সন্তানকে ‘না’ বলবেন যেভাবে, সিদ্ধান্তেও থাকবেন অটল

সংগৃহীত ছবি

ছোট শিশুর কোনো আবদার পূরণ না করলে কান্না, রাগ কিংবা জেদ—এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় অনেক অভিভাবককে। তাই অনেক মা-বাবাই সন্তানকে ‘না’ বলতে দ্বিধা করেন।তবে শিশুর সব আবদার মেনে নেওয়া তার মানসিক বিকাশের জন্য ভালো নয়। বরং ভালোবাসা ও সহানুভূতির সঙ্গে যুক্তিসংগত সীমা নির্ধারণ করা শিশুকে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে এবং হতাশা সামলাতে শেখায়।

ভারতের সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের বরাতে প্রকাশিত হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশুর বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে ‘না’ শোনা একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা। এতে তারা ধীরে ধীরে হতাশা মেনে নেওয়া, অপেক্ষা করা এবং নিজের আবেগ সামলানোর দক্ষতা অর্জন করে।

‘না’ শোনা কেন জরুরি

শিশুর আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা একদিনে তৈরি হয় না। ছোটবেলা থেকেই আনন্দ, হতাশা, রাগ কিংবা কোনো কিছু পাওয়ার অপেক্ষার মতো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তারা এই দক্ষতা শেখে। এ ক্ষেত্রে মা-বাবার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

আবেগ নিয়ন্ত্রণ বলতে কঠিন অনুভূতি এড়িয়ে চলাকে বোঝায় না।বরং নিজের অনুভূতি বুঝতে পারা এবং ধীরে ধীরে তা সামলাতে শেখাই এর মূল বিষয়। শিশুরা বিশ্বস্ত বড়দের সহায়তায় বারবার এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এই দক্ষতা অর্জন করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশুকে সব ধরনের হতাশা থেকে দূরে রাখার পরিবর্তে কীভাবে তা সামলাতে হয়, সে বিষয়ে তাকে সহযোগিতা করা প্রয়োজন। যেমন, একসঙ্গে পুরো প্যাকেট বিস্কুট খেতে না দেওয়া কিংবা গাড়ির ওপর উঠতে নিষেধ করার মতো সাধারণ নিয়মও শিশুকে সীমারেখা বুঝতে সাহায্য করে।

‘না’ বলার সময় যেসব বিষয় খেয়াল রাখবেন

শিশুকে কোনো বিষয়ে নিষেধ করার সময় স্পষ্ট ও আত্মবিশ্বাসী থাকা জরুরি।‘পরে দেখা যাবে’ বা ‘এখন নয়’ বলার পরিবর্তে নির্দিষ্ট করে বলা ভালো, ‘আজ চকলেট কেনা হবে না।’ এতে শিশুর কাছে সিদ্ধান্তটি পরিষ্কার থাকে।

তবে শুধু নিষেধ করলেই হবে না, তার অনুভূতিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। যেমন বলা যায়, ‘আমি বুঝতে পারছি, চকলেট না পেয়ে তোমার মন খারাপ হয়েছে। কিন্তু আজ চকলেট কেনা হবে না।’ এতে শিশু বুঝতে পারে, তার কষ্টকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তবে সিদ্ধান্তও পরিবর্তন হচ্ছে না।

একই বিষয়ে বারবার ‘না’ বলার পর শিশুর কান্না বা জেদের মুখে সিদ্ধান্ত বদলে ফেললে সে শিখতে পারে, বেশি চাপ দিলে উত্তর পরিবর্তন হতে পারে। তাই যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সেটিতে অটল থাকা প্রয়োজন।

শিশুকে আবেগ নিয়ন্ত্রণ শেখাবেন যেভাবে

শিশুর অনুভূতি প্রকাশের ভাষা তৈরি করতে বই ও কার্টুনের চরিত্রকে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। যেমন, কোনো চরিত্রকে কাঁদতে দেখলে তাকে জিজ্ঞাসা করা যায়, ‘তার মন খারাপ কেন?’ এভাবে শিশু নিজের অনুভূতিও প্রকাশ করতে শেখে।

