মাহমুদের ফিরে আসার গল্প

মাহমুদ উল্লাহ রিয়াদ যেন সেই গল্পের নায়ক, যার নামের পাশে চোখ বুজে লিখে দেওয়া যায়—এভাবেও ফিরে আসা যায়! যে গল্প আপনাকে আন্দোলিত করতে বাধ্য। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ‘শেষ লিখে ফেলা’ থেকে ভারত বিশ্বকাপ, বিশ্বকাপে দলের সেরা পারফরমার এবং টি-টোয়েন্টি দলে প্রত্যাবর্তন হয়ে আজ জায়গা করে নিলেন আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বাংলাদেশ দলে—প্রতি পদে পদে যেন রোমাঞ্চ।

পেছন থেকে শুরুটা করা যাক। মাহমুদের ক্যারিয়ারের শেষ দেখার শুরুটা গত বছর ঘরের মাঠে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ দিয়ে।

তিন ওয়ানডেতে তার স্কোর, ৩১, ৩২ ও ৮। এর ধাক্কায় জায়গা হারান টি-টোয়েন্টি দলে। এরপর তার ক্যারিয়ারের শেষ দেখেননি, এমন লোকের সংখ্যা হাতে গোনা। মাহমুদ ‘বাদ পড়বেন, বাদ পড়বেন’ এমন একটা আবহ অবশ্য তারও আগে তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ থেকে একটা ‘লাইফলাইন’ আদায় করে নিতে পারতেন। কিন্তু মাহমুদ ভালো করতে পারেননি। ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার আগে তখনকার অধিনায়ক সাকিব আল হাসানও এক সাক্ষাৎকারে ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলেছিলেন। সাকিবের কথা অনুযায়ী, ওই সিরিজের পর বাদ পড়ার তালিকায় ছিলেন আরেক অভিজ্ঞ ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিম।

কিন্তু শেষ ওয়ানডেতে ৭০ রানের ইনিংস খেলে সে যাত্রায় টিকে গিয়েছিলেন মুশফিক।

মাহমুদের প্রসঙ্গে ফেরা যাক। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওই সিরিজের পর ভারত বিশ্বকাপের আগে আর দলে জায়গা হয়নি তার। তবে তিনি হাল ছাড়েননি। নীরব লড়াই চালিয়ে গেছেন নিজের সঙ্গে।

চতুর্দিকে আলোচনার ঝড় এড়িয়ে গেছেন সচেতনভাবেই। সেটার ফলও পেয়েছেন ধীরে ধীরে। ওদিকে তার পজিশনে যারাই খেলেছেন, আশানুরূপ নৈপুণ্য দেখাতে পারেননি কেউই। তাই বিশ্বকাপ দলের সবচেয়ে বড় চমক হয়ে চন্দিকা হাতুরাসিংহের পরিকল্পনায় আবার ফেরেন মাহমুদ।

বিশ্বকাপেও কী হয়েছে, সেটা আর খুব বেশি বলার অপেক্ষা রাখে না। দলের ভরাডুবির মাঝেও একমাত্র তারা হয়ে জ্বলেছেন তিনি। নামের পাশে একটি করে সেঞ্চুরি আর ফিফটিতে ৩২৮ রান তো সেটাই বলে। তার চেয়ে বেশি রান করতে পারেননি বাংলাদেশ দলের আর কোনো ব্যাটার। চোটের কারণে বিশ্বকাপের পর নিউজিল্যান্ড সফরে যাওয়া হয়নি। তখনো মাহমুদের টি-টোয়েন্টি দলে ফেরার আলোচনা নেই। টি-টোয়েন্টি দলে তার ক্যারিয়ারের ‘শেষ লেখা হয়ে গিয়েছিল’ যে আরো আগে। অধিনায়কত্ব তো হারিয়েছিলেনই, ২০২২ বিশ্বকাপের আগে এশিয়া কাপ থেকে দলেও জায়গা হারান। অস্ট্রেলিয়ায় গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও যাওয়া হয়নি।

ধরে নেওয়া হয়েছিল, দুবাইয়ে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচটাই কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে মাহমুদের শেষ ম্যাচ। কে ভেবেছিল, টি-টোয়েন্টি দলেও আবার ফিরবেন তিনি? কিন্তু শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে গত মার্চে তিন ম্যাচের সিরিজ দিয়ে কুড়ি ওভারের বাংলাদেশ দলে ফেরেন মাহমুদ। নিজের সামর্থ্যের জানান দিয়ে এবার জায়গা করে নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ওয়েস্ট ইন্ডিজে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দলেও। বয়স ৩৮ পেরিয়ে গেছে আগেই। এই বয়সেও মাহমুদ যেন চিরতরুণ, চনমনে। মাঠে তার উপস্থিতি টের পাওয়া যায় ভালোভাবেই। ওই শ্রীলঙ্কা সিরিজের আগে ক্রিকইনফোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হাতুরাসিংহে তো শুধু শুধু বলেননি, ‘সে শারীরিক ও মানসিকভাবে বেশ সতেজ। আমি চাই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও সতেজ মাহমুদ উল্লাহ যেন নিজেকে প্রমাণ করতে পারে এবং সবাইকে যেন বলতে পারে, সে এখনো শেষ হয়ে যায়নি।’

তবে এই বয়সে শুধু নিজে খেলা নয়, তরুণদের অনুপ্রেরণা হতে চাওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন মাহমুদ, ‘আমি দলের সিনিয়র একজন খেলোয়াড়। আমি অনেক দিন ধরেই খেলছি। তাই দায়িত্বও চলে আসে। তরুণদের দিকনির্দেশনা দেওয়া, তাদের সঙ্গে কথাও বলা। আমরা চেষ্টা করি বন্ধু-ভাই হিসেবে থাকতে। আমরা চেষ্টা করি তাদের সাহায্য করতে। এটা বের করার চেষ্টা করি যে তাদের জন্য কোনটা ভালো এবং দলের জন্য কী ভালো।’ মাহমুদের ফিরে আসার গল্পটাই তো তরুণদের অনুপ্রেরণা।

LEAVE A REPLY