জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে ট্রাম্পকে জবাব দিয়ে যা বললেন ইরানি প্রেসিডেন্ট

যুদ্ধের প্রথম দিকে হামলায় নিহত ১৫০ জনেরও বেশি স্কুলশিক্ষার্থীর ছবি ধরে আছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ছবি : রয়টার্স

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ চালিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যের ‘আসল সন্ত্রাসী ও অত্যাচারী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ইরান কখনোই আমেরিকার সামনে মাথা নত করবে না।তবে হুঙ্কারের পাশাপাশি কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রাখার বার্তাও দিয়েছেন তিনি।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরুর পর জাতিসংঘের অধিবেশনে এটিই পেজেশকিয়ানের প্রথম ভাষণ। নিউইয়র্কে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং যারা আমাদের ওপর বলপ্রয়োগ করতে চান, তাদের বোঝা উচিত, আমরা সংলাপ, কূটনীতি ও আলোচনার জন্য প্রস্তুত। তবে তা হতে হবে কোনো ধরনের হুমকির ভাষা ছাড়া।’

এর আগে গত মঙ্গলবার জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানকে ‘ধূলিসাৎ’ করে দেওয়ার হুমকি দেন, আবার পাশাপাশি তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার নতুন করে শুরু হওয়া আলোচনার প্রশংসা করেন। 

সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যে টানা তিন ঘণ্টার এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। গত জুনের পর এটিই দুই দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রথম কোনো বৈঠক, যাকে উভয় পক্ষই গঠনমূলক বলে অভিহিত করেছে। তবে এই বৈঠক সত্ত্বেও পেজেশকিয়ানের ভাষণ শুরুর পরপরই মার্কিন প্রতিনিধি দল কক্ষ ত্যাগ করে।

ভাষণে পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসবাদের’ অভিযোগ এনে যুদ্ধের সূচনালগ্নে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার কড়া সমালোচনা করেন। তিনি খামেনির ছবি এবং যুদ্ধের প্রথম দিনগুলোতে নিহত ১৫০ জনেরও বেশি স্কুলশিক্ষার্থীর ছবি উঁচিয়ে ধরে বলেন, ‘আমরা কেবল নিজেদের রক্ষা করেছি, আমরা সন্ত্রাসী নই। আমাদের নিরপরাধ মানুষ কাপুরুষোচিত আক্রমণের শিকার হয়েছে।’

পারমাণবিক কর্মসূচি প্রসঙ্গে পেজেশকিয়ান জানান, ইরানের কেবল শান্তিপূর্ণ বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি পরিচালনার অধিকার রয়েছে এবং তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না। এছাড়া তিনি জোর দিয়ে বলেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তার সমাধান যুক্তরাষ্ট্রের মতো বহিরাগতদের হাতে নেই, বরং অঞ্চলের দেশগুলোর পারস্পরিক চুক্তির মাধ্যমেই তা সম্ভব।

বৈঠক নিয়ে পেজেশকিয়ান বিস্তারিত না বললেও, হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আরব প্রতিবেশীদের সমর্থন আদায়ের বিষয়েই তেহরানের মূল নজর ছিল। যুদ্ধের শুরু থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক জলপথটি অবরুদ্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম চরম মাত্রায় বেড়েছে। পেজেশকিয়ান স্পষ্ট করে জানান, ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে এমন অস্ত্র বহনে এই প্রণালী ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। এই কথা ইঙ্গিত দেয় যে ভবিষ্যতে এই প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোতে তল্লাশি চালানোর অধিকার দাবি করতে পারে ইসলামি প্রজাতন্ত্রটি।

‘সন্ত্রাসবাদের প্রকৃত শিকার ইরান’ এই দাবিতে অটল থেকে পেজেশকিয়ান প্রশ্ন তোলেন, ‘তারা (ইসরায়েল) হত্যা করে, আমাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ইরান বিশেষ সুবিধা চায়নি, বরং সমান অধিকার চেয়েছিল।’

এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই নিশ্চিত করেছেন যে কাতারের মধ্যস্থতায় মার্কিন পক্ষের সঙ্গে কথা হয়েছে। যুদ্ধ বন্ধ, মার্কিন আগ্রাসন ও নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার, অর্থনৈতিক যুদ্ধ বন্ধ এবং ফ্রিজ করা ইরানি সম্পদ মুক্তির মতো সাতটি পূর্বশর্ত দিয়েছে তেহরান। গত ৪৮ ঘণ্টার নতুন এক ঘটনাক্রমে ইরান জানিয়েছে, এই শর্তগুলো মানা হলে আগামী সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া সম্ভব হতে পারে।

নিউইয়র্কে পেজেশকিয়ানের ভাষণ নিজ দেশে প্রশংসিত হলেও ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের কঠোর মনোভাবাপন্ন সচিব মহসিন রেজাই আমেরিকার সঙ্গে এই যোগাযোগকে ‘আলোচনা’ বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘ইরানের শর্ত না মানা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খোলা হবে না এবং কোনো আলোচনাও হবে না।’

মার্কিন চাপে যেসব প্রতিবেশী দেশ ইরানি বিমানের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করছে, তাদের উদ্দেশ্যে মহসিন রেজাই হুঁশিয়ারি দেন, ‘আপনারা যদি যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়ান, আমরাও চুপ করে দেখব না।’

এদিকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে বর্তমানে চরম অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধের কারণে দেশটির তেল রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি মার্কিন গৌণ বা পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞার হুমকির কারণে ওমান এবং ইরাক তাদের আকাশসীমা ইরানি বেসামরিক বিমানের জন্য বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে, যা ইরানের আকাশ যোগাযোগ ব্যবস্থাকে চরম সংকটে ফেলেছে।

তা সত্ত্বেও, মার্কিন পক্ষ থেকে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত না করার এবং নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক করার তীব্র চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ফলে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করে বাণিজ্য সচল করার বিষয়ে উভয় পক্ষই মধ্যস্থতার টেবিলে কিছুটা অগ্রগতি ঘটাতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। 
 

LEAVE A REPLY