর্ত হারিয়ে ফেলেছেন।
খাদ্যাভ্যাসজনিত সমস্যা থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার চেষ্টায় থাকা ব্যক্তিদের জন্য বিষয়টি আরও কঠিন হতে পারে। কারণ, একসময় ওজন কমলে তাঁরা প্রশংসা ও স্বীকৃতি পেয়েছেন। অথচ সেই ওজন ধরে রাখতে গিয়ে হয়তো ক্ষতিকর খাদ্যাভ্যাস তৈরি হয়েছিল। অন্য কারও ওজন কমানোর প্রশংসা শুনলে পুরোনো সেই অনুভূতিগুলো আবার ফিরে আসতে পারে।
ওজন কমানোর ওষুধের আলোচনাও বাড়াচ্ছে চাপ
বর্তমানে ওজন কমানোর জন্য জিএলপি-১, শ্রেণির ওষুধের ব্যবহার ও আলোচনা বেড়েছে। এসব ওষুধ নিয়ে মানুষের মধ্যে কথাবার্তা, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং কতটা ওজন কমেছে, তা নিয়ে তুলনা করার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।
প্রতিবেদনটির লেখকের মতে, খাদ্যাভ্যাস ও শরীর নিয়ে দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন এমন ব্যক্তিদের জন্য বিষয়টি বেশ কঠিন। কারণ, আশপাশের মানুষের ওজন কমানোর আলোচনা তাঁদের আবারও শরীরের আকার ও খাবার নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তায় ফেলতে পারে।
এমনকি কেউ দীর্ঘদিন চেষ্টা করে নিজের শরীরকে গ্রহণ করতে শিখলেও ওজন কমানোর ওষুধের সাফল্যের গল্প শুনে আবারও নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন।
বারবার ডায়েট করেও কেন হতাশা বাড়ে?
অনেকে ডায়েট করে ওজন কমান, কিন্তু কিছুদিন পর আবার ওজন বেড়ে যায়। তখন তাঁরা নিজের ইচ্ছাশক্তি বা নিয়ন্ত্রণক্ষমতাকে দায়ী করেন। ভাবেন, যথেষ্ট চেষ্টা করতে পারেননি বলেই আগের ওজন ফিরে এসেছে।
কিন্তু ওজন কমার পর শরীরের ক্ষুধা বেড়ে যেতে পারে এবং শক্তি খরচের পরিমাণ কমে আসতে পারে। ফলে আগের ওজন ফিরে আসার প্রবণতা তৈরি হয়।
বারবার ওজন কমানো ও বাড়ার এই অভিজ্ঞতা মানুষের আত্মবিশ্বাসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। খাবার খাওয়ার পর অপরাধবোধ, সারাক্ষণ খাবার নিয়ে চিন্তা কিংবা প্রতিদিন ওজন মাপার অভ্যাসও মানসিক চাপ বাড়াতে পারে।
অন্যের ওজন কমানো দেখে নিজের মন খারাপ হলে কী করবেন?
অন্যের ওজন কমতে দেখে নিজের শরীর নিয়ে অস্বস্তি তৈরি হলে প্রথমেই নিজের অনুভূতিকে বোঝার চেষ্টা করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় কাজে আসতে পারে।
১. নিজের শরীরের সঙ্গে অন্যের তুলনা বন্ধ করুন: প্রত্যেকের শরীরের গঠন, ওজন ও শারীরিক চাহিদা আলাদা। অন্যের পরিবর্তনকে নিজের শরীরের মানদণ্ড বানাবেন না।
২. পুরোনো অভিজ্ঞতা মনে করুন: আগে ডায়েট করে কী ধরনের শারীরিক ও মানসিক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন, তা মনে করুন। শুধু অন্যের ওজন কমেছে বলে আবার সেই অভ্যাসে ফিরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
৩. ওজন নিয়ে আলোচনা সীমিত করুন: কারও ওজন কমানো বা বাড়ানো নিয়ে অতিরিক্ত আলোচনা অস্বস্তি তৈরি করলে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করতে পারেন। প্রয়োজনে পরিচিতদের জানাতে পারেন যে আপনি নিজের শরীর নিয়ে এমন আলোচনা এড়িয়ে চলতে চান।
৪. নিজের আচরণ খেয়াল করুন: অন্যের ওজন কমার খবর শোনার পর বারবার আয়নায় নিজেকে দেখা, খাবার কমিয়ে দেওয়া কিংবা নতুন করে ডায়েট শুরু করার তাগিদ তৈরি হচ্ছে কি না, খেয়াল করুন।
৫. প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন: শরীর নিয়ে নেতিবাচক চিন্তা যদি দৈনন্দিন জীবন, খাবার গ্রহণ কিংবা মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
অন্যের শরীর বদলালেও নিজের শরীর বদলাতে হবে না
অন্য কেউ ওজন কমানোর সিদ্ধান্ত নিতেই পারেন। কিন্তু তাঁর সেই সিদ্ধান্তের কারণে নিজের শরীর নিয়ে অসন্তুষ্ট হওয়ার প্রয়োজন নেই। চিকন শরীর মানেই সুন্দর বা সুস্থ শরীর—এমন ধারণাও সঠিক নয়।
নিজের শরীরকে গ্রহণ করা, খাবারের সঙ্গে স্বাস্থ্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা এবং ওজনের চেয়ে সামগ্রিক সুস্থতাকে গুরুত্ব দেওয়াই বেশি জরুরি।









































