ছবি : রয়টার্স
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন। এ নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে না পারলে মেয়াদের বাকি দুই বছর বড় ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন তিনি।
শুরু হতে পারে তার প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত, এমনকি নতুন করে অভিশংসন প্রক্রিয়াও। পাশাপাশি ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্পের উত্তরসূরি হওয়ার লড়াইও জোরালো হয়ে উঠতে পারে।
এ ছাড়া মঙ্গলবারের নির্বাচনে ভোটাররা রিপাবলিকানদের প্রত্যাখ্যান করলে দেশে ও বিদেশে ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। ট্রাম্প নিজেই বারবার ভোটারদের বলেছেন, তারা যেন মনে করেন, ‘আমি নিজেই ব্যালট পেপারে আছি।’ এর মাধ্যমে তিনি কার্যত এই নির্বাচনকে নিজের নেতৃত্বের ওপর গণভোটে পরিণত করেছেন।
নির্বাচনকে ব্যক্তিগত লড়াইয়ে পরিণত করা ছিল ট্রাম্প ও তার দলের একটি বড় রাজনৈতিক কৌশল। তাদের ধারণা ছিল, এতে ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (মাগা) সমর্থকেরা আরো উৎসাহিত হবেন এবং বেশি সংখ্যায় ভোট দিতে আসবেন। কারণ ট্রাম্প সরাসরি প্রার্থী না হলে তাদের অনেকেই ভোট দিতে ততটা আগ্রহী নাও হতে পারতেন।
নিউ জার্সির ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর অ্যান্ডি কিম বলেন, ‘ট্রাম্প কি চান সবাই মনে করুক, তিনিই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন? বাস্তবে পরিস্থিতি ঠিক তেমনই। সবাই এখন তাঁকে নিয়েই ভাবছে। বিশেষ করে, তাঁর কারণে মানুষের যে ক্ষতি হয়েছে, তা নিয়েও আলোচনা করছে।’ চলতি শরতে আইওয়া, জর্জিয়া ও টেক্সাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী এলাকায় প্রচার চালানোর অভিজ্ঞতা থেকে তিনি এ মন্তব্য করেন।
তবে সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারলে ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান আরো শক্তিশালী হবে।একই সঙ্গে দলের ওপর তার নিয়ন্ত্রণও বাড়বে। এ ক্ষেত্রে রক্ষণশীল অঙ্গরাজ্যগুলোতে কয়েক মাস ধরে চালানো তার নির্বাচনী প্রচার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এসব এলাকায় ট্রাম্প এখনও বেশ জনপ্রিয়। মঙ্গলবার নির্বাচনের দিন হোয়াইট হাউসেই সময় কাটানোর পরিকল্পনা রয়েছে তার।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শেষ দিকে প্রতিনিধি পরিষদ ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। সে সময়ের অভিজ্ঞতা থেকেই এবার রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে নির্বাচনের শেষ কয়েক সপ্তাহে জোর প্রচার চালিয়েছেন তিনি। কারণ ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে তার প্রশাসনকে তদন্ত ও নানা রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে, তা ট্রাম্প ভালোভাবেই জানেন।
তবে কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর আশঙ্কাকে মাঝে মাঝে গুরুত্ব দিতে চাননি ট্রাম্প। ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় এলে তাকে আবারও অভিশংসনের (ইমপিচমেন্ট) চেষ্টা করতে পারে। এ প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, ‘তাদের অভিশংসনের চেষ্টা ঠেকাতে ঠেকাতে আমি বেশ দক্ষ হয়ে উঠেছি।’ বিরোধী দলকে সামনে রেখে নিজের দলের সমর্থকদের ঐক্যবদ্ধ করা এবং নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার বিষয়টিও ট্রাম্প ভালোভাবেই জানেন।
অন্যদিকে কংগ্রেসের অন্তত একটি কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার আশা করছেন জ্যেষ্ঠ ডেমোক্র্যাট নেতারা। ক্ষমতায় গেলে কোন কোন বিষয়ে তদন্ত চালানো হবে, সে ইঙ্গিতও তারা দিতে শুরু করেছেন। তাদের সম্ভাব্য তদন্তের তালিকায় রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতি, সরকারি কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড এবং হোয়াইট হাউসের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের যোগাযোগ ও লেনদেন।
ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড তদন্তের সুযোগ পাবেন। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি রবার্ট গার্সিয়া। তিনি প্রতিনিধি পরিষদের শক্তিশালী ‘হাউস ওভারসাইট কমিটি’র নেতৃত্ব দিতে পারেন। সম্প্রতি তিনি জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন ও আটকসংক্রান্ত নীতিগুলো নিয়ে বিস্তারিত তদন্ত করতে চান।
