আর্জেন্টিনা-বিদ্বেষ : দলটিকে শান্তিতে জিততে দেওয়া হয় না, হারতেও নয়

ছবি : রয়টার্স

বিশ্বকাপের শেষ ৪০ দিনে আর্জেন্টিনা দলকে ঘিরে যে এক প্রকার ‘আর্জেন্টাইন-বিদ্বেষ’ বা ‘আর্জেন্টোফোবিয়া’ শুরু হয়েছিল, ট্রফি হাতছাড়া হওয়ার পরও তার রেশ কাটেনি। ট্রফি জেতা তো দূরে থাক, হারের পর দলটির সাধারণ প্রতিক্রিয়া নিয়েও সমালোচনার ঝড় তোলা হচ্ছে বিশ্ব মিডিয়ায়।আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যম টিওয়াইসির এক বিশ্লেষকের কলামে এমন অভিযোগ উঠে এসেছে।

টুর্নামেন্ট চলাকালীন অনেক দেশের সমর্থকদের একটাই অভিযোগ ছিল, আর্জেন্টিনা নাকি নিয়ম ভেঙে, রেফারি ও ভিএআরের ‘অদৃশ্য’ সহায়তায় জিতছে! কাতার বিশ্বকাপের সেই পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে ফুটবল বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল ‘আর্জেনফিফা’ কিংবা ‘ইনফান্তিনো তো মেসির হাতেই কাপ তুলে দেবেন’ এমন সব তত্ত্ব। কিন্তু স্পেনের কাছে ফাইনালে আর্জেন্টিনার হারের পর সেই ষড়যন্ত্রতত্ত্ব থমকে গেলেও বিতর্ক থামেনি। নতুন করে শুরু হয়েছে সমালোচনা।

একটি অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও মর্যাদাপূর্ণ ফাইনাল ম্যাচের পরও যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ডসহ ইউরোপের বেশ কিছু গণমাধ্যম সুর চড়াতে শুরু করে। তাদের দাবি—আর্জেন্টিনা নাকি ‘বাজে পরাজিত দল’ এবং বিজয়ী স্পেনকে তারা যথাযথ সম্মান দেখায়নি! যেন মেসির আর্জেন্টিনাকে জেতার পর যেমন শান্তিতে থাকতে দেওয়া হয়নি, ঠিক তেমনি হারের পরও তাদের নিজস্ব আবেগ প্রকাশের স্বাধীনতা নেই! তাদের আচরণ হতে হবে ইউরোপীয় বা কনকাকাফের কোনো গৎবাঁধা চশমায় নির্ধারিত নিয়মানুযায়ী!

অবশ্য ম্যাচ শেষে লিয়ান্দ্রো পারেদেস, নাহুয়েল মোলিনা ও রবার্তো আয়ালা প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের সঙ্গে যে অপ্রীতিকর ঘটনায় জড়িয়েছেন, তা কোনোভাবেই প্রশংসনীয় নয়। হয়তো স্প্যানিশ খেলোয়াড়দের কোনো উসকানিমূলক বাক্য এর পেছনে ছিল, কিন্তু তবুও এমন আচরণ সমর্থনযোগ্য নয়। 

তবে এই ‘নীতিপুলিশ’ গণমাধ্যমগুলোর দ্বিমুখী নীতিও স্পষ্ট।সেমিফাইনালে যখন ইংল্যান্ডের জুড বেলিংহাম আর্জেন্টিনার ভ্যালেন্টিন বারকোকে থাপ্পড় মেরেছিলেন, কিংবা ইংলিশ গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড আর্জেন্টাইন গ্যালারির সামনে গিয়ে গোল উদযাপন করে খ্যাপাচ্ছিলেন, তখন কিন্তু পশ্চিমা মিডিয়ায় ‘বাজে বিজয়ী’ নিয়ে একটি বাক্যও লেখা হয়নি! 

আরেকটি বড় বিতর্কের জন্ম দেওয়া হয়েছে স্পেনের ট্রফি নেওয়ার মুহূর্তটি নিয়ে। ম্যাচ শেষে আর্জেন্টাইন ফুটবলাররা গ্যালারিতে থাকা তাদের সমর্থকদের করতালি দিয়ে ধন্যবাদ জানাচ্ছিলেন। সমর্থকরা ১০ হাজার ডলার খরচ করে টিকিট কেটে এসেছিলেন প্রিয় দলকে উৎসাহিত করতে তাদের কাছেই গিয়েছিলেন খেলোয়াড়রা। শিরোপা দেওয়ার সেই মুহূর্তে কিছু ফুটবলার উল্টো দিকে মুখ ঘুরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। স্বপ্নের ট্রফিটা অন্যের হাতে উঠতে দেখার যন্ত্রণা সইতে না পেরে অনেকে হয়তো চোখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন, আবার কেউ কেউ দূর থেকেই স্পেনের উদযাপন দেখেছেন।ফুটবলে নিজের চোখের সামনে অন্য দলের উৎসব দেখাটা সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি।

২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ট্রফি নেওয়ার সময় ফ্রান্সের ফুটবলাররা মাঠে কী করেছিলেন—তা নিয়ে কিন্তু বিশ্বজুড়ে কেউ কোনো প্রশ্ন তোলেনি। কারণ একটি রুদ্ধশ্বাস ফাইনাল হারার পর যে যার মতো করে দুঃখ সামলে নেয়। আর্জেন্টাইন ফুটবলাররা স্পেনের উদযাপনের সময় যে আচরণই করুক না কেন, তা কোনোভাবেই চ্যাম্পিয়ন দলকে অনাদর বা অসম্মান করা ছিল না। 

LEAVE A REPLY