ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা অচল, এশিয়ায় বাড়ল তেলের দাম

ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তিচুক্তি এবং হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া নিয়ে আলোচনা অচলাবস্থায় পড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে।মঙ্গলবার এশিয়ার বাজারে তেলের দাম বেড়েছে এবং শেয়ারবাজারে ওঠানামা দেখা গেছে।

বাজারে মূল উদ্বেগ হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান বিরোধ কতদিন স্থায়ী হবে এবং এর ফলে বিশ্বে জ্বালানি ও পণ্যের দাম কতটা বাড়তে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় বিনিয়োগকারীরাও সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। সোমবার ইরান শান্তিচুক্তির বিষয়ে কয়েকটি শর্ত দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রও নিজেদের দাবি জানিয়েছে।মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধ, হামলা ও বিক্ষোভে নিহত ব্যক্তিদের জন্য ইরানকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থান বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার আলোচনা আরো জটিল করতে পারে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।

আন্তর্জাতিক বাজারে মঙ্গলবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ প্রতি ব্যারেলে ৮৮ দশমিক ০৯ ডলার হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে হয়েছে ৮২ দশমিক ৫২ ডলার প্রতি ব্যারেল।দুই ধরনের তেলের দামই ৩১ জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। এর আগের দিন সোমবারও ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই—দুই ধরনের তেলের দাম প্রায় ৫ শতাংশ করে বেড়েছিল। বাজার বিশ্লেষক টনি সাইকামোর বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এখন কে আগে অবস্থান থেকে সরে আসবে, তা নিয়ে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। তার মতে, পরিস্থিতি দীর্ঘ লড়াইয়ের মতো হলে তেলের বাজারে অস্থিরতা আরো কিছুদিন থাকতে পারে। তার ধারণা, কে আগে পিছু হটে, তা স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৫ থেকে ৯৫ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করতে পারে। 

জ্বালানির দাম নতুন করে বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের জুলাই মাসের মূল্যস্ফীতির প্রতিবেদন আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিবেদনটি বুধবার প্রকাশ হওয়ার কথা। বাজারে ধারণা করা হচ্ছে, জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক ভোক্তা মূল্যসূচক মাসিক হিসাবে শূন্য দশমিক ১ শতাংশ বাড়তে পারে। খাদ্য ও জ্বালানির মতো অস্থির পণ্য বাদ দিয়ে মূল মূল্যসূচক বাড়তে পারে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ। তবে মূল্যস্ফীতি বাজারের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হলে আগামী মাসে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়াতে পারে—এমন আলোচনা আবার জোরালো হতে পারে। বর্তমানে সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা প্রায় ৫০-৫০ বলে বাজারে ধারণা করা হচ্ছে।

ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের প্রধান বাজার অর্থনীতিবিদ জোনাস গোল্টারম্যান বলেন, মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এমন হলে সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে বাজারের প্রত্যাশা আবার বাড়তে পারে। তিনি আরো বলেন, একই সময়ে অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল প্রবৃদ্ধি দেখা দেওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এখনো এমন অবস্থায় আছে যেখানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কিছুটা বেশি শক্তিশালী। ফলে সুদের হার আরো বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক মঙ্গলবার টানা দ্বিতীয় বৈঠকে নগদ সুদের হার ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। ব্যাংকটি বলেছে, প্রত্যাশা অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতির গতি কমছে। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতে আবারও সুদের হার বাড়ানো হতে পারে বলে সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। জাপানে সরকারি ছুটি থাকায় মঙ্গলবার এশিয়ার বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের নগদ ট্রেজারি বন্ডের লেনদেন বন্ধ ছিল। তবে ভবিষ্যৎ লেনদেনে এসব বন্ডের দাম সামান্য কমেছে। সাধারণত বন্ডের দাম কমলে এর সুদ বা ফলন বাড়ে।

জাপান বাদে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের এমএসসিআই শেয়ার সূচকে দিনের শুরুতে ওঠানামা দেখা যায়। পরে সূচকটি শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ বেড়ে যায়। দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচক বেড়েছে ১ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরো বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় সামগ্রিক বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা এখনো দুর্বল। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যৎ লেনদেনে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। নাসডাকের ভবিষ্যৎ সূচক শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশ এবং এসঅ্যান্ডপি ৫০০-এর ভবিষ্যৎ সূচক শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশ বেড়েছে। এর আগে সোমবার নগদ লেনদেনে ওয়াল স্ট্রিটের প্রধান সূচকগুলো কমে দিন শেষ করে।

