পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নতুন সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

সংগৃহীত ছবি

বিশ্বের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তির উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল, বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) ও ব্যাটারি উৎপাদনে এ অঞ্চলে ক্রমান্বয়ে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ বাড়ছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতির পরিবর্তন, অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা এ অঞ্চলের উদীয়মান শিল্পের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। সোমবার (২৬ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) প্রকাশিত ‘এনার্জি টেকনোলজি সাপ্লাই চেইনস ইন সাউথইস্ট এশিয়া’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

আইইএর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত ২৫ বছরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জ্বালানির মোট চাহিদা প্রায় ১৪০ শতাংশ বেড়েছে। ঘোষিত নীতিগুলো কার্যকর থাকলে আগামী ১০ বছরে বৈশ্বিক জ্বালানি চাহিদা বৃদ্ধির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ (২০%) আসবে এ অঞ্চল থেকেই।

সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও বায়ুবিদ্যুৎ সরঞ্জামসহ পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তির আঞ্চলিক বাজার ২০২৫ সালে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। নীতিগুলো বাস্তবায়িত হলে ২০৩৫ সাল নাগাদ এই বাজারের আকার ৮০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে (যদিও নীতির ধারাবাহিকতা দুর্বল হলে তা ৫৫ বিলিয়ন ডলারে সীমিত থাকতে পারে)। বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার ও জীবাশ্ম জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা কমানোর চেষ্টার কারণে এই প্রবৃদ্ধির সিংহভাগ আসবে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ব্যাটারি খাত থেকে।

একসময় বিশ্বে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল উৎপাদনে চীনের পরই দ্বিতীয় স্থানে ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া।তবে বিনিয়োগের ধীরগতি ও বৈশ্বিক বাণিজ্যনীতির চাপে এ খাত এখন পিছিয়ে পড়ছে।

আইইএর তথ্যমতে, এ অঞ্চলে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল উৎপাদনের সক্ষমতা ২০২৩ সালে ১০৬ গিগাওয়াট থাকলেও ২০২৫ সালে তা কমে ৮২ গিগাওয়াটে নেমেছে। ২০৩০ সালে তা আরো কমে ৭২ গিগাওয়াটে নামতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, নতুন শুল্ক ও বিশ্ববাজারে প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত সরবরাহ থাকার কারণে বিনিয়োগকারীরা পিছু হটছেন।

বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ব্যাটারি উৎপাদনে নতুন গতি

সৌরবিদ্যুৎ খাতে ধস নামলেও বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ব্যাটারি খাতে বড় সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে আইইএ।২০২৫ সালে এ অঞ্চলে ইভি উৎপাদন সক্ষমতা ছিল প্রায় ১০ লাখ, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ১৮ লাখে পৌঁছাতে পারে। উল্লেখ্য, বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক এবং পরিকল্পিত নতুন সক্ষমতার ৭০ শতাংশের বেশি চীনা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে।

চলে গেলেন ‘সিআইডি’র নির্মাতা

২০২৫ সালে ব্যাটারি সেল উৎপাদনের সক্ষমতা ছিল ৪০ গিগাওয়াট-ঘণ্টা, যা ২০৩০ সালে ১০০ গিগাওয়াট-ঘণ্টা এবং ২০৩৫ সালে ৩০০ গিগাওয়াট-ঘণ্টা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

চীনা বিনিয়োগ : সুবিধা ও ঝুঁকি

২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এ অঞ্চলের পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি উৎপাদন খাতে মোট বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রায় ৩০ শতাংশ এসেছে চীন থেকে। ২০২৫ সালে এ খাতে চীনের প্রকল্পভিত্তিক বিনিয়োগ ছিল প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার (যা ২০২৩ সালে ছিল ৩১ বিলিয়ন ডলার)।

চীনা বিনিয়োগ প্রযুক্তি হস্তান্তর ও কর্মসংস্থানে ভূমিকা রাখলেও, কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সরবরাহব্যবস্থাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। এ প্রসঙ্গে ২৭ অক্টোবরের রয়টার্সের প্রতিবেদনে আইইএর নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল সতর্ক করে বলেন, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তির সরবরাহব্যবস্থা অল্প কয়েকটি দেশের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকা একটি বড় ঝুঁকি। তাই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে নিজস্ব উৎপাদন ও বৈচিত্র্যময় আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব প্রয়োজন।

কার্যকর শিল্পনীতি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার তাগিদ

আইইএ সুপারিশ করেছে যে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, স্থানীয় শিল্প ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের সঠিক ব্যবহার বাড়াতে হবে। ঘোষিত শিল্পনীতিগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে ২০২৫ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে আরো অতিরিক্ত ১৪ বিলিয়ন ডলারের বাড়তি বিনিয়োগ আনা সম্ভব হবে।

আইইএর মূল্যায়ন অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এখন এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখান থেকে তারা জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি নতুন রপ্তানি বাজার তৈরি করে অর্থনৈতিক সুবিধা নিতে পারে।

সূত্র : আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা—আইইএ, রয়টার্স

LEAVE A REPLY