ভারতে প্যাকেটজাত খাবারের মোড়কে স্বাস্থ্য সতর্কতা নিয়ে বিতর্ক

ছবি : রয়টার্স

ভারতে প্যাকেটজাত খাবার ও পানীয়ের মোড়কে পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সতর্কতামূলক লেবেল দেওয়া নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

প্যাকেটজাত খাবারে বেশি চিনি, লবণ ও চর্বি থাকলে তা ভোক্তাদের সহজে জানানোর জন্য প্যাকেটের সামনে রঙিন সতর্কবার্তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল ভারত।তবে বড় খাদ্য ও পানীয় কম্পানিগুলোর বিরোধিতার পর এই পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে দেশটির খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (এফএসএসএআই) গত আগস্টে জানায়, প্যাকেটের সামনে রঙিন সতর্কবার্তা দেওয়ার প্রস্তাবটি আর এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে না। এর পরিবর্তে প্যাকেটের ওপর সাদা-কালো ছকের মাধ্যমে খাবারে কতটুকু চিনি, চর্বি ও লবণ রয়েছে, তা উল্লেখ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

তবে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।জনস্বাস্থ্যকর্মীদের আবেদনের পর ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টি পর্যালোচনা করছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্যাকেটের সামনে সহজে বোঝা যায় এমন সতর্কবার্তা থাকলে মানুষ খাবার কেনার সময় বেশি সচেতন হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে কিছু পানীয়র উদাহরণ সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের বাইরে বিক্রি হওয়া কিছু পানীয়তে ক্যালোরি বা চিনির পরিমাণ কম থাকে।কিন্তু ভারতে একই ব্র্যান্ডের পানীয়তে চিনি প্রায় তিন গুণ বেশি। কৃত্রিম রঙও ব্যবহার করা হয়, যার কারণে ইউরোপে পণ্যের মোড়কে স্পষ্ট স্বাস্থ্য সতর্কতা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। ভারতে অবশ্য এসব তথ্য সাধারণত পণ্যের পেছনে ছোট অক্ষরে লেখা থাকে।

জনস্বাস্থ্যকর্মীদের অভিযোগ, বড় ভোক্তাপণ্য কম্পানিগুলো দীর্ঘদিন ধরে প্যাকেটজাত খাবারের সামনে বাধ্যতামূলক পুষ্টি সতর্কতা দেওয়ার উদ্যোগের বিরোধিতা করে আসছে। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাবারের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সহজ ও স্পষ্ট তথ্য থাকলে মানুষ স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নিতে পারে।বিশ্বের প্রায় ২০টি দেশে ইতিমধ্যে প্যাকেটের সামনে সহজে বোঝা যায় এমন পুষ্টি লেবেল চালু হয়েছে। এসব লেবেলে বেশি চিনি বা লবণের মাত্রা লাল রঙে এবং কম চর্বির মাত্রা সবুজ রঙে দেখানো হতে পারে।

ল্যান্সেট জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতে প্রায় ৪৫ কোটি মানুষ অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় ভুগতে পারে। এ কারণে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা খাবারের পুষ্টি সম্পর্কে আরো স্বচ্ছ তথ্য দেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন।

রয়টার্সের পর্যালোচনা করা রেকর্ডিং অনুযায়ী, গত ১৯ মার্চ শিল্প খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এফএসএসএআইয়ের একটি বৈঠকে সতর্কতামূলক লেবেল নিয়ে তীব্র আলোচনা হয়। শিল্প খাতের কর্মকর্তারা তখন দাবি করেন, এ ধরনের লেবেল ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করতে পারে এবং এগুলো খুব বেশি কার্যকর নাও হতে পারে।

কোকা-কোলা ইন্ডিয়ার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মিলি ভট্টাচার্য ওই বৈঠকে বলেন, যারা আগে থেকেই খাবারের উপাদানের তালিকা পড়েন না, তারা শুধু মোড়কের ওপর একটি প্রতীক বা সতর্কতা দেখেই খাদ্যাভ্যাস উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তন করবেন, এমন ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয়।

তিনি বলেন, সতর্কতামূলক লেবেল মানুষকে বেশি চিনি বা লবণযুক্ত খাবার খাওয়া থেকে বিরত রাখতে পারবে না। তার মতে, ভারতীয় চিকিৎসকেরা রোগীদের কোন খাবার এড়িয়ে চলা উচিত, সে বিষয়ে ইতিমধ্যে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মোড়কের সামনে সহজে বোঝা যায় এমন সতর্কতামূলক লেবেল থাকলে ভোক্তারা খাবার কেনার সময় দ্রুত ও সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

অস্ট্রেলিয়ার জর্জ ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল হেলথের খাদ্যনীতি বিভাগের প্রধান সিমোন পেট্রিগিউ বলেন, সতর্কতামূলক লেবেল চালু হলে খাদ্য কম্পানিগুলোর মুনাফায় প্রভাব পড়তে পারে। তাই কম্পানিগুলো যতদিন সম্ভব এ ধরনের লেবেল ঠেকিয়ে রাখতে আগ্রহী।

তার মতে, এর ফলে ভারতীয় ভোক্তারা তারা যে খাবার কিনছেন, সেটি কতটা স্বাস্থ্যকর সে সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য পাচ্ছেন না। দুই ডজনের বেশি দেশে খাবারের মোড়কের সামনে পুষ্টি লেবেল নিয়ে গবেষণা করা পেট্রিগিউ বলেন, বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর চাপ নিয়ন্ত্রকদের কঠোর নিয়ম চালুর প্রক্রিয়াকে অনেকটাই বাধাগ্রস্ত করেছে। এফএসএসএআই এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, খাদ্যপণ্যের লেবেলসংক্রান্ত বিষয়টি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন।

ভারতে প্যাকেটজাত খাবার ও পানীয়ের বাজার ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি। শিল্প খাতের হিসাবে, দেশটিতে তৈরি প্রায় ৮০ শতাংশ প্যাকেটজাত খাবারে চিনি, লবণ ও চর্বির পরিমাণ বেশি হতে পারে।

২০১৭ সাল থেকে ভারতে প্যাকেটজাত খাবারের সামনে রঙের মাধ্যমে সতর্কবার্তা দেওয়ার বিভিন্ন প্রস্তাব এসেছে। খাবার কতটা স্বাস্থ্যকর, তা বোঝাতে স্টার রেটিং চালুর প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। তবে এখন পর্যন্ত খাবারের পেছনে উপাদান ও পুষ্টির তথ্য লেখা থাকাই মূলত বাধ্যতামূলক। একই ব্র্যান্ডের খাবার ও পানীয় বিভিন্ন দেশে ভিন্ন উপাদান দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে, এ বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

ভারতে প্যাকেটজাত খাবার নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সচেতনতা বাড়ছে। ‘ফুড ফার্মার’ নামে পরিচিত রেভান্ত হিমাতসিংকা ইউটিউব ও ইনস্টাগ্রামে প্যাকেটজাত খাবারের উপাদান নিয়ে নিয়মিত কথা বলেন। তার অনুসারীর সংখ্যা ৫০ লাখের বেশি। তিনি বিভিন্ন দেশের একই ব্র্যান্ডের পণ্যের উপাদান তুলনা করে দেখান এবং ভারতীয় পণ্যে ব্যবহৃত উপাদান নিয়ে ভোক্তাদের সচেতন করার চেষ্টা করেন।

LEAVE A REPLY