এরই মধ্যে তিনি দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা (আইসিই)-এর একটি আটককেন্দ্র আকস্মিকভাবে পরিদর্শন করেছেন। পরে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আইসিইর কর্মকাণ্ডের জন্য সংস্থাটিকে জবাবদিহির আওতায় আনতে চান।
গার্সিয়ার তদন্তের সম্ভাব্য তালিকায় আরো রয়েছে ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক লেনদেন, জেফরি এপস্টেইন-সংক্রান্ত তদন্তে প্রশাসনের ভূমিকা এবং বিভিন্ন করপোরেট দুর্নীতির অভিযোগ। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ডেমোক্র্যাটরা বিভিন্ন কমিটির নিয়ন্ত্রণ, বাজেট ও কর্মী নিয়োগের ক্ষমতা এবং আইনি তলব বা ‘সাবপিনা’ জারির সুযোগ পাবেন।
এসব ক্ষমতা ব্যবহার করে তারা ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যা চাইতে এবং কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে পারবেন। তবে এর জবাবে ট্রাম্প প্রশাসন তার প্রথম মেয়াদের মতোই তদন্তে সহযোগিতা এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল নিতে পারে।
কংগ্রেসের নথি ও সাক্ষ্য দেওয়ার অনুরোধে বিলম্ব করা কিংবা কিছু তথ্য প্রকাশ না করতে ‘নির্বাহী বিশেষাধিকার’ দাবি করতে পারে হোয়াইট হাউস। এদিকে ট্রাম্পও বড় ধরনের আইনি ও নীতিগত লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি বলেছেন, প্রয়োজনে তার হাতে শক্তিশালী ভেটো ক্ষমতা রয়েছে।
গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, কংগ্রেসে বিরোধীরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও শক্তিশালী ভেটো ক্ষমতার কারণে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব। এদিকে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে স্পিকার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে হাকিম জেফ্রিসের। তখন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তৃতীয়বারের মতো অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করা হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাকে। ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে দুবার অভিশংসিত হলেও সিনেটে দুইবারই খালাস পেয়েছিলেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। তাদের লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। ইরান যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা হেগসেথকে পদ থেকে সরানোর হুমকি দিয়েছেন ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফ্রিস। গত অক্টোবরে তিনি বলেছিলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে তাদের প্রথম কাজ হবে হেগসেথকে সরানো।
নির্বাচনের শেষ কয়েক সপ্তাহে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে জনসভা করেন ট্রাম্প। বিশেষ করে রিপাবলিকান-অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে দলের প্রার্থীদের সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করেন তিনি। ভোটারদের সমর্থন ধরে রাখতে ডালাসে দুই দিনব্যাপী সম্মেলনের আয়োজন করে সমর্থকদের ভোট দেওয়ার শপথও করান। পাশাপাশি রিপাবলিকানরা জয়ী হলে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে ৫ হাজার ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
তবে প্রচারণায় ট্রাম্পের বক্তব্যে ধারাবাহিকতার অভাব দেখা যায়। দীর্ঘ জনসভাগুলোতে জ্বালানির উচ্চমূল্যের মতো ভোটারদের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা নিয়ে কথা বলার পরিবর্তে নিজের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও হোয়াইট হাউসে বলরুম নির্মাণের বিষয়টি তুলে ধরেন। বিভিন্ন জনসভায় রিপাবলিকান প্রার্থীদের শারীরিক গঠন নিয়েও রসিকতা করেন তিনি।
এ ছাড়া ডেটা সেন্টার স্থাপনে রাজি না হওয়া এলাকাগুলোকে ‘পিছিয়ে পড়া ও দরিদ্র’ হয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়টিকে ‘প্রতারণা’ বলেও মন্তব্য করেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল মলে শেষ নির্বাচনী বক্তব্য দেন ট্রাম্প। প্রায় এক ঘণ্টার ওই বক্তব্যে ভোটারদের সমস্যা তুলে ধরার চেয়ে ওয়াশিংটন ডিসির সৌন্দর্যবর্ধনে নিজের ভূমিকার প্রশংসায় বেশি সময় ব্যয় করেন তিনি।











































