ছবি : পিন্টারেস্ট
রান্নায় স্বাদ বাড়াতে কিংবা খাবারের সঙ্গে ঘি খেতে পছন্দ করেন অনেকে। বাজারে গরুর দুধের ঘি ও মহিষের দুধের ঘি—দুই ধরনেরই চাহিদা রয়েছে।তবে পুষ্টিগুণের দিক থেকে কোনটি ভালো? গরুর ঘিতে কি চর্বি কম, নাকি মহিষের ঘিতে বেশি পুষ্টি? গবেষণায় পাওয়া তথ্য বলছে, দুই ধরনের ঘির মধ্যে কিছু পার্থক্য থাকলেও কোনোটিকেই নিঃশর্তভাবে বেশি স্বাস্থ্যকর বলা যায় না।

গরু ও মহিষের ঘির পুষ্টিগত পার্থক্য
২০২০ সালে Food Science and Technology সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় গরু ও মহিষের ঘির রাসায়নিক ও পুষ্টিগত উপাদান বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, মহিষের ঘিতে চর্বির পরিমাণ ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং গরুর ঘিতে ৯৮ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ মোট চর্বির পরিমাণে দুই ধরনের ঘির মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য নেই।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, দুই ধরনের ঘির ফ্যাটি অ্যাসিডের ৫২ শতাংশের বেশি সম্পৃক্ত চর্বি। গরু ও মহিষের ঘিতে প্রধানত পামিটিক, স্টিয়ারিক ও মাইরিস্টিক অ্যাসিড পাওয়া গেছে। এগুলো সম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিডের অন্তর্ভুক্ত।

কোন ঘিতে অসম্পৃক্ত চর্বি বেশি
গরুর ঘিতে পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ শতাংশ।অন্যদিকে মহিষের ঘিতে এই পরিমাণ ২ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অসম্পৃক্ত চর্বির এই ধরন শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও শুধু এই উপাদানের পরিমাণ দিয়ে কোনো খাবারকে সামগ্রিকভাবে বেশি স্বাস্থ্যকর বলা যায় না।
একই গবেষণায় দুই ধরনের ঘিতেই ওলেইক অ্যাসিড পাওয়া গেছে। এটি মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিডের অন্তর্ভুক্ত। তবে ঘিতে এর পরিমাণ তুলনামূলক কম এবং সম্পৃক্ত চর্বির উপস্থিতি বেশি।
গরুর ঘি হলুদ, মহিষের ঘি সাদা কেন
দুই ধরনের ঘির রঙের পার্থক্যের পেছনে রয়েছে দুধের প্রাকৃতিক উপাদান। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) তথ্য অনুযায়ী, গরুর ঘিতে ক্যারোটিন থাকে, যা ঘিকে হলুদাভ রং দেয়। মহিষের দুধে ক্যারোটিনের পরিমাণ খুব কম থাকায় এর ঘি সাধারণত সাদাটে হয়।
তবে ঘির রং দেখে এর বিশুদ্ধতা বা পুষ্টিমান নিশ্চিত করা যায় না। উৎপাদনপ্রক্রিয়া, দুধের উৎস এবং সংরক্ষণের পদ্ধতিও ঘির গুণমানের ওপর প্রভাব ফেলে।

কোন ঘি হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য ভালো
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ২০২৩ সালের নির্দেশিকায় সম্পৃক্ত ও ট্রান্স ফ্যাট গ্রহণ সীমিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির সুপারিশ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের দৈনিক মোট ক্যালরির ১০ শতাংশের কম আসা উচিত সম্পৃক্ত চর্বি থেকে। অর্থাৎ ২ হাজার ক্যালরির খাদ্যতালিকায় এর পরিমাণ ২০০ ক্যালরির কম হওয়া প্রয়োজন।
ঘি সম্পৃক্ত চর্বির একটি উৎস। অতিরিক্ত সম্পৃক্ত চর্বি গ্রহণ রক্তে এলডিএল বা ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে পারে, যা হৃদ্রোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। এ কারণে WHO ঘি, মাখন ও অন্যান্য সম্পৃক্ত চর্বির পরিবর্তে অসম্পৃক্ত চর্বিসমৃদ্ধ খাবার, যেমন সয়াবিন, সরিষা, সূর্যমুখী ও অলিভ অয়েল ব্যবহারের পরামর্শ দেয়।
তাহলে কোন ঘি খাবেন
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, গরুর ঘিতে পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ কিছুটা বেশি। তবে দুই ধরনের ঘিতেই সম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ বেশি হওয়ায় শুধু এই পার্থক্যের ভিত্তিতে গরুর ঘিকে স্বাস্থ্যকর ঘোষণা করা যায় না। একইভাবে মহিষের ঘিরও কিছু স্বতন্ত্র পুষ্টিগত বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
তাই ঘি খাওয়ার ক্ষেত্রে ধরন নির্বাচনের চেয়ে পরিমাণ ও সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত খাদ্যতালিকায় ঘির পাশাপাশি অন্যান্য উৎস থেকে কতটা সম্পৃক্ত চর্বি গ্রহণ করা হচ্ছে, সেটিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, গরু ও মহিষের ঘির মধ্যে একটিকে সবার জন্য বেশি স্বাস্থ্যকর বলার মতো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। স্বাদ ও পছন্দ অনুযায়ী যেকোনোটি বেছে নেওয়া যেতে পারে, তবে ঘি পরিমিত খাওয়া এবং অসম্পৃক্ত চর্বির উৎসকে খাদ্যতালিকায় গুরুত্ব দেওয়াই ভালো।








































