ছবি এআই দিয়ে তৈরি
দেখা যায় কমবেশি সবার মাথাব্যথার সমস্যা হয়। আর আমরা অনেকেই ধরে নেই এটা হয়তো কম ঘুম, মানসিক চাও কিংবা স্নায়ুর সমস্যার জন্য হচ্ছে।তবে বিষয়টা কিন্তু এমন নয়। অনেক সময় দেখা যায় মাথাব্যথা চোখের সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।
হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে চোখের সমস্যার সঙ্গে মাথাব্যথার সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন ভারতের বিএলকে-ম্যাক্স সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের প্রধান ও সহযোগী পরিচালক চিকিৎসক বিবেক গর্গ।
চোখের সমস্যায় কেন মাথাব্যথা হয়
আমাদের চোখের কাজ শুধু দেখা নয়।বরং বস্তুর দিকে মনোযোগ ধরে রাখা এবং কাছের ও দূরের জিনিস স্পষ্ট দেখার জন্য চোখের বিভিন্ন পেশিকেও সমন্বিতভাবে কাজ করতে হয়। দীর্ঘক্ষণ পড়াশোনা, কম্পিউটারে কাজ কিংবা মোবাইল ফোন ব্যবহারের সময় চোখের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে কপাল, কানের পাশ ও ঘাড়ের আশপাশেও।
চিকিৎসক বিবেক গর্গের মতে, দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথা নিয়ে অনেক রোগী মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর ব্যথানাশক ওষুধ খান কিংবা বিভিন্ন পরীক্ষা করান।পরে দেখা যায়, তাদের মাথাব্যথার পেছনে চোখের সমস্যাও ভূমিকা রাখছে। তবে মনে রাখতে হবে, সব মাথাব্যথার কারণ চোখ নয়। মাইগ্রেন, সাইনাসের সমস্যা, ঘুমের ঘাটতি কিংবা অন্যান্য শারীরিক কারণেও মাথাব্যথা হতে পারে।
মাথাব্যথার পেছনে চোখের যেসব সমস্যা থাকতে পারে
১. চশমার ভুল পাওয়ার বা দৃষ্টিশক্তির ত্রুটি
চোখের পাওয়ার ঠিক না থাকলে স্পষ্ট দেখার জন্য চোখকে বাড়তি পরিশ্রম করতে হয়। অ্যাস্টিগম্যাটিজম, দূরের বস্তু দেখতে সমস্যা কিংবা বয়সজনিত কাছের দৃষ্টির সমস্যার কারণে কপালের ওপর বা ভ্রুর আশপাশে মৃদু কিন্তু স্থায়ী ব্যথা হতে পারে।দীর্ঘক্ষণ পড়ার পর এই অস্বস্তি বাড়তে পারে।
২. দুই চোখের সমন্বয়ে সমস্যা
কোনো বই পড়ার সময় বা স্ক্রিনের দিকে তাকালে দুই চোখকে একসঙ্গে নির্দিষ্ট বস্তুর দিকে মনোযোগ দিতে হয়। এ ক্ষেত্রে চোখের পেশি ঠিকভাবে সমন্বয় করতে না পারলে পড়তে অসুবিধা, চোখের ক্লান্তি, ঝাপসা দেখা এবং চোখের পেছনে ব্যথা হতে পারে। এ ধরনের সমস্যার একটি নাম কনভারজেন্স ইনসাফিসিয়েন্সি।
৩. দীর্ঘক্ষণ মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহার
একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখের পলক ফেলার হার কমে যেতে পারে। ফলে চোখের আর্দ্রতা কমে শুষ্কতা, জ্বালাপোড়া ও অস্বস্তি তৈরি হয়। পাশাপাশি দীর্ঘক্ষণ কাছের জিনিসে মনোযোগ রাখার কারণে চোখ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। দিনের শেষ দিকে মাথাব্যথা দেখা দেওয়ার পেছনে এই কারণগুলো ভূমিকা রাখতে পারে।
৪. গ্লুকোমা বা চোখের চাপ বেড়ে যাওয়া
চোখের ভেতরের চাপ বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে কিছু ধরনের গ্লুকোমার সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে অ্যাকিউট অ্যাঙ্গেল-ক্লোজার গ্লুকোমায় হঠাৎ তীব্র চোখব্যথা, মাথাব্যথা, চোখ লাল হওয়া, ঝাপসা দেখা, আলোর চারপাশে রঙিন বলয় দেখা এবং বমি বমি ভাব হতে পারে। এটি জরুরি চিকিৎসার বিষয়। এমন লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা না করে জরুরি বিভাগে যেতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ
কিছু লক্ষণ দেখে চোখের সমস্যার সম্ভাবনা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। যেমন—
- দীর্ঘক্ষণ মোবাইল, কম্পিউটার ব্যবহার বা বই পড়ার পর মাথাব্যথা বাড়ে।
- চোখের চারপাশে, পেছনে কিংবা দুই চোখের মাঝখানে ব্যথা অনুভূত হয়।
- চোখে জ্বালাপোড়া, শুষ্কতা বা আলো সহ্য করতে অসুবিধা হয়।
- পড়তে গিয়ে ঝাপসা দেখা বা দুটি ছবি দেখার মতো সমস্যা হয়।
- দীর্ঘক্ষণ কাছের কাজে মনোযোগ দেয়ার পর চোখ ও ঘাড়ে অস্বস্তি তৈরি হয়।
তবে এসব লক্ষণ থাকলেই যে মাথাব্যথার কারণ চোখ, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। প্রয়োজন অনুযায়ী চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরীক্ষা এবং অন্য কারণগুলোও মূল্যায়ন করা জরুরি।
বারবার মাথাব্যথা হলে
মাথাব্যথা হলেই ব্যথানাশক ওষুধ খেয়ে নেওয়ার অভ্যাস থাকলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। ঘন ঘন ব্যথানাশক ব্যবহারে উল্টো ওষুধ-অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে মাথাব্যথা তৈরি হতে পারে। তাই শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর না করে মাথাব্যথার কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চোখের পাওয়ার, চোখের পেশির সমন্বয়, কর্নিয়ার স্বাস্থ্য এবং চোখের ভেতরের চাপ পরীক্ষা করা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে সঠিক পাওয়ারের চশমা, চোখের শুষ্কতার উপযোগী ড্রপ কিংবা অন্যান্য চিকিৎসা দেওয়া হয়।
এ ছাড়া স্ক্রিন ব্যবহারের সময় ২০-২০-২০ নিয়ম মেনে চলা উপকারী হতে পারে। অর্থাৎ প্রতি ২০ মিনিট পর ২০ সেকেন্ডের জন্য প্রায় ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে তাকান।
নিয়মিত বিরতি নিন, স্ক্রিনের আলো ও ঘরের আলোর মধ্যে ভারসাম্য রাখুন এবং সচেতনভাবে চোখের পলক ফেলুন। তবে হঠাৎ জীবনের সবচেয়ে তীব্র মাথাব্যথা, দৃষ্টিশক্তি হারানো, চোখে তীব্র ব্যথা, বারবার বমি, শরীরের এক পাশ দুর্বল হয়ে যাওয়া কিংবা কথা বলতে অসুবিধা হলে শুধু চোখ পরীক্ষা করানোর জন্য অপেক্ষা করবেন না জরুরি চিকিৎসা নিন।







































