আগে কেনাকাটা করতে হলে বাজারে বা শপিংমলে যেতে হতো। এখন স্মার্টফোনে কয়েকটি ক্লিকেই পছন্দের পণ্য চলে আসে ঘরে।পোশাক, প্রসাধনী, জুতা থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস—সবই পাওয়া যাচ্ছে অনলাইনে। প্রয়োজন হলেই কেনাকাটা করা যায়, আবার অনেক সময় কোনো প্রয়োজন ছাড়াই মানুষ ঢুঁ মারেন বিভিন্ন শপিং অ্যাপে। নতুন পণ্যের খোঁজ, ছাড়ের বিজ্ঞাপন কিংবা আকর্ষণীয় অফার দেখে অনেকেই হঠাৎ কিছু কিনে ফেলেন। এভাবে কেনাকাটা কখনো কখনো অভ্যাসের গণ্ডি ছাড়িয়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
কেন অনলাইন কেনাকাটার প্রতি ঝোঁক বাড়ছে
অনলাইন শপিংয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো সহজলভ্যতা। ঘরে বসেই পণ্য দেখা, দাম তুলনা করা এবং অর্ডার দেওয়া যায়। পাশাপাশি ফ্ল্যাশ সেল, বিশেষ ছাড়, সীমিত সময়ের অফার, ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী পণ্যের সুপারিশ ও সহজ পেমেন্টব্যবস্থা কেনাকাটার আগ্রহ বাড়াতে পারে।
২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, অনলাইন শপিংয়ের সহজ প্রবেশাধিকার, সারাক্ষণ কেনাকাটার সুযোগ, পণ্যের অফুরন্ত তালিকা এবং ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী বিজ্ঞাপন ও সুপারিশ অতিরিক্ত কেনাকাটার প্রবণতা বাড়াতে পারে।
কখন অভ্যাস আসক্তির পর্যায়ে যায়
মাঝেমধ্যে পছন্দের কিছু কিনে ফেলা কিংবা অনলাইনে কেনাকাটা করতে ভালো লাগা মানেই আসক্তি নয়। সমস্যা তৈরি হয় যখন কেনাকাটার ইচ্ছা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রয়োজন না থাকলেও বারবার পণ্য কেনা, কেনার পর ব্যবহার না করা, খরচের হিসাব গোপন করা কিংবা কেনাকাটার কারণে আর্থিক সমস্যায় পড়েও সেই অভ্যাস চালিয়ে যাওয়া উদ্বেগের লক্ষণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের একটি আন্তর্জাতিক মতৈক্যভিত্তিক গবেষণায় অতিরিক্ত কেনাকাটার প্রবল তাড়না, নিয়ন্ত্রণের অভাব, কেনাকাটার নেতিবাচক পরিণতি সত্ত্বেও তা চালিয়ে যাওয়া এবং ব্যক্তিগত জীবনে এর প্রভাবকে সমস্যাজনক কেনাকাটার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মন খারাপ হলেই কেনাকাটা করার প্রবণতা
কেউ কেউ মন খারাপ, একাকিত্ব, দুশ্চিন্তা কিংবা মানসিক চাপ থেকে সাময়িক স্বস্তি পেতে অনলাইনে কেনাকাটা করেন।নতুন কিছু অর্ডার দেওয়ার পর ভালো লাগলেও সেই অনুভূতি বেশিক্ষণ স্থায়ী নাও হতে পারে। পরে অপ্রয়োজনীয় খরচের জন্য অনুশোচনা তৈরি হয়। আবার সেই অস্বস্তি কাটাতে নতুন করে কেনাকাটার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা পর্যালোচনায় মানসিক চাপ ও সমস্যাজনক কেনাকাটার মধ্যে সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে। তবে গবেষণাগুলোর ফল একরকম নয়; তাই মানসিক চাপই যে অতিরিক্ত কেনাকাটার একমাত্র কারণ, তা বলা যায় না।
কেনাকাটার অভ্যাস কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখবেন
- অনলাইনে কেনাকাটার জন্য মাসিক একটি নির্দিষ্ট বাজেট রাখুন।
- প্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকা তৈরি করে সেই অনুযায়ী কেনাকাটা করুন।
- কোনো পণ্য পছন্দ হলেই সঙ্গে সঙ্গে অর্ডার না দিয়ে কিছুটা সময় অপেক্ষা করুন।
- অপ্রয়োজনীয় শপিং নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন।
- কেনাকাটার আগে ভাবুন, পণ্যটি সত্যিই প্রয়োজন কি না এবং এর জন্য খরচ করা সম্ভব কি না।
- মন খারাপ বা মানসিক চাপের সময় কেনাকাটাকে স্বস্তি পাওয়ার একমাত্র উপায় হিসেবে বেছে নেবেন না।
কখন সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন
কেনাকাটার কারণে ঋণ বা আর্থিক চাপ তৈরি হলে, পড়াশোনা ও দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত ঘটলে কিংবা বারবার চেষ্টা করেও কেনাকাটার তাড়না নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। এমন পরিস্থিতিতে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বা মনোরোগ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। সমস্যাজনক কেনাকাটার ক্ষেত্রে কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (সিবিটি) নিয়ে গবেষণায় ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।
অনলাইন শপিং আধুনিক জীবনের একটি সুবিধাজনক অংশ। তবে প্রয়োজন ও সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে কেনাকাটা করতে থাকলে সেই অভ্যাসই একসময় ব্যক্তিগত ও আর্থিক জীবনে চাপ তৈরি করতে পারে। তাই কেনাকাটার আনন্দ উপভোগ করার পাশাপাশি নিজের নিয়ন্ত্রণ ও প্রয়োজনের সীমাটিও বুঝে চলা জরুরি।










