এ ছাড়া মা-বাবার নিজেদের আবেগ সামলানোর ধরনও শিশুর ওপর প্রভাব ফেলে। কোনো কারণে রেগে গেলে গভীর শ্বাস নেওয়া বা কিছুক্ষণ শান্ত থাকার মাধ্যমে শিশুকে দেখানো যায়, রাগের সময় কীভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।

শিশু জেদ বা কান্না শুরু করলে অভিভাবকেরও শান্ত থাকা জরুরি। প্রয়োজনে কিছুক্ষণ সময় নিয়ে তারপর তার সঙ্গে কথা বলতে পারেন। যেমন, খেলার মাঠ থেকে বাড়ি ফিরতে না চেয়ে শিশু কান্না করলে বলা যায়, ‘আমি বুঝতে পারছি, তুমি আরো খেলতে চেয়েছিলে। কিন্তু এখন বাড়ি যাওয়ার সময়।’ তার অনুভূতিকে স্বীকার করার পাশাপাশি নির্ধারিত নিয়মও বজায় রাখতে হবে।

খেলনার পুতুল বা অন্য চরিত্র ব্যবহার করে অভিনয়ের মাধ্যমেও শিশুকে বিভিন্ন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত করা যায়। যেমন, খেলার মাঠ থেকে বাড়ি ফেরার সময় হলে একটি পুতুলকে দিয়ে ‘এখন বাড়ি যেতে হবে’ বলানো যেতে পারে। এরপর শিশুকে সেই চরিত্রের অনুভূতি ও প্রতিক্রিয়া প্রকাশের সুযোগ দেওয়া যায়। এতে হতাশা বা রাগের মতো অনুভূতি নিয়ে কথা বলার অভ্যাস তৈরি হয়।

ভালো আচরণের প্রশংসা করুন

কোনো নিষেধ মেনে নেওয়ার পর শিশুর ভালো আচরণের প্রশংসা করা উচিত। যেমন, খেলার দোলনা ছেড়ে দ্রুত নেমে এলে বলা যায়, ‘আজ তুমি খুব সুন্দরভাবে দোলনা থেকে নেমেছ।’ এতে শিশু ইতিবাচক আচরণে উৎসাহ পায়।

তবে কোনো বিষয়ে ‘না’ শুনে শিশু কাঁদলে সেটিকে সব সময় খারাপ আচরণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। তার হতাশা বুঝতে হবে এবং ধীরে ধীরে পরিস্থিতি সামলাতে সহযোগিতা করতে হবে।

শিশুর বয়স অনুযায়ী প্রত্যাশা রাখুন

তিন বছর বয়সী কোনো শিশু সব সময় নিষেধাজ্ঞা মেনে নেবে, এমন প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ এ বয়সে মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও তাৎক্ষণিক ইচ্ছা সামলানোর ক্ষমতা এখনো বিকশিত হচ্ছে।

তাই শিশু পছন্দের কার্টুন দেখার সময় হঠাৎ বন্ধ করে গোসল করতে বললে সে বিরক্ত হতে পারে। এর পরিবর্তে পাঁচ মিনিট আগে জানিয়ে দেওয়া যেতে পারে যে, এরপর কার্টুন দেখা বন্ধ করে গোসল করতে হবে।

প্রতিবেদনের মূল পরামর্শ হলো, শিশুর অনুভূতিকে গুরুত্ব দিয়েও অভিভাবকদের যুক্তিসংগত সীমা বজায় রাখতে হবে। এতে সময়ের সঙ্গে শিশু বুঝতে শেখে, কোনো কিছু না পেয়ে মন খারাপ হওয়া স্বাভাবিক, তবে সেই হতাশা সামলে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরা সম্ভব।

LEAVE A REPLY