ইউরোপের বাজারে ইউরোস্টক্স ৫০-এর ভবিষ্যৎ সূচক অপরিবর্তিত ছিল। এফটিএসইর ভবিষ্যৎ সূচক শূন্য দশমিক ০৫ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে ড্যাক্সের ভবিষ্যৎ সূচক বেড়েছে শূন্য দশমিক ০৭ শতাংশ। এশিয়ার অন্যান্য বাজারে হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে। চীনের বড় কোম্পানিগুলোর সিএসআই৩০০ সূচক কমেছে শূন্য দশমিক ০৫ শতাংশ। এদিকে রাতের লেনদেনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের বড় বিনিয়োগের খবরও বাজারে আলোচনায় এসেছে। এনভিডিয়া জানিয়েছে, এআই অবকাঠামো খাতে অর্থায়নের জন্য তারা ছয়টি বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব করেছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূলধন সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে।

বাজার বিশ্লেষক টনি সাইকামোর এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, বর্তমান বিনিয়োগের প্রবণতা অতীতে আবাসন খাতে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের দ্রুত বিস্তারের কথা মনে করিয়ে দেয়। সেই সময়ের অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ আর্থিক উদ্ভাবন শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের অন্যতম কারণ হয়েছিল। মুদ্রাবাজারেও জাপানি ইয়েন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ডলারের বিপরীতে ইয়েনের দাম ১৫৯-এর দুর্বল অবস্থানের নিচে রয়েছে। গত সপ্তাহে ডলারের বিপরীতে ইয়েনের দাম সর্বোচ্চ ১৫৫ দশমিক ২০ পর্যন্ত উঠেছিল। এরপর ইয়েনের দাম ধরে রাখতে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য যৌথ উদ্যোগসহ কয়েক দফা বাজারে হস্তক্ষেপের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

নোমুরার বিশ্লেষকেরা এক নোটে বলেছেন, বাজারে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের আরও সমন্বিতভাবে ইয়েন কেনার হস্তক্ষেপের বিষয়ে সতর্কতা রয়েছে। এ কারণে খুব অল্প সময়ের মধ্যে ডলারের বিপরীতে ইয়েনের দাম ১৬০ ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে বিশ্লেষকেরা বলেছেন, বর্তমান বাজারদর থেকে বোঝা যাচ্ছে, ইয়েনের দাম আরো কমলে তা কিনতে অনেক বিনিয়োগকারী প্রস্তুত আছেন। মে মাসের পর প্রথমবারের মতো ডলারের বিপরীতে ইয়েনের দাম ১৫৬ থেকে ১৫৭-এর পর্যায়ে নেমেছিল। তেলের দাম বাড়ার কারণে ডলার কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে। ফলে ইউরোর দাম দেড় মাসের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কিছুটা নিচে রয়েছে। ইউরোর দাম ছিল ১ দশমিক ১৫৪১ ডলার।

ব্রিটিশ পাউন্ডের দামও কিছুটা কমেছে। সোমবার এক মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠার পর মঙ্গলবার প্রতি পাউন্ডের দাম দাঁড়ায় ১ দশমিক ৩৫১১ ডলার। অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার পর অস্ট্রেলীয় ডলারের দাম কিছু সময়ের জন্য কমে যায়। পরে মুদ্রাটির দাম শূন্য দশমিক ০৭ শতাংশ কমে প্রতি অস্ট্রেলীয় ডলারে শূন্য দশমিক ৭০৪৯ মার্কিন ডলারে দাঁড়ায়। অস্থির আন্তর্জাতিক বাজারে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার চাহিদাও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সরাসরি লেনদেনে সোনার দাম শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৪০২ দশমিক ৫২ ডলারে উঠেছে।

তেলের দাম বৃদ্ধি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনায় অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ এবং সুদের হার নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বিনিয়োগকারীরা এখন সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। হরমুজ প্রণালি নিয়ে পরিস্থিতি কোন দিকে যায় এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা আবার এগোয় কি না, সেটিই এখন বাজারের অন্যতম প্রধান নজর।

LEAVE A REPLY