সংগৃহীত ছবি
সন্তান জন্মের পর মায়ের শরীরে নানা পরিবর্তন আসা স্বাভাবিক। কিন্তু এই পরিবর্তন নিয়েই অনেক নারীকে শুনতে হয় নানা মন্তব্য, কটূক্তি ও তুলনা।কত দ্রুত আগের ওজনে ফিরলেন, শরীর আগের মতো হলো কি না—এসব প্রশ্ন অনেক সময় নতুন মায়ের মানসিক চাপ আরো বাড়িয়ে দেয়। বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে বলিউড অভিনেত্রী ক্যাটরিনা কাইফকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মন্তব্যের পর।
সম্প্রতি আম্বানি পরিবারের গণেশ চতুর্থীর অনুষ্ঠানের কিছু ছবিকে কেন্দ্র করে ক্যাটরিনা কাইফের শরীর ও ওজন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ে। তবে এই অভিজ্ঞতা শুধু কোনো তারকার নয়।সন্তান জন্মের পর নিজের শরীর নিয়ে অস্বস্তি, অন্যের সঙ্গে তুলনা এবং দ্রুত আগের চেহারায় ফেরার চাপ—এসবের মুখোমুখি হন অসংখ্য সাধারণ নারীও।
ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদন এ তথ্য দেয়।
এর আগেও সন্তান জন্মের পর শরীর নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছেন একাধিক বলিউড তারকা। ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন মা হওয়ার পর তাঁর ওজন নিয়ে প্রকাশ্যে নানা মন্তব্য হয়েছিল।অভিনেত্রী স্বরা ভাস্করও সন্তান জন্মের পর দ্রুত আগের শরীরে ফিরে যাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে কথা বলেছেন। রিচা চাড্ডা ও বিপাশা বসুকেও সন্তান জন্মের পর শরীর নিয়ে মন্তব্যের মুখে পড়তে হয়েছে।
কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারকাদের ছবি বা খবরের বাইরে সাধারণ মায়েদের অভিজ্ঞতাও কম কঠিন নয়।
ভারতের সাংবাদিক করিশমা কালিতা ২০১৬ সালে তার ওজন ৯০ কেজিতে পৌঁছানোর কথা জানিয়েছেন। পরে শরীরচর্চা ও কঠোর খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে তিনি ৫৬ কেজিতে নেমেছিলেন।২০২৫ সালে গর্ভবতী হওয়ার পর আবার তাঁর জীবনে বড় পরিবর্তন আসে। সন্তান জন্মের পর নবজাতকের যত্ন, ঘুমের অভাব ও দৈনন্দিন ব্যস্ততার মধ্যে নিজের শরীরচর্চার জন্য আগের মতো সময় বা মানসিক শক্তি ছিল না।
প্রায় ১৮ মাস পর আবার ব্যায়াম শুরু করলেও নিজের পুরোনো চেহারার সঙ্গে বর্তমান শরীরের তুলনা করা থেকে বের হতে পারেননি তিনি। এমনকি পুরোনো ২৪ ইঞ্চি জিন্সের দিকে তাকিয়ে আবেগাপ্লুত হওয়ার কথাও জানিয়েছেন করিশমা। স্বামী তাকে সমর্থন করলেও নিজের কাছে আকর্ষণীয় না লাগার অনুভূতি তাঁকে ভাবিয়েছে।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন এক বছর বয়সী সন্তানের মা সুশ্মিতা মারিক। তিনি জানান, কেউ সরাসরি চাপ না দিলেও অন্য নারীদের সঙ্গে নিজের শরীরের তুলনা করতে শুরু করেছিলেন। ‘অনেকটা ওজন বেড়েছে, এবার নিয়ন্ত্রণ করুন’ কিংবা ‘জিম করছেন, কিন্তু তেমন কোনো পরিবর্তন তো দেখা যাচ্ছে না’—এ ধরনের মন্তব্যও তাকে শুনতে হয়েছে।

ফলে সন্তানের প্রথম বছরে নিজের ছবি তুলতেও অনেকটা এড়িয়ে চলেছেন তিনি। কারণ আয়নায় নিজের চেহারা দেখে যে অস্বস্তি তৈরি হতো, তা সামাজিক অনুষ্ঠানে বা ছবিতে আরও বেশি অনুভূত হতো।
বিশেষজ্ঞদের আলোচনায়ও উঠে এসেছে, সন্তান জন্মের পর শরীর বদলে যাওয়ার বিষয়টি শুধু ওজনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। গর্ভাবস্থা ও প্রসবের পর শরীরের গঠন, পেটের আকৃতি, ত্বক ও পেশিতে পরিবর্তন আসতে পারে। তাই ওজন কমে গেলেও অনেক নারীর শরীর আগের মতো দেখতে নাও হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তারকাদের দ্রুত ওজন কমানোর ছবি দেখে মনে হতে পারে, সন্তান জন্মের পর অল্প সময়েই আগের শরীরে ফিরে যাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এসব পরিবর্তনের পেছনে ব্যক্তিগত প্রশিক্ষক, পুষ্টিবিদ, ব্যায়ামের সময়, সহায়তা ও অন্যান্য সুবিধা থাকে—যা সাধারণত ছবিতে দেখা যায় না।
২০২৫ সালে ১১৪ জন প্রসবোত্তর নারীকে নিয়ে করা একটি গবেষণাতেও বিষয়টির প্রভাব উঠে আসে। গবেষণায় অংশ নেওয়া প্রায় ৭০ শতাংশ নারী সন্তান জন্মের পর নিজেদের ওজন নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। পরিবার, সমাজ, গণমাধ্যম এবং নিজের শরীর নিয়ে অসন্তুষ্টি—সবকিছুই এই উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
‘ফিটস্পিরেশন’ ধরনের শরীরচর্চার ভিডিও বা ছবি দেখাও অনেক সময় পরিস্থিতি আরও কঠিন করে। এসব কনটেন্ট দেখে নারীরা নিজেদের শরীরকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করতে পারেন। এতে উদ্বেগ বাড়তে পারে এবং নিজের শরীর নিয়ে সন্তুষ্টি কমে যেতে পারে।
তাই সন্তান জন্মের পর একজন মাকে ‘কবে আগের ওজনে ফিরবেন’ বা ‘কতটা ওজন বেড়েছে’—এমন প্রশ্ন করার বদলে তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাওয়াই বেশি প্রয়োজন। পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, পরিবারের সহযোগিতা এবং নিজের জন্য কিছুটা সময়—নতুন মায়ের জন্য এগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ সন্তান জন্মের পর একজন নারীর শরীর শুধু বদলায় না, তাঁর জীবনযাপনও বদলে যায়। সেই পরিবর্তনের সময় তাঁকে শরীরের মাপ দিয়ে বিচার না করে মানুষ হিসেবে পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে জরুরি।









































