সংগৃহীত ছবি
ভাবুন তো, দোকানে ঢুকে পণ্য কিনতে গিয়ে আপনাকে অভ্যর্থনা জানাল একটি রোবট। আপনার অর্ডার নিল, পণ্য হাতে তুলে দিল, এমনকি কফি মেশিন ব্যবহার করে পানীয়ও তৈরি করে দিল।হংকংয়ে এমন দৃশ্য এখন আর কল্পনা নয়।
চীনভিত্তিক রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গ্যালবট হংকংয়ে চালু করতে যাচ্ছে এমনই রোবট পরিচালিত দোকান। চীনের বাইরে এটাই প্রতিষ্ঠানটির প্রথম দোকান। আজ সোমবার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরদিন মঙ্গলবার হাং হোম, কাই তাক ও ওয়ান চাই এলাকায় তিনটি ‘গ্যালবট স্টোর’ চালু হওয়ার কথা।পরে হংকংয়ের আরও ব্যস্ত এলাকায় প্রায় ১০টি দোকান খোলার পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। গ্যালবটের এসব দোকানে থাকবে চাকার ওপর চলতে সক্ষম মানবাকৃতির রোবট। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ‘অ্যাস্ট্রাব্রেইন’ মডেল ব্যবহার করে রোবটগুলো বিভিন্ন কাজ করবে। ক্রেতার অর্ডার নেওয়া থেকে শুরু করে পণ্য পৌঁছে দেওয়া- সবই করতে পারবে তারা।এমনকি দোকানে থাকা কফি মেশিন ব্যবহার করে পানীয়ও তৈরি করতে পারবে।
তবে শুরুতেই দোকানের সব কাজ রোবটের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে না। কিছু পণ্য তাকের ওপর সাজানোসহ কয়েকটি কাজে এখনো মানুষের সহায়তা লাগবে। তবে গ্যালবটের লক্ষ্য শেষ পর্যন্ত দোকানের পুরো কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয় করা। দোকানগুলোতে খাবার ও পানীয়ের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল পণ্যও বিক্রি করা হবে।গ্যালবটের প্রধান কৌশল কর্মকর্তা ঝাও ইউলি মনে করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে যাওয়ার জন্য হংকং গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা। তার ভাষায়, চীনের মূল ভূখণ্ডের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে যাওয়ার ক্ষেত্রে হংকং একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘জানালা ও প্ল্যাটফর্ম’। ২০২৪ সাল থেকেই হংকংয়ে গ্যালবটের একটি কার্যালয় রয়েছে। এবার দোকান চালুর মাধ্যমে শহরটিতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম আরো বাড়ছে।
গ্যালবট গত বছরের আগস্টে মূল ভূখণ্ড চীনে প্রথম দোকান চালু করে। এরপর দেশটির ৫০টি শহরে প্রায় ২০০টি দোকানে তাদের কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়ে। হংকংয়ের অর্থবিষয়ক সচিব পল চ্যান মো-পো মনে করেন, রোবট শিল্পের বিকাশে শহরটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। তার মতে, হংকং তিনটি ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখতে পারে- রোবটের ব্যবহারিক প্রয়োগের সুযোগ তৈরি, গবেষণা ও উন্নয়নের পরিবেশ গড়ে তোলা এবং বিনিয়োগ ও মূলধনের শক্তিশালী ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। হংকংয়ের ঘনবসতি, বৈচিত্র্যময় ব্যবহারিক ক্ষেত্র এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ- এই তিনটি বিষয় রোবট প্রযুক্তির জন্য বড় সুবিধা বলেও মনে করেন তিনি। চ্যান বলেন, বিশ্বজুড়ে মানবাকৃতির রোবটের ব্যবহার দ্রুত বাড়তে পারে। মর্গান স্ট্যানলির এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে তিনি জানান, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় ১০০ কোটি মানবাকৃতির রোবট থাকতে পারে। এর মধ্যে চীনে থাকতে পারে প্রায় ৩০ কোটি।আ
রোবট দোকানে কাজ করলে শ্রমিকের প্রয়োজন কমবে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে আসছে। বিশেষ করে হংকংয়ের মতো জায়গায়, যেখানে দোকানের ভাড়া ও শ্রমিকের খরচ তুলনামূলক বেশি। গ্যালবটের হিসাব অবশ্য আশাব্যঞ্জক। ঝাও ইউলি জানান, তাদের হিসাব অনুযায়ী একটি দোকান চালু করার ১২ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে সেটি লাভ-ক্ষতির সমতায় পৌঁছাতে পারে। রোবটের আরেকটি সুবিধা হলো দীর্ঘ সময় দোকান চালু রাখা। যেখানে ২৪ ঘণ্টা কর্মী রাখা কঠিন, সেখানে স্বয়ংক্রিয় রোবটের মাধ্যমে দোকানের কার্যক্রম বাড়ানো সম্ভব। চীনে গ্যালবট ইতিমধ্যে ২৪ ঘণ্টা চালু থাকা স্মার্ট ফার্মেসিতেও রোবট ব্যবহার করছে। হংকংয়ের গ্যালবট স্টোরের অন্যতম আকর্ষণ হতে পারে ভাষা। সেখানে ব্যবহৃত রোবট ক্যান্টনিজ ভাষা বুঝতে পারবে বলে জানিয়েছেন ঝাও।
হংকংয়ে এর আগে রোবট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে নানা প্রদর্শনী হয়েছে। তবে সেগুলো ছিল নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। গ্যালবটের লক্ষ্য হলো এমন রোবটকে মানুষের সামনে আনা, যেটি শুধু প্রদর্শনীতে দাঁড়িয়ে থাকবে না, বরং প্রতিদিন বাস্তব কাজ করবে। এই অভিজ্ঞতাই হংকংয়ের বাসিন্দাদের জন্য নতুন হতে পারে। গ্যালবট শুধু দোকানেই রোবট ব্যবহারের কথা ভাবছে না। সাংস্কৃতিক ও পর্যটনকেন্দ্রেও তাদের রোবট ব্যবহারের অভিজ্ঞতা রয়েছে। বেইজিং ও চিয়াংসি প্রদেশে স্থানীয় দর্শনীয় স্থানকে কেন্দ্র করে সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল পণ্য বিক্রির দোকানে রোবট ব্যবহার করেছে প্রতিষ্ঠানটি। গ্যালবটের দাবি, এসব দোকানের কারণে গত এক বছরে কিছু এলাকায় মানুষের চলাচল ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত গ্যালবট গত বছর বিভিন্ন ধরনের রোবট মিলিয়ে ১ হাজার ২০০টির বেশি দেশীয় অর্ডার পেয়েছে। তবে এ বছর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সম্প্রসারণে আরো জোর দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
ঝাও জানান, স্থানীয় অংশীদারদের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতার মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে রোবট ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে চান তারা। হংকংয়ে ভবিষ্যতে আরো ধরনের রোবট নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে গ্যালবটের। এর মধ্যে রয়েছে ‘গ্যালবট ইটি১’- প্রতিষ্ঠানটির তৈরি প্রথম দুই পায়ের মানবাকৃতির রোবট। এটি নিজে থেকে শেখার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের কাজ করতে পারে। ফলে হংকংয়ের তিনটি ছোট দোকান হয়তো শুধু নতুন ধরনের কেনাকাটার অভিজ্ঞতা নয়, বরং শহরটিতে রোবটের দৈনন্দিন ব্যবহারের বড় পরীক্ষাও হতে পারে।









































